কসর নামাজের নিয়ম: সফরে কত দূরত্বে কত রাকাত পড়বেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট বা খুলনার পথে বাসে-ট্রেনে বসে অনেকেই ভাবেন, এখন জোহরের নামাজ কয় রাকাত পড়ব। উত্তর সহজ: শরিয়তের দৃষ্টিতে আপনি যদি মুসাফির হন, তাহলে জোহর, আসর ও এশার চার রাকাত ফরজ নামাজ দুই রাকাত করে পড়বেন। একেই বলে কসর, অর্থাৎ নামাজ সংক্ষিপ্ত করা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে প্রচলিত হানাফি মাজহাব অনুযায়ী মুসাফির হওয়ার জন্য দুটি শর্ত পূরণ হতে হয়। প্রথমত, অন্তত ৪৮ মাইল, অর্থাৎ প্রায় ৭৭ থেকে ৭৮ কিলোমিটার দূরত্বে যাওয়ার নিয়তে ঘর থেকে বের হতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের শহর বা গ্রামের বসতি এলাকা পেরিয়ে যেতে হবে। বাড়ির দরজা পেরোলেই কসর শুরু হয় না।
ফজরের দুই রাকাত আর মাগরিবের তিন রাকাতে কোনো পরিবর্তন নেই। বিতরও তিন রাকাতই থাকবে। কসর কেবল চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজে।
কোরআন ও হাদিসে কসরের ভিত্তি
সফরে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার অনুমতি কোরআনেই এসেছে। সূরা নিসার ১০১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা যখন জমিনে সফর করো, তখন নামাজ সংক্ষিপ্ত করলে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।
বিজ্ঞাপন
আয়াতে শত্রুর ভয়ের কথাও আছে। সে কারণে হজরত উমর (রা.) একবার জানতে চেয়েছিলেন, এখন তো নিরাপদ সময়, তবু কেন আমরা কসর করি। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) উত্তর দিয়েছিলেন:
এটি একটি সদকা, যা আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। অতএব তোমরা তাঁর সদকা গ্রহণ করো।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কসর ভয় বা যুদ্ধের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; নিরাপদ সফরেও এটি প্রযোজ্য। মহানবী (সা.) নিজে সব সফরেই চার রাকাতের নামাজ দুই রাকাত পড়েছেন বলে সাহাবিরা বর্ণনা করেছেন।
কসরের দূরত্ব কত এবং কখন থেকে শুরু
বিজ্ঞাপন
হানাফি ফিকহে সফরের ন্যূনতম দূরত্ব ধরা হয়েছে তিন দিনের মাঝারি গতির পথ। পরবর্তী আলেমরা একে মাইলে হিসাব করে ৪৮ মাইল নির্ধারণ করেছেন, যা কিলোমিটারে প্রায় ৭৮। অন্যান্য মাজহাবে দূরত্বের হিসাব কিছুটা ভিন্ন, তবে বাংলাদেশে এই হিসাবই অনুসরণ করা হয়।
দূরত্ব মাপা হয় যাত্রাপথ ধরে, মানচিত্রে সরলরেখায় নয়। যে রাস্তায় আপনি আসলে যাচ্ছেন, সেই পথের দৈর্ঘ্যই বিবেচ্য। বাস বা ট্রেনে কত সময় লাগল, সেটি বিষয় নয়। বিমানে এক ঘণ্টায় পৌঁছালেও দূরত্ব শর্ত পূরণ করলে আপনি মুসাফির।
কসর শুরু হয় নিজের এলাকার শেষ বসতি পার হওয়ার পর। ঢাকার কোনো বাসিন্দা সায়েদাবাদ টার্মিনালে বসে থাকলে তিনি এখনো মুকিম, অর্থাৎ স্থায়ী বাসিন্দা। শহরের সীমা পেরিয়ে গেলে তখন থেকে কসর।
মুসাফির কখন আবার পূর্ণ নামাজ পড়বেন
বিজ্ঞাপন
গন্তব্যে পৌঁছানোর পর নিয়মটি নির্ভর করে কত দিন থাকার নিয়ত, তার ওপর। হানাফি মাজহাবে:
১. পনেরো দিনের কম থাকার নিয়ত: কোনো এক জায়গায় পনেরো দিনের কম থাকার নিয়ত করলে পুরো সময় কসর করবেন।
২. পনেরো দিন বা বেশি থাকার নিয়ত: এক জায়গায় পনেরো দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করলে পৌঁছানোর পর থেকেই পূর্ণ নামাজ পড়তে হবে।
৩. অনিশ্চিত অবস্থান: আজ যাব, কাল যাব করে থেকে যাওয়া হলে, যত দিনই হোক, কসর চলবে। কারণ পনেরো দিনের নিয়ত কখনো করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
৪. নিজের বাড়ি বা স্থায়ী নিবাস: যাত্রাপথে নিজের জন্মস্থান বা স্থায়ী বাড়িতে ঢুকলে সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বেন, এক দিনের জন্য গেলেও।
৫. ফেরার পথে: নিজের শহরের বসতি এলাকায় ঢুকলেই কসর শেষ। তখন থেকে স্বাভাবিক নামাজ।
কসর কি বাধ্যতামূলক, নাকি ঐচ্ছিক
এখানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। হানাফি মাজহাবে কসর ওয়াজিব। মুসাফিরের জন্য চার রাকাতের ফরজ দুই রাকাতই, তাই জেনেশুনে চার রাকাত পড়া ঠিক নয়। কেউ ভুলে চার রাকাত পড়ে ফেললে এবং দ্বিতীয় রাকাতে তাশাহহুদ পরিমাণ বসে থাকলে ফরজ আদায় হয়ে যায়, শেষ দুই রাকাত নফল গণ্য হয়, তবে সাহু সিজদা দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
শাফেয়ি ও অন্য কয়েকটি মাজহাবে কসরকে ছাড় হিসেবে দেখা হয়, অর্থাৎ চাইলে পূর্ণ নামাজও পড়া যায়। বাংলাদেশের মুসল্লিরা সাধারণত হানাফি মত অনুসরণ করেন, তাই এখানে সেভাবেই ব্যাখ্যা করা হলো।
সফরে সুন্নত নামাজ পড়বেন কি
সুন্নত ও নফল নামাজে কসর নেই। পড়লে পুরো রাকাতই পড়বেন। প্রশ্ন হলো, পড়বেন কি না।
ফকিহরা বলেন, চলন্ত অবস্থায় বা তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকলে সুন্নত ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু কোথাও থেমে স্বস্তিতে থাকলে সুন্নত পড়াই উত্তম। ফজরের দুই রাকাত সুন্নতকে আলেমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। মহানবী (সা.) সফরেও এটি ছাড়তেন না বলে বর্ণনা আছে। তাই সম্ভব হলে ফজরের সুন্নত পড়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
বিতর ওয়াজিব, এটি সফরেও পড়তে হবে এবং তিন রাকাতই।
জামাত, কাজা ও দুই ওয়াক্ত একসঙ্গে পড়া
সফরে মসজিদে জামাতে নামাজ পড়লে দুটি পরিস্থিতি তৈরি হয়।
১. মুকিম ইমামের পেছনে মুসাফির: ইমাম স্থানীয় হলে তিনি চার রাকাত পড়াবেন। মুসাফির মুক্তাদি তাঁর অনুসরণে পুরো চার রাকাতই পড়বেন।
বিজ্ঞাপন
২. মুসাফির ইমামের পেছনে মুকিম: ইমাম মুসাফির হলে দুই রাকাতে সালাম ফেরাবেন। নিয়ম হলো, নামাজের আগে বা পরে তিনি জানিয়ে দেবেন যে তিনি মুসাফির, আপনারা নামাজ পূর্ণ করে নিন। স্থানীয় মুক্তাদিরা তখন উঠে বাকি দুই রাকাত পড়বেন, এই দুই রাকাতে সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো কিরাত পড়বেন না; ফাতিহা পড়তে যতক্ষণ লাগে, ততক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে রুকু-সিজদা করবেন।
সফরে থাকা অবস্থায় কোনো চার রাকাতের নামাজ কাজা হয়ে গেলে বাড়ি ফিরে তা দুই রাকাতই কাজা করবেন। উল্টোভাবে, বাড়িতে থাকতে যে নামাজ কাজা হয়েছে, সফরে তা আদায় করলে চার রাকাত পড়তে হবে। কাজা হয় যে অবস্থায় নামাজ ফরজ হয়েছিল, সেই হিসেবে।
অনেকে সফরে জোহর-আসর বা মাগরিব-এশা একসঙ্গে পড়েন। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে সফরে দুই ওয়াক্ত একত্রে পড়ার অনুমতি আছে। হানাফি মাজহাবে আরাফা ও মুজদালিফা ছাড়া প্রকৃত অর্থে এক ওয়াক্তের নামাজ আরেক ওয়াক্তে পড়া যায় না। তবে এক ওয়াক্তের শেষ সময়ে প্রথম নামাজ, আর পরের ওয়াক্তের শুরুতে দ্বিতীয় নামাজ পড়ার সুযোগ আছে, যাতে বাহ্যিকভাবে দুটি কাছাকাছি হয়ে যায়।
যাত্রাপথে নামাজ আদায়ের বাস্তব পরামর্শ
বিজ্ঞাপন
দূরপাল্লার বাস সাধারণত কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় বিরতি দেয়। সেখানে নামাজের জায়গা থাকলে বিরতির শুরুতেই ওজু করে নিন। খাবারের লাইনে দাঁড়ানোর আগে নামাজ সেরে ফেললে সময় নিয়ে চাপ থাকে না।
ট্রেনে দাঁড়িয়ে কিবলামুখী হয়ে নামাজ পড়া সম্ভব হলে সেভাবেই পড়বেন। ফরজ নামাজে দাঁড়ানো ও কিবলামুখী হওয়া জরুরি। একেবারে অসম্ভব হলে বসে পড়ার অনুমতি আছে। কিবলা খুঁজতে মোবাইলের কম্পাস অ্যাপ কাজে আসে। লঞ্চে সাধারণত নামাজের আলাদা জায়গা থাকে।
নারী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি যাওয়ার দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটারের বেশি হলে এবং বাবার বাড়ি স্থায়ী নিবাস না থাকলে, সেখানে পনেরো দিনের কম থাকার নিয়তে কসর করবেন। বিষয়টি পরিবারভেদে জটিল হতে পারে, তাই নির্দিষ্ট অবস্থার জন্য স্থানীয় আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে গেলে কি কসর করা যাবে?
না। হানাফি মত অনুযায়ী দূরত্ব অন্তত প্রায় ৭৮ কিলোমিটার হতে হবে। এর কম দূরত্বে পূর্ণ নামাজ পড়বেন।
চাকরির কারণে প্রতি সপ্তাহে দূরের শহরে যাতায়াত করি, তখন কী নিয়ম?
যাতায়াতের পথে এবং সেই শহরে পনেরো দিনের কম থাকলে কসর করবেন। তবে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের ঘর বানিয়ে নিলে বা পনেরো দিন বা বেশি থাকার নিয়ত করলে পূর্ণ নামাজ।
বিজ্ঞাপন
ভুলে চার রাকাত পড়ে ফেললে কি আবার পড়তে হবে?
দ্বিতীয় রাকাতে বৈঠক করে থাকলে ফরজ আদায় হয়ে গেছে, শেষে সাহু সিজদা দিতে হতো। বৈঠক না করে থাকলে নামাজটি আবার দুই রাকাত পড়ে নেওয়া উচিত।
সফরে কি জুমার নামাজ পড়তে হয়?
মুসাফিরের ওপর জুমা ফরজ নয়, তিনি জোহর দুই রাকাত পড়বেন। তবে মসজিদে জুমায় শরিক হলে জুমা আদায় হয়ে যায় এবং তা উত্তম।