বিতর নামাজের নিয়ম: তিন রাকাত, দোয়া কুনুত ও সময়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
এশার নামাজ শেষ করে অনেকে মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান, অথচ দিনের শেষ নামাজটি তখনো বাকি থাকে। সেটি বিতর। গ্রামে একে অনেকে বলেন বেতের নামাজ। বাংলাদেশে প্রচলিত হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বিতর নামাজ ওয়াজিব, অর্থাৎ ফরজের কাছাকাছি গুরুত্বের। ইচ্ছা করে ছেড়ে দেওয়া গুনাহ, আর ছুটে গেলে কাজা করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
বিতর নামাজ তিন রাকাত, এক সালামে পড়তে হয়। প্রথম দুই রাকাত সাধারণ নামাজের মতো। দ্বিতীয় রাকাতে প্রথম বৈঠক করে তাশাহহুদ পড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়। তৃতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ার পর কান পর্যন্ত হাত তুলে তাকবির বলে আবার হাত বেঁধে দোয়া কুনুত পড়তে হয়, তারপর রুকু।
এটুকুই মূল কাঠামো। নিচে প্রতিটি ধাপ, সময়, নিয়ত, দোয়া কুনুতের উচ্চারণ ও ভুল হলে করণীয় আলাদা করে দেওয়া হলো।
বিতর নামাজের সময়
বিতরের সময় শুরু হয় এশার ফরজ নামাজ আদায়ের পর এবং শেষ হয় সুবহে সাদিক, অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগে। এশার আগে বিতর পড়লে তা আদায় হয় না।
বিজ্ঞাপন
কখন পড়া উত্তম, এ বিষয়ে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস আছে। তার সারকথা হলো, যে আশঙ্কা করে শেষ রাতে উঠতে পারবে না, সে যেন রাতের শুরুতেই বিতর পড়ে নেয়। আর যে শেষ রাতে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী, সে যেন শেষ রাতে পড়ে, কারণ শেষ রাতের নামাজে ফেরেশতারা উপস্থিত থাকেন।
তাই যাঁরা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন, তাঁরা তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়তে পারেন। বাকিদের জন্য এশার পরপরই বিতর পড়ে ঘুমানো নিরাপদ। ঘুমের ভরসায় রেখে দিয়ে ফজর পর্যন্ত গড়িয়ে গেলে বিতর কাজা হয়ে যায়।
ধাপে ধাপে বিতর নামাজ পড়ার নিয়ম
১. নিয়ত: মনে মনে ঠিক করুন যে আপনি বিতরের তিন রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছেন। মুখে আরবি নিয়ত বলা জরুরি নয়; অন্তরের সংকল্পই নিয়ত।
বিজ্ঞাপন
২. প্রথম রাকাত: তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধুন, সানা পড়ুন, আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা এবং তার সঙ্গে অন্য একটি সূরা বা কয়েকটি আয়াত পড়ুন। তারপর রুকু ও দুই সিজদা।
৩. দ্বিতীয় রাকাত: উঠে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ুন, রুকু-সিজদা করে বসুন। এই বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ, অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু পড়ে দাঁড়িয়ে যাবেন। দরুদ পড়বেন না।
৪. তৃতীয় রাকাতের কিরাত: সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা পড়ুন। বিতরের তিন রাকাতেই ফাতিহার সঙ্গে সূরা মেলানো ওয়াজিব।
৫. কুনুতের তাকবির: কিরাত শেষে রুকুতে না গিয়ে দুই হাত কান পর্যন্ত তুলে আল্লাহু আকবার বলুন, তারপর আবার নাভির নিচে হাত বাঁধুন।
বিজ্ঞাপন
৬. দোয়া কুনুত: হাত বাঁধা অবস্থায় নিচু স্বরে দোয়া কুনুত পড়ুন।
৭. শেষ অংশ: এরপর রুকু, দুই সিজদা, শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
নারীরাও একই নিয়মে পড়বেন। হাত বাঁধা ও বসার ধরনে নারীদের জন্য হানাফি ফিকহে যে পার্থক্য আছে, অন্য নামাজের মতো বিতরেও তা প্রযোজ্য।
দোয়া কুনুত আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের মসজিদ ও মাদরাসায় হানাফি মাজহাব অনুযায়ী যে দোয়া কুনুত পড়া হয়, সেটি এই:
اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِي عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلَا نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ، اللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّي وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ وَنَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা, ওয়া নাসতাগফিরুকা, ওয়া নু'মিনু বিকা, ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা, ওয়া নুসনি আলাইকাল খাইর, ওয়া নাশকুরুকা, ওয়ালা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাউ ওয়া নাতরুকু মাইঁ ইয়াফজুরুক। আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না'বুদু, ওয়ালাকা নুসাল্লি ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাসআ ওয়া নাহফিদু, ওয়া নারজু রাহমাতাকা, ওয়া নাখশা আজাবাকা, ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমরা তোমার কাছে সাহায্য চাই, তোমার কাছে ক্ষমা চাই, তোমার প্রতি ঈমান আনি, তোমার ওপর ভরসা করি এবং তোমার উত্তম প্রশংসা করি। আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি, অকৃতজ্ঞ হই না। যে তোমার অবাধ্য হয়, আমরা তাকে পরিত্যাগ করি ও তার সঙ্গ ছাড়ি। হে আল্লাহ, আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি, তোমার জন্যই নামাজ পড়ি ও সিজদা করি, তোমার দিকেই ছুটে চলি ও তৎপর থাকি। আমরা তোমার রহমতের আশা করি এবং তোমার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই তোমার শাস্তি কাফেরদের ওপর আপতিত হবে।
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণে আরবি হরফের সব ধ্বনি ধরা যায় না। তাই দোয়াটি কোনো হাফেজ বা ইমামের কাছে শুনে শুদ্ধ করে নেওয়া ভালো।
দোয়া কুনুত না জানলে কী করবেন
নতুন নামাজি বা যাঁরা এখনো মুখস্থ করতে পারেননি, তাঁদের জন্য ফকিহরা সহজ বিকল্প বলেছেন। দোয়া কুনুতের জায়গায় কোরআনের পরিচিত দোয়া "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান নার" পড়া যায়। অথবা তিনবার "আল্লাহুম্মাগফিরলি" (হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো) বলা যায়।
তবে এটিকে স্থায়ী সমাধান না বানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব মূল দোয়া কুনুত মুখস্থ করে নেওয়া উচিত। দিনে একটি করে বাক্য মুখস্থ করলে দুই সপ্তাহের মধ্যেই পুরো দোয়া আয়ত্তে চলে আসে।
বিজ্ঞাপন
বিতরে কোন সূরা পড়বেন
যেকোনো সূরা পড়লেই নামাজ আদায় হবে। তবে আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসাঈর বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) বিতরের প্রথম রাকাতে সূরা আলা (সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আলা), দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়তেন। মাঝেমধ্যে এই তিনটি সূরা পড়লে সুন্নাহর অনুসরণ হয়। সব সময় একই সূরা নির্দিষ্ট করে নেওয়া জরুরি নয়।
ভুল হলে করণীয় ও কাজার বিধান
১. কুনুত ভুলে গেলে: কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে গেলে আর ফিরে আসবেন না। নামাজ শেষে সাহু সিজদা দিলেই চলবে।
বিজ্ঞাপন
২. কুনুত মনে না পড়লে: দাঁড়িয়ে মনে করতে না পারলে উপরে বলা বিকল্প দোয়া পড়ে রুকুতে যান।
৩. দ্বিতীয় রাকাতে বৈঠক ভুলে গেলে: পুরোপুরি দাঁড়িয়ে গেলে আর বসবেন না, শেষে সাহু সিজদা দেবেন।
৪. বিতর ছুটে গেলে: হানাফি মতে বিতর কাজা করা ওয়াজিব। সূর্যোদয়, ঠিক দুপুর ও সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় বাদে যেকোনো সময় তিন রাকাত কাজা পড়ে নিন, কুনুতসহ।
রমজানে জামাতে বিতর এবং মাজহাবগত পার্থক্য
বিজ্ঞাপন
রমজানে তারাবির পর জামাতের সঙ্গে বিতর পড়া হয়। তখন ইমাম উচ্চ স্বরে কিরাত পড়েন, আর মুক্তাদিরা নিজেরা নিচু স্বরে দোয়া কুনুত পড়েন। রমজানের বাইরে বিতর সাধারণত একা পড়া হয়।
অন্য মাজহাবে বিতরকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ধরা হয় এবং এক রাকাত বিতরও বৈধ বলা হয়। কোথাও কোথাও রুকুর পর কুনুত পড়া হয় এবং দোয়ার শব্দও ভিন্ন। এসব মতভেদ সাহাবিদের যুগ থেকে চলে আসা ইজতিহাদি বিষয়। বাংলাদেশের মুসল্লিরা হানাফি পদ্ধতিতে পড়েন, তাই এখানে সেটিই বলা হলো। বিদেশে অন্য পদ্ধতির ইমামের পেছনে পড়তে হলে স্থানীয় আলেমের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিতর নামাজ কত রাকাত?
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে বিতর তিন রাকাত, এক সালামে। দুই রাকাত পরে বৈঠক করে তৃতীয় রাকাতে কুনুত পড়তে হয়।
তাহাজ্জুদ পড়তে চাইলে বিতর আগে পড়ব না পরে?
শেষ রাতে উঠতে পারবেন বলে নিশ্চিত হলে তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়া উত্তম। নিশ্চিত না হলে এশার পরই পড়ে নিন। আগে বিতর পড়ে থাকলেও রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া যায়, তখন আর বিতর দ্বিতীয়বার পড়বেন না।
বিতর কি বসে পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
বিতর ওয়াজিব হওয়ায় দাঁড়িয়ে পড়াই নিয়ম। অসুস্থতা বা দাঁড়াতে অক্ষমতার কারণে বসে পড়ার অনুমতি আছে।
দোয়া কুনুত কি মুখে জোরে পড়তে হয়?
না, একা পড়লে বা জামাতে, দুই অবস্থাতেই দোয়া কুনুত নিচু স্বরে পড়াই হানাফি নিয়ম।