চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থান: পাহাড়, সমুদ্র ও ঐতিহ্যের শহর ঘোরার গাইড
ট্রাভেল ডেস্ক · চট্টগ্রাম
প্রকাশ:
একদিকে পাহাড়, একদিকে সমুদ্র, মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কর্ণফুলী। এই তিনের মিলনে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শুধু দেশের প্রধান বন্দরনগরীই নয়, ভ্রমণের দিক থেকেও সম্ভাবনায় ভরা এক শহর। শহরের ভেতরে টিলার ওপর পুরোনো ভবন, মাজার, জাদুঘর, লেক আর সৈকত; শহর থেকে এক-দুই ঘণ্টার পথে পাহাড়ি ঝরনা, মন্দির আর নিরিবিলি সৈকত।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থান মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। শহরের ভেতরে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, ফয়েজ লেক, বায়েজিদ বোস্তামী ও শাহ আমানতের মাজার, জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি আর বাটালি পাহাড়। শহরের বাইরে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ইকোপার্ক, গুলিয়াখালী সৈকত, মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা ও মহামায়া লেক, আর কর্ণফুলীর ওপারে আনোয়ারার পারকি সৈকত।
তিন দিন হাতে থাকলে একদিন শহর, একদিন সীতাকুণ্ড-মিরসরাই আর একদিন পতেঙ্গা-পারকি রেখে চট্টগ্রাম ভ্রমণ গাইড সাজানো যায়।
চট্টগ্রাম কিসের জন্য বিখ্যাত
চট্টগ্রামের পরিচয় প্রথমত বন্দর দিয়ে। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দর দিয়েই হয়। বহু শতাব্দী ধরে আরব, পর্তুগিজসহ নানা দেশের বণিকদের আনাগোনা ছিল এখানে, যার ছাপ এখনো শহরের ভাষা, খাবার আর স্থাপত্যে।
বিজ্ঞাপন
আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কারণে চট্টগ্রামকে বারো আউলিয়ার দেশ বলা হয়। খাবারের দিক থেকে চট্টগ্রামের নাম শুনলেই মেজবানি মাংসের কথা মনে আসে। কালাভুনা, শুঁটকির নানা পদ আর বেলা বিস্কুটও এই শহরের পরিচিত স্বাদ। চট্টগ্রামের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষাও এর আলাদা পরিচয়।
শহরের ভেতরে যেসব জায়গা ঘুরবেন
১. পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত: শহরের দক্ষিণ প্রান্তে, কর্ণফুলীর মোহনা আর বিমানবন্দরের কাছে। বিকেলের সূর্যাস্ত, বহির্নোঙরে জাহাজের সারি আর সৈকতের পাশের ভাজা মাছ-কাঁকড়ার দোকান এর আকর্ষণ। এখানে পানিতে নামা বিপজ্জনক।
২. ফয়েজ লেক: পাহাড়তলী এলাকায় পাহাড়ঘেরা লেক। লেকের পাশে বিনোদন পার্ক ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, যেখানে আলাদা টিকিটে নানা রাইড ও নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। পরিবার নিয়ে দিনের একটা বড় অংশ এখানে কাটানো যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার: নাসিরাবাদের এই মাজার প্রাঙ্গণের পুকুরে বড় আকারের কালো কচ্ছপের জন্য পরিচিত, যেগুলো বিরল প্রজাতির। পুকুরে খাবার ছুড়ে দেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলুন।
৪. হজরত শাহ আমানতের (রহ.) মাজার: শহরের কেন্দ্রে লালদীঘির কাছে। এর নামেই চট্টগ্রামের বিমানবন্দর ও কর্ণফুলীর একটি সেতুর নামকরণ হয়েছে।
৫. জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর: আগ্রাবাদে অবস্থিত এই জাদুঘরে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পোশাক, অলংকার, হাতিয়ার ও জীবনযাপনের নিদর্শন সাজানো আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপযোগী।
৬. কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত বিভিন্ন দেশের সৈনিকদের সমাধিক্ষেত্র। পরিপাটি সবুজ চত্বর আর সারিবদ্ধ সমাধিফলক এক গম্ভীর অনুভূতি তৈরি করে। এখানে শান্ত ও সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশিত।
বিজ্ঞাপন
৭. বাটালি পাহাড় ও পরীর পাহাড়: বাটালি পাহাড় শহরের অন্যতম উঁচু টিলা, ওপর থেকে শহর ও দূরের সমুদ্র দেখা যায়। পরীর পাহাড়ের ওপর ব্রিটিশ আমলের লাল ইটের আদালত ভবন শহরের পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী।
৮. কর্ণফুলীর পাড়: নদীর ঘাট থেকে সাম্পান বা নৌকায় কিছুক্ষণ ঘুরলে বন্দর আর নদীকেন্দ্রিক জীবনের ছবি পাওয়া যায়। নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করুন ও লাইফ জ্যাকেট চেয়ে নিন।
শহরের বাইরে, এক-দুই ঘণ্টার পথে
সীতাকুণ্ড: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে, শহর থেকে আনুমানিক এক থেকে দেড় ঘণ্টা। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় একটি মন্দির আছে, ওঠার পথ খাড়া ও সিঁড়িময়, পুরো ওঠা-নামায় কয়েক ঘণ্টা লাগে। পাশের ইকোপার্কে ঝরনা ও বনপথ। সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সৈকত সবুজ ঘাসে ঢাকা কেওড়াবন আর জোয়ার-ভাটার খালের জন্য ব্যতিক্রমী। বাঁশবাড়িয়া সৈকতও কাছেই।
বিজ্ঞাপন
মিরসরাই: আরও উত্তরে মিরসরাইয়ে খৈয়াছড়া ঝরনা, যা কয়েক ধাপে নেমে এসেছে। যেতে কিছুটা পথ হাঁটতে ও ঝিরি পার হতে হয়, বর্ষা ও বর্ষার পরপর পানি বেশি থাকে। কাছের মহামায়া লেক-এ কায়াকিং ও নৌকাভ্রমণ জনপ্রিয়।
আনোয়ারার পারকি সৈকত: কর্ণফুলীর ওপারে আনোয়ারায় লম্বা ঝাউবনঘেরা সৈকত। নদীর তলদেশের টানেল দিয়ে এখন পতেঙ্গা থেকে খুব কম সময়ে পৌঁছানো যায়।
পাহাড়ি পথ ও ঝরনায় যেতে হলে বর্ষায় পিচ্ছিল পথ ও আকস্মিক ঢলের কথা মাথায় রাখুন, স্থানীয় গাইড নিন এবং সন্ধ্যার আগে ফিরে আসুন।
তিন দিনের একটি নমুনা পরিকল্পনা
বিজ্ঞাপন
প্রথম দিন, শহর: সকালে ওয়ার সিমেট্রি ও জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর। দুপুরে কোনো পরিচিত রেস্তোরাঁয় মেজবানি মাংস বা কালাভুনা দিয়ে খাওয়া। বিকেলে বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার হয়ে ফয়েজ লেক। ফয়েজ লেকে সময় বেশি দিতে চাইলে জাদুঘর বাদ দিয়ে সকাল থেকেই সেখানে যেতে পারেন।
দ্বিতীয় দিন, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই: খুব ভোরে রওনা দিয়ে প্রথমে খৈয়াছড়া ঝরনা বা চন্দ্রনাথ পাহাড়, যেকোনো একটি। দুটিতেই হাঁটা ও চড়াই আছে, তাই একই দিনে দুটি রাখলে ক্লান্তি বেশি হয়। বিকেলে গুলিয়াখালী সৈকতে ভাটার সময় সবুজ ঘাসের মাঠ আর খালের দৃশ্য দেখে শহরে ফেরা।
তৃতীয় দিন, পতেঙ্গা ও পারকি: দুপুরের পর টানেল পেরিয়ে পারকি সৈকতে কিছুক্ষণ, তারপর ফিরে পতেঙ্গায় সূর্যাস্ত। সন্ধ্যায় সৈকতের পাশে ভাজা মাছ খেয়ে রাতের ট্রেন বা বাসে ঢাকায় ফেরা।
শীতে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, এই পরিকল্পনা সবচেয়ে আরামদায়ক। ঝরনা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ দিক ভালো, তবে তখন পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে।
বিজ্ঞাপন
যাতায়াত, থাকা ও খরচ
ঢাকা থেকে: কমলাপুর থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, তূর্ণা নিশীথাসহ কয়েকটি আন্তনগর ট্রেন, সময় লাগে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা। শোভন চেয়ারের ভাড়া আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও আরামবাগ থেকে বাস, নন-এসিতে আনুমানিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। আকাশপথে এক ঘণ্টার কম।
শহরের ভেতরে: সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিং ও লোকাল বাস। দিনভিত্তিক সিএনজি রিজার্ভ নিলে কয়েকটি জায়গা একসঙ্গে ঘোরা যায়। সীতাকুণ্ড-মিরসরাই যেতে ঢাকাগামী মহাসড়কের লোকাল বাসও কাজে লাগে।
থাকা: আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, স্টেশন রোড ও নাসিরাবাদ এলাকায় নানা মানের হোটেল। সাধারণ হোটেলে দুই শয্যার কক্ষ আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
তিন দিনের সফরে ঢাকা থেকে জনপ্রতি আনুমানিক ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকায় সাধারণ মানে চট্টগ্রাম ঘোরা যায়, দলে গেলে কম পড়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চট্টগ্রামে ঘোরার জায়গা কোনগুলো?
শহরে পতেঙ্গা সৈকত, ফয়েজ লেক, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার, জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, ওয়ার সিমেট্রি ও বাটালি পাহাড়। শহরের বাইরে সীতাকুণ্ড, গুলিয়াখালী, খৈয়াছড়া ঝরনা, মহামায়া লেক ও পারকি সৈকত।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম কিসের জন্য বিখ্যাত?
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, পাহাড়-নদী-সমুদ্রের মিলন, বারো আউলিয়ার ঐতিহ্য আর মেজবানি মাংসের জন্য।
চট্টগ্রাম ঘুরতে কয়দিন লাগে?
শহরের মূল জায়গাগুলোর জন্য এক-দুই দিন, সঙ্গে সীতাকুণ্ড-মিরসরাই যোগ করলে তিন দিন রাখুন।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রাম ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া আরামদায়ক, পাহাড়ে ওঠা ও সৈকতে ঘোরা সহজ। ঝরনায় বেশি পানি দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ ভাগ বেছে নিন, তবে ভারী বৃষ্টির দিনে পাহাড়ি পথ এড়িয়ে চলুন।
চট্টগ্রাম থেকে কি কক্সবাজার ও বান্দরবান যাওয়া সহজ?
হ্যাঁ। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ট্রেন ও বাসে যাওয়া যায়, আর বহদ্দারহাট থেকে বান্দরবানের বাস ছাড়ে। তাই অনেকে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গন্তব্য মিলিয়ে সফর সাজান।