কম খরচে সাজেক ভ্রমণ: যাতায়াত, থাকা ও খাবারের বাজেট পরিকল্পনা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
সাজেক নিয়ে সবচেয়ে বেশি শোনা অভিযোগ: জায়গাটা সুন্দর, কিন্তু খরচ বেশি। কথাটা আংশিক সত্য। দুজন বা তিনজন মিলে গেলে চাঁদের গাড়ির ভাড়া আর ভরা মৌসুমের কটেজভাড়া মাথাপিছু অনেক বেশি পড়ে। কিন্তু দল বড় হলে আর সময় বুঝে গেলে একই সফর অর্ধেক খরচেও হয়।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে সাজেক ভ্রমণের হিসাবটা দাঁড়িয়ে আছে তিনটি সিদ্ধান্তের ওপর। এক, দশ থেকে বারোজনের দল করা, যাতে খাগড়াছড়ি থেকে চাঁদের গাড়ির পুরো ভাড়া ভাগ হয়ে যায়। দুই, বৃহস্পতি-শুক্রবার আর ছুটির মৌসুম এড়িয়ে সপ্তাহের মাঝের দিনে যাওয়া। তিন, ভিউওয়ালা দামি রিসোর্টের বদলে সাধারণ কটেজ বা স্থানীয়দের ঘরে থাকা।
এভাবে পরিকল্পনা করলে ঢাকা থেকে দুই রাতের একটি সাজেক সফর জনপ্রতি আনুমানিক চার থেকে সাত হাজার টাকায় সেরে আসা যায়। নিচে প্রতিটি খাতের হিসাব আলাদা করে দেওয়া হলো, সবই আনুমানিক।
সাজেক কোথায়, পথটা কেমন
সাজেক ইউনিয়ন রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায়, তবে যাতায়াত সহজ খাগড়াছড়ি হয়ে। খাগড়াছড়ি শহর থেকে দীঘিনালা ও বাঘাইহাট পেরিয়ে পাহাড়ি পথে সাজেকের রুইলুই পাড়া পর্যন্ত যেতে হয়, সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তার কারণে বাঘাইহাট এলাকা থেকে সাজেক পর্যন্ত পর্যটকবাহী গাড়িগুলো দিনে নির্দিষ্ট সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে বহর করে যায়। সাধারণত সকালে ও দুপুরের পর একটি করে বহর ছাড়ে, ফেরার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। এই সময় ধরতে না পারলে পরের বহরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তাই খাগড়াছড়ি থেকে রওনা দেওয়ার সময় চালকের সঙ্গে বহরের সময় মিলিয়ে নিন।
যাতায়াতে খরচ বাঁচানোর উপায়
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও কলাবাগান থেকে খাগড়াছড়ির বাস ছাড়ে, বেশির ভাগই রাতে। সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসিতে আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা। বাজেট ভ্রমণে নন-এসি বাসই যথেষ্ট, রাতের বাসে গেলে প্রথম রাতের হোটেলভাড়া বাঁচে।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক চাঁদের গাড়ি: খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়িতে দশ-বারোজন বসা যায়। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক গিয়ে এক রাত থেকে পরদিন ফেরার পুরো প্যাকেজে গাড়িভাড়া আনুমানিক ৯০০০ থেকে ১৩০০০ টাকা। ফেরার পথে খাগড়াছড়ির কয়েকটি জায়গা ঘুরিয়ে দেখালে ভাড়া বাড়ে। বারোজনে ভাগ করলে জনপ্রতি এক হাজার টাকার আশপাশে পড়ে, অথচ চারজনে ভাগ করলে তিন গুণ।
বিজ্ঞাপন
অন্যদের সঙ্গে গাড়ি ভাগ: নিজের দল ছোট হলে খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বর এলাকায় বা অনলাইনের ভ্রমণ গ্রুপে অন্য ছোট দলের সঙ্গে মিলে গাড়ি ভাগ করা যায়। অপরিচিতদের সঙ্গে ভাগ করার আগে ভাড়া ও সময় নিয়ে পরিষ্কার কথা বলে নিন।
সিএনজি ও মোটরসাইকেল: খরচ কম মনে হলেও খাড়া পাহাড়ি পথে নিরাপত্তার দিক থেকে চাঁদের গাড়িই ভালো, আর বহরের নিয়মেও কিছু বাহনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ: কোথায় থাকলে খরচ কম
সাজেকের থাকার জায়গাগুলো মূলত রুইলুই পাড়া ও কংলাক পাড়াকে ঘিরে। মূল সড়কের পাশে, বিশেষ করে উপত্যকার দিকে মুখ করা ভিউওয়ালা রিসোর্টগুলোর ভাড়া সবচেয়ে বেশি। একই এলাকায় পেছনের সারির বা ভিউ ছাড়া কটেজের ভাড়া অনেক কম, অথচ সূর্যোদয় দেখতে হেলিপ্যাড বা ভিউ পয়েন্টে হেঁটে যেতে লাগে কয়েক মিনিট।
বিজ্ঞাপন
সপ্তাহের মাঝের দিনে সাধারণ কটেজে চার-পাঁচজন থাকার একটি কক্ষ আনুমানিক ২০০০ থেকে ৪০০০ টাকায় পাওয়া যায়। শুক্র-শনিবার ও ভরা মৌসুমে একই কক্ষের ভাড়া দ্বিগুণ হতে পারে, আর ভিউওয়ালা রিসোর্টে আনুমানিক ৫০০০ থেকে ১৫০০০ টাকা বা বেশি। কিছু স্থানীয় পরিবার নিজেদের বাড়িতে সাধারণ মানের থাকার ব্যবস্থা দেয়, সেটিও বাজেটবান্ধব।
সাজেকে পানি ও বিদ্যুৎ দুটিরই সংকট আছে। অনেক কটেজে বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট সময় থাকে, পানিও মেপে ব্যবহার করতে হয়। কম ভাড়ার কটেজে এ বিষয়গুলো আগে জেনে নিন, পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখুন।
খাবারের বাজেট
সাজেকে সব কিছু নিচ থেকে বয়ে আনতে হয়, তাই খাবারের দাম সমতলের চেয়ে বেশি। অধিকাংশ রেস্তোরাঁয় খাবার আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়, বিশেষ করে রাতের খাবার।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ ভাত, ডাল, সবজি ও মুরগির এক বেলার খাবার আনুমানিক ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সাজেকের পরিচিত ব্যাম্বু চিকেন, অর্থাৎ বাঁশের ভেতরে রান্না করা মুরগি, দলে ভাগ করে খেলে খরচ সাধ্যের মধ্যে থাকে। রাতের বারবিকিউ আকর্ষণীয়, কিন্তু বাজেট ভ্রমণে এটি বাদ দিলেও চলে।
খাগড়াছড়ি থেকে রওনার আগে পানি, শুকনো খাবার ও ফল কিনে নিন, সাজেকে এগুলোর দাম বেশি।
ব্যাগ গোছানোর সময়ও কিছু টাকা বাঁচে। শীতে সাজেকের রাত বেশ ঠান্ডা, তাই গরম কাপড় নিজেই নিয়ে যান, সেখানে কিনতে গেলে দাম বেশি। টর্চ, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ আর গাড়িতে বমি ভাব হলে তার ওষুধ সঙ্গে রাখুন। খাগড়াছড়ি শহরেই প্রয়োজনীয় নগদ টাকা তুলে নিন, সাজেকে এটিএমের ওপর নির্ভর করা যায় না।
দুই রাতের একটি নমুনা বাজেট
বিজ্ঞাপন
বারোজনের দলে, এক রাত বাসে ও এক রাত সাজেকে কাটিয়ে, জনপ্রতি আনুমানিক হিসাব:
ঢাকা-খাগড়াছড়ি যাওয়া-আসা: ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
চাঁদের গাড়ি: ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা।
কটেজ: ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
খাবার: দুই দিনের খাবার ৯০০ থেকে ১৩০০ টাকা।
প্রবেশ ফি, পার্কিং ও অন্যান্য: ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৩৮০০ থেকে ৫৬০০ টাকা। দল ছোট হলে, ছুটির মৌসুমে গেলে বা খাগড়াছড়িতে এক রাত বেশি থাকলে খরচ পাঁচ থেকে সাত হাজার বা তারও বেশি হতে পারে।
সাশ্রয়ের সঙ্গে নিরাপত্তা
বিজ্ঞাপন
ভিড়ের মৌসুম: অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সাজেকের সবচেয়ে ভিড়ের সময়, বর্ষাতেও মেঘ দেখতে প্রচুর মানুষ যান। ভিড় এড়াতে সপ্তাহের মাঝের দিন বেছে নিন।
হালনাগাদ খবর: পার্বত্য এলাকার পরিস্থিতির কারণে মাঝে মাঝে পর্যটক চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। রওনার আগে খাগড়াছড়ি বা রাঙামাটি জেলা প্রশাসন কিংবা পরিচিত চালকের কাছ থেকে খবর নিন।
পরিচয়পত্র: পথে চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হতে পারে। মূল কপি ও ফটোকপি সঙ্গে রাখুন।
গাড়ির ছাদে নয়: চাঁদের গাড়ির ছাদে বসে ছবি তোলার প্রবণতা আছে, যা পাহাড়ি বাঁকে বিপজ্জনক। খরচ বাঁচাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেবেন না।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের প্রতি সম্মান: সাজেকের মূল বাসিন্দা লুসাই, ত্রিপুরা ও পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবনযাপনের ছবি অনুমতি ছাড়া তুলবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সাজেক ভ্রমণে জনপ্রতি কত খরচ হয়?
দশ-বারোজনের দলে সপ্তাহের মাঝের দিনে গেলে ঢাকা থেকে জনপ্রতি আনুমানিক চার থেকে ছয় হাজার টাকায় সম্ভব। ছোট দল বা ভরা মৌসুমে খরচ সাত-আট হাজার বা তার বেশি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক চাঁদের গাড়ির ভাড়া কত?
সাজেক গিয়ে পরদিন ফেরার প্যাকেজে আনুমানিক ৯০০০ থেকে ১৩০০০ টাকা। কতগুলো জায়গা ঘুরবেন ও মৌসুমের ওপর ভাড়া নির্ভর করে।
সাজেকে কি আগে থেকে কটেজ বুক করতে হয়?
ছুটির দিন ও ভরা মৌসুমে আগে বুক না করলে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন। সপ্তাহের মাঝের দিনে গিয়ে দেখে নেওয়া যায়, তাতে দরদামের সুযোগও থাকে।
বিজ্ঞাপন
এক দিনে কি সাজেক ঘুরে আসা যায়?
খাগড়াছড়ি থেকে সকালের বহরে গিয়ে বিকেলের বহরে ফেরা সম্ভব, কিন্তু তাতে সাজেকের সূর্যোদয় ও সন্ধ্যার মেঘ দেখা হয় না। অন্তত এক রাত থাকাই ভালো।