জুমার নামাজের নিয়ম: কত রাকাত, আগে-পরের সুন্নত ও খুতবার আদব
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
জুমার নামাজ সপ্তাহে একবার আসে, কিন্তু এর নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন সারা বছরই থাকে। কত রাকাত পড়তে হয়, আগে-পরে কয়টি সুন্নত, খুতবার সময় কী করা যাবে আর কী যাবে না, দেরিতে পৌঁছালে নামাজ হবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এক জায়গায় পেলে নামাজে মনোযোগও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে নিয়ম হলো: জুমার ফরজ দুই রাকাত, যা ইমামের পেছনে জামাতে পড়তে হয় এবং যা ওই দিনের জোহরের পরিবর্তে আদায় হয়। হানাফি মাজহাবে ফরজের আগে চার রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং ফরজের পরে চার রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে পরে চার রাকাতের পর আরও দুই রাকাত, তাই বাংলাদেশে অনেকে মোট ছয় রাকাত পড়েন। ফরজের আগে ইমাম দুটি খুতবা দেন, যা মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব।
জুমা কার ওপর ফরজ
জুমার নামাজ ফরজে আইন। আবু দাউদে হজরত তারিক ইবনে শিহাব (রা.) থেকে বর্ণিত, জুমা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জামাতের সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক, চার শ্রেণি ছাড়া: দাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তি। হানাফি ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী জুমা ফরজ হওয়ার শর্তগুলো হলো:
১. পুরুষ হওয়া: নারীদের ওপর জুমা ফরজ নয়। তাঁরা ঘরে চার রাকাত জোহর পড়বেন। কোনো নারী মসজিদে গিয়ে জুমা পড়লে তাঁর জোহর আদায় হয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
২. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া: শিশু ও মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ফরজ নয়, তবে শিশুদের অভ্যাস গড়তে মসজিদে নেওয়া ভালো।
৩. মুকিম হওয়া: শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসাফিরের ওপর জুমা ফরজ নয়, তিনি জোহর কসর করবেন। তবে জুমায় শরিক হলে জুমাই আদায় হবে।
৪. শারীরিক সামর্থ্য: অসুস্থ, চলাফেরায় অক্ষম বা গুরুতর রোগীর সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তির ওপর ফরজ নয়। প্রবল ঝড়বৃষ্টি বা জীবনের আশঙ্কাও গ্রহণযোগ্য ওজর।
জুমা শুদ্ধ হওয়ার শর্ত
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে জুমার নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত আছে। নামাজ হতে হবে জোহরের ওয়াক্তে; জোহরের সময় শুরু হওয়ার আগে বা আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে গেলে জুমা হয় না। ফরজের আগে খুতবা হতে হবে। ইমাম ছাড়া কমপক্ষে তিনজন পুরুষ মুসল্লির জামাত থাকতে হবে, এটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত। আর নামাজের স্থানে সর্বসাধারণের প্রবেশের অনুমতি থাকতে হবে।
হানাফি মাজহাবে জুমার জন্য শহর বা শহরের মতো জনপদ হওয়ারও শর্ত আছে। কোন গ্রামে জুমা হবে আর কোথায় হবে না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মুসল্লিরা নিজ এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেম ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করবেন।
জুমার প্রস্তুতি শুরু হয় আজানের আগেই। সুরা জুমআর ৯ নম্বর আয়াতে জুমার আহ্বান শোনামাত্র বেচাকেনা ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে যেতে বলা হয়েছে। হানাফি ফকিহরা বলেছেন, প্রথম আজানের পর থেকেই এ নির্দেশ প্রযোজ্য। তাই দোকান, অফিস বা ঘরের কাজ গুছিয়ে আগেভাগে গোসল সেরে মসজিদের দিকে রওনা হওয়াই নিয়ম। শহরের বড় মসজিদে দেরিতে গেলে রাস্তায় বা রোদে কাতার করে দাঁড়াতে হয়, এতে খুতবা শোনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
রাকাত সংখ্যা, ধারাবাহিকতা ও নিয়ত
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের মসজিদে সাধারণত যে ধারাবাহিকতায় জুমা আদায় হয়:
১. তাহিয়্যাতুল মসজিদ: খুতবা শুরুর আগে মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়া মুস্তাহাব। সময় কম থাকলে চার রাকাত সুন্নতেই এর সওয়াব পাওয়ার আশা করা যায়।
২. কাবলাল জুমা চার রাকাত: ফরজের আগের চার রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা, যা এক সালামে পড়তে হয়।
৩. খুতবা: প্রথম আজান হয় জোহরের ওয়াক্তে। খুতবার আগে ইমামের সামনে দ্বিতীয় আজান হয়। এরপর ইমাম দুটি খুতবা দেন, মাঝে অল্প সময় বসেন। বাংলাদেশে সাধারণত খুতবার আগে বাংলায় আলোচনা হয়, মূল খুতবা আরবিতে।
বিজ্ঞাপন
৪. দুই রাকাত ফরজ: ইমাম উচ্চস্বরে কিরাত পড়েন। সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) জুমার নামাজে সুরা আলা ও সুরা গাশিয়া, অথবা সুরা জুমআ ও সুরা মুনাফিকুন পড়তেন।
৫. বাদাল জুমা চার রাকাত: সহিহ মুসলিমের হাদিসে নবীজি বলেছেন, তোমাদের কেউ জুমার পর নামাজ পড়লে যেন চার রাকাত পড়ে। হানাফি মতে এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
৬. আরও দুই রাকাত: ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতের ভিত্তিতে অনেকে চার রাকাতের পর আরও দুই রাকাত সুন্নত পড়েন। এরপর কেউ চাইলে নফল পড়তে পারেন।
নিয়ত অন্তরের সংকল্প, মুখে বলা জরুরি নয়। কেউ বাংলায় বলতে চাইলে বলতে পারেন: আমি কেবলামুখী হয়ে এই ইমামের পেছনে আজকের জুমার দুই রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করছি, আল্লাহু আকবার। সুন্নতের ক্ষেত্রে বলবেন: জুমার আগের বা পরের চার রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করছি।
বিজ্ঞাপন
জুমার খুতবা শোনার আদব
খুতবা জুমার নামাজের শর্ত, তাই এটি শোনা ইবাদতের অংশ। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, খুতবা চলাকালে পাশের জনকে 'চুপ করো' বললেও অনর্থক কাজ হয়ে যায়। কয়েকটি আদব মনে রাখুন:
১. খুতবার সময় কথা বলা, মোবাইল ব্যবহার, পানাহার ও সালাম দেওয়া-নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
২. ইমাম মিম্বারে ওঠার পর হানাফি মতে নতুন করে সুন্নত বা নফল নামাজ শুরু করবেন না। শাফেয়ি মাজহাবে সংক্ষেপে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার মত আছে।
বিজ্ঞাপন
৩. খুতবায় নবীজির নাম এলে মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে দরুদ পড়ুন।
৪. মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাবেন না; যেখানে জায়গা পান, বসে পড়ুন।
৫. দুই খুতবার মাঝের বিরতিতে মনে মনে দোয়া করা যায়, অনেক আলেম একে দোয়া কবুলের সময়ের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।
দেরিতে পৌঁছালে বা জুমা ছুটে গেলে
বিজ্ঞাপন
ইমাম দ্বিতীয় রাকাতের রুকু থেকে ওঠার আগে জামাতে শরিক হলে পুরো এক রাকাত পাওয়া গেল; ইমামের সালামের পর বাকি এক রাকাত পড়ে নেবেন। হানাফি মাজহাবে ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে শেষ বৈঠকে, অর্থাৎ তাশাহহুদের সময় শরিক হলেও মুসল্লি জুমাই আদায় করবেন এবং সালামের পর উঠে দুই রাকাত পূর্ণ করবেন।
কোনো কারণে জুমার জামাত পুরোপুরি ছুটে গেলে একা দুই রাকাত জুমা পড়া যায় না। তখন চার রাকাত জোহর পড়তে হবে। ওজরের কারণে যাঁরা জুমায় যেতে পারেননি, তাঁরা জুমার জামাত শেষ হওয়ার পর ঘরে জোহর পড়বেন। ইচ্ছাকৃতভাবে জুমা ছেড়ে দেওয়া বড় গুনাহ, এ জন্য তওবা করতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জুমার নামাজ কত রাকাত?
বিজ্ঞাপন
ফরজ দুই রাকাত। হানাফি মতে আগে চার ও পরে চার রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা, অনেকে পরে আরও দুই রাকাত পড়েন। তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও নফল আলাদা।
খুতবা চলাকালে মসজিদে ঢুকলে কি সুন্নত পড়ব?
হানাফি মতে খুতবা শুরু হয়ে গেলে নামাজ না পড়ে বসে খুতবা শুনবেন। চার রাকাত সুন্নত ফরজের পরে পড়ে নেওয়া যায়।
মহিলারা কি মসজিদে জুমা পড়তে পারেন?
বিজ্ঞাপন
নারীদের ওপর জুমা ফরজ নয়। মসজিদে নারীদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকলে কেউ অংশ নিলে তাঁর জোহর আদায় হয়ে যাবে। ঘরে থাকলে চার রাকাত জোহর পড়বেন।
সফরে থাকলে কি জুমা পড়তে হবে?
মুসাফিরের ওপর জুমা ফরজ নয়, তিনি দুই রাকাত জোহর কসর পড়বেন। তবে জুমার জামাতে শরিক হলে জুমা আদায় হবে এবং আলাদা জোহর লাগবে না।