সৌদি আরব যাওয়ার নিয়ম: ভিসার ধরন, কাগজপত্র ও প্রস্তুতি
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশিদের বিদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। আবার প্রতিবছর লাখো মানুষ ওমরাহ ও হজ পালন করতে যান, কেউ যান প্রবাসী স্বামী, বাবা বা সন্তানের কাছে বেড়াতে। সবার গন্তব্য এক হলেও যাওয়ার পথ এক নয়। কোন উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে ভিসার ধরন, কাগজপত্র আর প্রক্রিয়া পুরোপুরি বদলে যায়।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে সৌদি আরব যাওয়ার নিয়ম হলো: কাজের জন্য গেলে সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী ভিসা, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র নিতে হয়। ওমরাহ ও হজের জন্য ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত এজেন্সি বা সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেতে হয়। আর সৌদিতে থাকা আত্মীয়ের কাছে বেড়াতে গেলে সাধারণত তিনি সেখান থেকে ফ্যামিলি ভিজিট ভিসার আবেদন করেন।
সব ক্ষেত্রেই কমপক্ষে ছয় মাস মেয়াদি পাসপোর্ট লাগবে। আর সব ক্ষেত্রেই একটি সতর্কতা সমান জরুরি: দালালের মুখের কথায় নয়, কাগজে আর সরকারি ব্যবস্থায় যাচাই করে তবেই টাকা দিন।
কাজের ভিসায় সৌদি আরব যাওয়ার উপায়
কাজের জন্য সৌদি আরব যেতে হলে প্রথমে একজন সৌদি নিয়োগকর্তার চাহিদা বা চাকরির প্রস্তাব লাগে, যার ভিত্তিতে ভিসা ইস্যু হয়। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়া চলে সরকারের লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে।
বিজ্ঞাপন
১. এজেন্সি যাচাই: যে এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন, তাদের লাইসেন্স নম্বর জেনে নিন এবং বিএমইটি বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে বৈধতা যাচাই করুন। স্থানীয় দালালের কাছে টাকা না দিয়ে সরাসরি এজেন্সির অফিসে লেনদেন করুন।
২. চাকরির চুক্তি: বেতন, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, থাকা-খাওয়া ও চুক্তির মেয়াদ লেখা চুক্তিপত্র বুঝে নিন। নিজের ভাষায় না বুঝলে কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিন এবং কপি রাখুন।
৩. মেডিকেল পরীক্ষা: উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয়। ফিট সনদ ছাড়া ভিসা প্রক্রিয়া এগোয় না।
৪. পুলিশ ক্লিয়ারেন্স: অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ লাগে, যা অনলাইনে আবেদন করে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. বায়োমেট্রিক ও ভিসা স্ট্যাম্পিং: সৌদি ভিসা প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত ভিসা কেন্দ্রে আঙুলের ছাপ ও ছবি দিতে হয়। এরপর ভিসা ইস্যু হয়।
৬. দক্ষতা যাচাই: কিছু পেশার ক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাইয়ের পরীক্ষা বা সনদ চাওয়া হতে পারে। এজেন্সির কাছে আগেই জেনে নিন।
৭. বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র: সব কাগজ ঠিক হলে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ড নিতে হয়। প্রয়োজনীয় প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়। এই ছাড়পত্র ছাড়া কাজের ভিসায় বিমানবন্দর পেরোনো যায় না।
যে ফাঁদগুলো এড়াবেন
বিজ্ঞাপন
তথাকথিত ফ্রি ভিসা: যে ভিসায় কাগজে একজন নিয়োগকর্তা থাকেন, কিন্তু বলা হয় সৌদিতে গিয়ে যেখানে খুশি কাজ করা যাবে, তা সৌদি আইনে ঝুঁকিপূর্ণ। এভাবে গিয়ে অনেকে কাজ পান না, বৈধ কাগজ নবায়ন করতে পারেন না, শেষে অবৈধ হয়ে দেশে ফেরত আসেন।
ভ্রমণ ভিসায় কাজের প্রলোভন: ভিজিট, ওমরাহ বা পর্যটন ভিসায় গিয়ে কাজ করা বেআইনি। ধরা পড়লে জেল, জরিমানা ও দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি থাকে।
অস্বাভাবিক খরচ ও রসিদহীন লেনদেন: সরকার অভিবাসন খরচের সীমা নির্ধারণ করে দেয়। তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা চাওয়া হলে সন্দেহ করুন, আর যেকোনো লেনদেনে রসিদ নিন।
ভিসা যাচাই না করা: ভিসার কপি হাতে পেলে সৌদি সরকারের অফিশিয়াল ভিসা যাচাই ব্যবস্থায় বা এজেন্সির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে নিন যে ভিসাটি আসল ও আপনার নামে।
বিজ্ঞাপন
ওমরাহ, হজ ও পারিবারিক ভিজিট ভিসা
ওমরাহ ভিসা: সাধারণত ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত হজ ও ওমরাহ এজেন্সির মাধ্যমে প্যাকেজসহ নেওয়া হয়। সৌদি স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী মেনিনজাইটিস টিকার সনদসহ নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য কাগজ লাগে।
হজ ভিসা: হজের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সরকারি বা অনুমোদিত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। হজের প্যাকেজ ও নিবন্ধনের সময়সূচি প্রতিবছর সরকার ঘোষণা করে।
ফ্যামিলি ভিজিট ভিসা: সৌদিতে বৈধভাবে বসবাসরত প্রবাসী তাঁর নিকটাত্মীয়, যেমন স্ত্রী, সন্তান বা বাবা-মায়ের জন্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন করেন। অনুমোদনের পর বাংলাদেশে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সম্পর্কের প্রমাণ, যেমন বিয়ের সনদ বা জন্মসনদ, ইংরেজি অনুবাদ ও প্রয়োজনে সত্যায়নসহ লাগে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়িক ও পর্যটন ভিসা: সৌদি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ব্যবসায়িক সফরের ভিসা নেওয়া যায়। পর্যটন ই-ভিসার সুবিধা নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য, আর অন্য দেশের নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা শেনজেন অঞ্চলের বৈধ ভিসাধারীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে সুযোগ রাখা হয়েছে। এই নিয়ম বদলায়, তাই আবেদনের আগে সৌদি সরকারের অফিশিয়াল ভিসা প্ল্যাটফর্ম বা দূতাবাস থেকে নিশ্চিত হোন।
সৌদি আরব যেতে কি কি লাগে: সাধারণ তালিকা
উদ্দেশ্যভেদে তালিকা বদলায়, তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই যেগুলো প্রস্তুত রাখতে হয়:
১. পাসপোর্ট: অন্তত ছয় মাস মেয়াদ ও ফাঁকা পাতাসহ।
বিজ্ঞাপন
২. ছবি: নির্ধারিত মাপের সাম্প্রতিক রঙিন ছবি।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
৪. টিকা ও স্বাস্থ্য সনদ: ওমরাহ-হজে মেনিনজাইটিস টিকা, কর্মী ভিসায় মেডিকেল ফিট সনদ।
৫. উদ্দেশ্য-সংশ্লিষ্ট কাগজ: চাকরির চুক্তি, প্যাকেজের কাগজ, আমন্ত্রণপত্র বা সম্পর্কের প্রমাণ।
বিজ্ঞাপন
৬. বিমান টিকিট: ভিসা হাতে পাওয়ার পর কাটাই নিরাপদ।
যাত্রার আগে কিছু প্রস্তুতি
সৌদি আরবের আইনকানুন কঠোর। মাদকসংক্রান্ত অপরাধে কঠিন শাস্তির বিধান আছে, তাই অপরিচিত কারও দেওয়া ব্যাগ বা প্যাকেট কখনো বহন করবেন না। ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ নিলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখুন, কারণ কিছু ওষুধ সেখানে নিয়ন্ত্রিত।
প্রবাসী কর্মী হলে পরিবারের কাছে পাসপোর্ট, ভিসা, চুক্তি ও এজেন্সির কাগজের কপি রেখে যান। সৌদিতে পৌঁছে নিয়োগকর্তার মাধ্যমে বসবাসের অনুমতিপত্র, অর্থাৎ ইকামা করাতে হয়। ইকামার মেয়াদ নবায়ন নিয়োগকর্তার দায়িত্ব হলেও নিজে খোঁজ রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সৌদিতে প্রকাশ্য আচরণ, পোশাক ও ধর্মীয় রীতিনীতির ব্যাপারে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন। রমজানে দিনের বেলা প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সরকারি স্থাপনা বা অন্যের ছবি অনুমতি ছাড়া তোলা ঝামেলা ডেকে আনতে পারে। সেখানে গরম অনেক বেশি, বিশেষ করে গ্রীষ্মে, তাই বাইরে কাজ করলে পর্যাপ্ত পানি পান ও বিশ্রামের দিকে নজর দিন।
কোনো সমস্যায় পড়লে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দার কনস্যুলেটের শ্রম শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। দেশে পরিবার প্রয়োজনে বিএমইটি বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ জানাতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সৌদি আরব যেতে কত টাকা লাগে?
বিজ্ঞাপন
উদ্দেশ্যভেদে খরচ আলাদা। কর্মী ভিসায় সরকার অভিবাসন খরচের সীমা নির্ধারণ করে দেয়, ওমরাহ ও হজের খরচ প্যাকেজের ওপর নির্ভর করে। নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি টাকা চাওয়া হলে সতর্ক হোন।
সৌদি ভ্রমণ ভিসায় কি কাজ করা যায়?
না। ভিজিট, ওমরাহ বা পর্যটন ভিসায় কাজ করা সৌদি আইনে নিষিদ্ধ।
বিএমইটির ছাড়পত্র কি সবার লাগে?
বিজ্ঞাপন
কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের জন্য বহির্গমন ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। ওমরাহ, হজ বা ভিজিটে গেলে এটি লাগে না।
সৌদি ভিসা আসল কি না কীভাবে বুঝব?
ভিসা নম্বর ও পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে সৌদি সরকারের অফিশিয়াল ভিসা যাচাই ব্যবস্থায় খোঁজ করুন, অথবা লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমে যাচাই করান। শুধু কাগজের কপি দেখে নিশ্চিত হবেন না।