কাপ্তাই লেক ভ্রমণ: কখন যাবেন, কীভাবে যাবেন, কী দেখবেন
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
নীল পানি, চারপাশে সবুজ পাহাড়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ আর তার ওপর পাহাড়ি মানুষের ঘরবাড়ি। কাপ্তাই লেকে ট্রলারে বসে কয়েক ঘণ্টা কাটালে বোঝা যায়, কেন রাঙামাটিকে অনেকে হ্রদের শহর বলেন। এই লেক প্রাকৃতিক নয়। ষাটের দশকে কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপর জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাঁধ দেওয়া হলে বিশাল এলাকা পানিতে ডুবে এই হ্রদ তৈরি হয়। এটিই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ।
বিজ্ঞাপন
কাপ্তাই লেক কোথায় অবস্থিত, এ প্রশ্নের সোজা উত্তর হলো রাঙামাটি পার্বত্য জেলায়। তবে লেকটি এত বড় যে এর একেক অংশ একেক উপজেলায় ছড়িয়ে আছে। পর্যটকেরা সাধারণত দুই জায়গা থেকে লেক দেখেন: রাঙামাটি শহর থেকে, যেখানে ঝুলন্ত সেতু, শুভলং আর রেস্টুরেন্ট-দ্বীপগুলো কাছে; আর কাপ্তাই উপজেলা থেকে, যেখানে বাঁধ, জাতীয় উদ্যান আর শান্ত লেকপাড়।
যাঁরা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য রাঙামাটি শহরকে ঘাঁটি বানানোই সহজ। থাকার জায়গা, খাবার আর ট্রলার, তিনটিই সেখানে হাতের কাছে পাওয়া যায়।
কখন গেলে কাপ্তাই লেক সবচেয়ে সুন্দর
লেকের রূপ মৌসুমভেদে অনেকটা বদলায়। বর্ষার শেষভাগ থেকে শরৎ, মানে মোটামুটি জুলাই থেকে নভেম্বর, লেক থাকে কানায় কানায় ভরা। এ সময় পাহাড় সবুজ, শুভলং ঝরনায় পানি থাকে, আর আকাশে মেঘের খেলা চলে। ছবি তোলার জন্যও এটিই সেরা সময়।
বিজ্ঞাপন
শীতে, অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, আবহাওয়া আরামদায়ক, কিন্তু পানি কমে যায়। তখন অনেক জায়গায় চর জেগে ওঠে, কিছু নৌপথ সরু হয়ে যায় এবং ঝরনা প্রায় শুকিয়ে যায়। তবু ভিড় আর গরম এড়াতে চাইলে শীতও খারাপ নয়। চৈত্র-বৈশাখে গরম বেশি, পানিও সবচেয়ে কম থাকে, তাই এই সময়টা অনেকে এড়িয়ে চলেন।
ভারী বর্ষণের দিনে পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামার ঝুঁকি থাকে। যাওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নিন।
কাপ্তাই লেক যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে রাঙামাটি: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান ও গাবতলী এলাকা থেকে রাঙামাটির উদ্দেশে এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে, বেশির ভাগ রাতে। পথে সাত থেকে নয় ঘণ্টা লাগতে পারে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা, এসি বাসে এর বেশি।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেনে চট্টগ্রাম, তারপর বাসে: কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে আন্তনগর ট্রেনে চট্টগ্রাম যান। সেখান থেকে অক্সিজেন মোড় বা বহদ্দারহাট এলাকা থেকে রাঙামাটির বাস পাওয়া যায়, সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।
৩. কাপ্তাই উপজেলায় যেতে চাইলে: চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে কাপ্তাইয়ের বাস চলে, দুই ঘণ্টার মতো লাগে। ঢাকা থেকে কিছু বাস সরাসরি কাপ্তাইও যায়।
৪. রাঙামাটি থেকে কাপ্তাই নৌপথে: লেক দিয়ে ট্রলার বা স্পিডবোটে রাঙামাটি থেকে কাপ্তাই যাওয়া যায়। এই পথে লেকের অনেকটা অংশ একসঙ্গে দেখা হয়ে যায়।
রাঙামাটি শহরে পৌঁছে রিজার্ভ বাজার, পর্যটন কমপ্লেক্স বা তবলছড়ি ঘাট থেকে ট্রলার ভাড়া করা যায়।
বিজ্ঞাপন
ট্রলারে কোথায় কোথায় ঘুরবেন
কাপ্তাই লেক ঘোরার মূল মজা নৌকায়। একটা পুরো দিনের ট্রলার নিলে নিচের জায়গাগুলো একসঙ্গে দেখা যায়।
১. শুভলং ঝরনা ও বাজার: রাঙামাটি শহর থেকে ঘণ্টা দেড়েকের নৌপথ। বর্ষায় পাহাড়ের গা বেয়ে পানি নামে, শীতে প্রায় শুকনো। পথে দুই পাশে খাড়া পাহাড়ের সারি এই যাত্রার সবচেয়ে সুন্দর অংশ।
২. লেকের দ্বীপে রেস্টুরেন্ট: লেকের ভেতরে কয়েকটি দ্বীপে পাহাড়ি খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। দুপুরের খাবার সেখানে সেরে নেওয়াই রেওয়াজ।
বিজ্ঞাপন
৩. রাজবন বিহার: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়, লেকের পাড়েই। ভেতরে ঢুকতে জুতা খুলতে হয় এবং শালীন পোশাক পরতে হয়।
৪. ঝুলন্ত সেতু: পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে লেকের দুই পাড় জুড়ে দেওয়া সেতুটি রাঙামাটির পরিচিত প্রতীক।
৫. চাকমা রাজবাড়ি এলাকা: রাজবন বিহারের কাছেই, নৌকা থেকে নেমে অল্প হেঁটে দেখা যায়।
কাপ্তাই অংশে গেলে লেকপাড়ের পিকনিক স্পট, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান আর কায়াকিংয়ের সুযোগ মিলতে পারে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাঁধ সংরক্ষিত এলাকা, সেখানে অনুমতি ছাড়া ঢোকা যায় না।
বিজ্ঞাপন
কাপ্তাই লেক ভ্রমণ খরচ
খরচ নির্ভর করে দলের আকার, মৌসুম আর থাকার মানের ওপর। নিচের হিসাব আনুমানিক এবং সময়ের সঙ্গে বদলায়।
১. যাতায়াত: ঢাকা থেকে রাঙামাটি আসা-যাওয়ায় নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।
২. ট্রলার ভাড়া: শুভলংসহ পুরো দিনের জন্য ছোট-মাঝারি ট্রলার আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, আকার আর দর-কষাকষির ওপর নির্ভর করে। দশ-বারো জনের দলে ভাগ করলে জনপ্রতি খরচ অনেক কমে যায়। ছুটির দিনে ভাড়া বেশি চাওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. থাকা: সাধারণ আবাসিক হোটেলে রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, লেকের দিকে মুখ করা ভালো হোটেল বা রিসোর্টে এর অনেক বেশি।
৪. খাওয়া: সাধারণ রেস্তোরাঁয় বেলাপ্রতি জনপ্রতি আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
সব মিলিয়ে দুই রাত-এক দিনের সাধারণ মানের ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ৪০০০ থেকে ৭০০০ টাকা ধরে রাখা যায়।
থাকা ও খাওয়া
বিজ্ঞাপন
রাঙামাটি শহরে রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি আর পর্যটন এলাকায় নানা দামের আবাসিক হোটেল আছে। সরকারি পর্যটন করপোরেশনের মোটেলও রয়েছে। কাপ্তাইয়ে লেকপাড়ে কিছু রিসোর্ট ও কটেজ আছে, তবে সংখ্যায় কম। ছুটির মৌসুমে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়া ভালো।
খাবারের মধ্যে বাঁশের চোঙে রান্না করা মুরগি বা মাছ, যেটি ব্যাম্বু চিকেন নামে পরিচিত, পাহাড়ি সবজি আর লেকের তাজা মাছ চেখে দেখার মতো। ঝালের মাত্রা আগে জেনে নিন।
লেকের দ্বীপের রেস্টুরেন্টে দুপুরে খেতে চাইলে সকালে যাওয়ার পথেই অর্ডার দিয়ে রাখা ভালো। পাহাড়ি রান্নায় সময় লাগে, ফেরার পথে গিয়ে বসলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে। দাম মেনু দেখে জেনে নিন।
দুই দিনের একটি নমুনা পরিকল্পনা
বিজ্ঞাপন
প্রথম দিন ভোরে রাঙামাটি পৌঁছে হোটেলে ব্যাগ রেখে নাশতা সেরে নিন। সকাল নয়টার মধ্যে ট্রলার নিয়ে শুভলংয়ের দিকে রওনা দিন। ফেরার পথে দ্বীপের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার, তারপর রাজবন বিহার আর চাকমা রাজবাড়ি এলাকা। বিকেলে ঝুলন্ত সেতুতে সূর্যাস্ত দেখে দিন শেষ করুন।
দ্বিতীয় দিন সকালে বাসে বা নৌপথে কাপ্তাই চলে যান। লেকপাড়ে কিছু সময় কাটিয়ে, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের আশপাশ ঘুরে বিকেলে চট্টগ্রামের বাস ধরুন। চট্টগ্রাম থেকে রাতের বাস বা ট্রেনে ঢাকায় ফেরা যায়। এভাবে একই যাত্রায় লেকের দুই প্রান্তই দেখা হয়ে যায়, আর একই পথে ফেরার একঘেয়েমিও থাকে না।
যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
লাইফ জ্যাকেট ছাড়া ট্রলারে উঠবেন না। অনেক নৌকায় জ্যাকেট থাকে, না থাকলে চেয়ে নিন। সাঁতার না জানলে লেকে নামবেন না, পানি অনেক জায়গায় হঠাৎ গভীর।
বিজ্ঞাপন
ট্রলার ভাড়ার সময় কোন কোন জায়গায় যাবেন, কতক্ষণ থাকবেন, ফেরার সময় কখন, সব আগেই ঠিক করে নিন। সন্ধ্যার পর লেকে নৌকা চলাচল সীমিত থাকে।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেট লেকে ফেলবেন না। পার্বত্য এলাকায় কখনো কখনো নিরাপত্তাজনিত নির্দেশনা জারি হয়, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নিন। বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে আলাদা অনুমতির নিয়ম থাকতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কাপ্তাই লেক আর রাঙামাটি লেক কি একই?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। রাঙামাটি শহরের চারপাশের লেক আর কাপ্তাই উপজেলার লেক একই হ্রদের অংশ। কাপ্তাই বাঁধের নামে একে কাপ্তাই লেক বলা হয়।
এক দিনে কি কাপ্তাই লেক ঘোরা সম্ভব?
চট্টগ্রাম থেকে সকালে রওনা দিলে এক দিনে রাঙামাটি বা কাপ্তাইয়ের একটা অংশ ঘুরে ফেরা যায়। ঢাকা থেকে গেলে অন্তত এক রাত থাকাই ভালো, নইলে যাত্রাতেই সময় চলে যায়।
শীতে গেলে কি শুভলং ঝরনা দেখা যাবে?
বিজ্ঞাপন
শীতে ঝরনায় পানি খুব কম থাকে, অনেক সময় শুধু পাথরের দাগ দেখা যায়। ঝরনা দেখতে চাইলে বর্ষা বা বর্ষার পরপর যান।
পরিবার ও শিশু নিয়ে যাওয়া কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, পরিবার নিয়ে অনেকেই যান। শিশুর জন্য আলাদা লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন এবং ট্রলারের কিনারায় বসতে দেবেন না।