বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান: বিভাগভিত্তিক সেরা ভ্রমণ গন্তব্যের তালিকা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
ছোট একটি দেশ, অথচ এক দিনের পথের ব্যবধানে মেলে বিশ্বের দীর্ঘ প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটি, সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনের একটি, মেঘে ঢাকা পাহাড়, চা বাগান, হাওর আর হাজার বছরের পুরোনো প্রত্নস্থান। বাংলাদেশ ঘুরে দেখার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে নিজের দেশটাকেই আগে চিনে নেওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান বলতে প্রথমেই আসে কক্সবাজারের সৈকত, সুন্দরবন, সিলেটের জাফলং-রাতারগুল-শ্রীমঙ্গল আর পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও সাজেক। ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে আছে নওগাঁর পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা আর বগুড়ার মহাস্থানগড়। এর বাইরেও প্রতিটি বিভাগে এমন অনেক জায়গা আছে, যেগুলো কম পরিচিত হলেও কম সুন্দর নয়।
নিচে বিভাগভিত্তিক তালিকা দেওয়া হলো। প্রতিটি বিভাগের জন্য দুই-তিন দিন হাতে রাখলে মূল জায়গাগুলো আরাম করে দেখা যায়।
ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ
রাজধানী ঘিরেই ইতিহাসের বড় ভান্ডার। পুরান ঢাকায় মোগল আমলের অসমাপ্ত দুর্গ লালবাগ কেল্লা, বুড়িগঙ্গার তীরে নবাবদের প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল, আর্মেনীয় গির্জা ও তারা মসজিদ এক দিনেই দেখা যায়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও, যা একসময় বাংলার রাজধানী ছিল, সেখানে লোকশিল্প জাদুঘর আর পানাম নগরের পুরোনো বাড়ির সারি দেখার মতো।
বিজ্ঞাপন
শহরের ভেতরে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর, মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, আর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপত্য দেখার মতো। সংসদ ভবন খ্যাতিমান স্থপতি লুই আই কানের নকশায় তৈরি, বাইরে থেকেই এর জ্যামিতিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে। রাজধানীর কাছে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শালবনের জন্য পরিচিত, আর সাভারে আছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। টাঙ্গাইলের মহেড়া জমিদারবাড়ি ও আতিয়া মসজিদও দিনের ভ্রমণের ভালো গন্তব্য।
ময়মনসিংহ বিভাগে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও বিরিশিরি এলাকায় সোমেশ্বরী নদী, সাদা-নীলচে মাটির পাহাড় আর গারো পাহাড়ের সীমান্তঘেঁষা দৃশ্য মন ভরিয়ে দেয়। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্র, ময়মনসিংহ শহরের শশী লজ ও ব্রহ্মপুত্রের পাড় আর মুক্তাগাছার জমিদারবাড়িও এই বিভাগের পরিচিত জায়গা। মুক্তাগাছায় গেলে সেখানকার বিখ্যাত মন্ডা চেখে আসতে ভুলবেন না।
চট্টগ্রাম বিভাগ
দেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় অংশ এই বিভাগে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ও ইনানী তো আছেই। প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ, তবে পরিবেশ রক্ষায় সরকার সেখানে পর্যটক যাতায়াতের মৌসুম ও সংখ্যা সীমিত করেছে, তাই যাওয়ার আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে নীলগিরি, নীলাচল, চিম্বুক, বগা লেক ও নাফাখুম; রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু ও শুভলং ঝরনা; আর খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয় মেঘের রাজ্য সাজেকে। পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তার কারণে মাঝে মাঝে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ থাকে, তাই রওনার আগে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পতেঙ্গা সৈকত, ফয়েজ লেক আর বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার; কাছেই সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা। কুমিল্লার ময়নামতিতে শালবন বিহারসহ প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার নিদর্শন, আর চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনার মোহনা ইলিশের শহরের অন্য রকম রূপ দেখায়।
সিলেট বিভাগ
সবুজ আর পানির বিভাগ সিলেট। সিলেট জেলার জাফলং, বিছনাকান্দি ও ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর-এ মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি আর পাথর; গোয়াইনঘাটের রাতারগুল জলাবন; জৈন্তাপুরের লালাখাল-এর নীলচে সবুজ পানি। শহরে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার অনেকের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য।
বিজ্ঞাপন
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল চায়ের রাজধানী, সেখানে চা বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবপুর লেক। একই জেলার বড়লেখায় মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর বর্ষায় সাগরের মতো বিস্তৃত, হাউসবোটে রাত কাটানো এখন জনপ্রিয়। কাছেই তাহিরপুরের নীলাদ্রি লেক ও শিমুল বাগান। হাওরের সৌন্দর্য বর্ষায়, আর শিমুল বাগানের ফুল ফোটে বসন্তে।
খুলনা ও বরিশাল বিভাগ
খুলনা বিভাগের গর্ব সুন্দরবন, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের একটি এবং ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। খুলনা বা মোংলা থেকে লঞ্চ বা জাহাজে দুই-তিন দিনের প্যাকেজে করমজল, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্টের মতো জায়গা ঘোরা যায়। সুন্দরবনে বন বিভাগের অনুমতি ও অভিজ্ঞ ট্যুর অপারেটর ছাড়া যাওয়া যায় না।
বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও খানজাহান আলীর (রহ.) মাজার এলাকাও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের আখড়া আর শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, যশোরের সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক বাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের টানে।
বিজ্ঞাপন
বরিশাল বিভাগে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, যেখানে একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটিই দেখা যায়। বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘি ও উজিরপুরের গুঠিয়া মসজিদ, আর পিরোজপুর-ঝালকাঠি-বরিশালের খালে বর্ষায় বসা ভাসমান পেয়ারা বাজার এই অঞ্চলের ভিন্ন স্বাদ। ঢাকা থেকে রাতের লঞ্চে বরিশাল যাত্রাও এক অভিজ্ঞতা।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ
উত্তরের এই দুই বিভাগ ইতিহাস আর প্রত্নতত্ত্বে সমৃদ্ধ। নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, অর্থাৎ সোমপুর মহাবিহার, ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য। বগুড়ার মহাস্থানগড় দেশের প্রাচীনতম নগরস্থানগুলোর একটি, আর সেখানকার কটকটি বিখ্যাত। রাজশাহীর পুঠিয়া মন্দির চত্বর, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ও পদ্মার পাড়ের সন্ধ্যা শান্ত শহরটিকে আলাদা করে তোলে। গ্রীষ্মে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানও অনেকে ঘুরতে যান।
রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি, দিনাজপুরের পোড়ামাটির অলংকরণে সাজানো কান্তজির মন্দির ও রামসাগর দিঘি এই বিভাগের প্রধান আকর্ষণ। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে হেমন্ত ও শীতের শুরুতে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া দেখা যায়। কাছেই বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর আর সমতলের চা বাগান।
বিজ্ঞাপন
ভ্রমণ পরিকল্পনার কিছু পরামর্শ
মৌসুম বুঝে গন্তব্য: সমুদ্র ও পাহাড়ের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে আরামদায়ক। হাওর, ঝরনা, রাতারগুল ও সিলেটের পাথুরে নদীর আসল রূপ বর্ষায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে অক্টোবর-নভেম্বর।
ছুটির ভিড় এড়ান: ঈদ, পূজা ও ডিসেম্বরের শেষে জনপ্রিয় জায়গাগুলোতে ভিড় আর খরচ দুটোই অনেক বেড়ে যায়। সম্ভব হলে সপ্তাহের মাঝের দিনে যান।
পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন: পার্বত্য ও সীমান্ত এলাকায় চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
হালনাগাদ নিয়ম জানুন: সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন ও পার্বত্য এলাকার মতো সংবেদনশীল জায়গায় প্রবেশের নিয়ম বদলায়। স্থানীয় প্রশাসন বা নির্ভরযোগ্য ট্যুর অপারেটরের কাছ থেকে জেনে নিন।
দায়িত্বশীল পর্যটন: প্লাস্টিক ফেলবেন না, ঐতিহাসিক স্থাপনায় নাম লিখবেন না, স্থানীয় মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতিকে সম্মান করুন। এসব জায়গা পরের প্রজন্মের জন্যও টিকিয়ে রাখতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র কোনটি?
বিজ্ঞাপন
পর্যটকের সংখ্যার দিক থেকে কক্সবাজার সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর পরেই সিলেট, বান্দরবান, রাঙামাটি-সাজেক ও কুয়াকাটার নাম আসে।
বাংলাদেশে ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য কোনগুলো?
সুন্দরবন, বাগেরহাটের মসজিদের শহর (ষাট গম্বুজ মসজিদসহ) এবং নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার।
কম সময়ে কোন জায়গা ঘোরা ভালো?
বিজ্ঞাপন
দুই দিন হাতে থাকলে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল, সোনারগাঁও বা ময়মনসিংহের দুর্গাপুর ভালো বিকল্প। তিন-চার দিন থাকলে কক্সবাজার, সিলেট বা বান্দরবান।
পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য কোন জায়গা উপযুক্ত?
কক্সবাজার, শ্রীমঙ্গল, সিলেট শহর ও আশপাশ, কুয়াকাটা এবং রাঙামাটি পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য তুলনামূলক সহজ। দুর্গম ট্রেকিংয়ের জায়গা শিশু ও বয়স্কদের জন্য উপযুক্ত নয়।
বর্ষায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া ভালো?
বিজ্ঞাপন
বর্ষায় সিলেটের রাতারগুল, বিছনাকান্দি, জাফলং, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এবং বরিশাল অঞ্চলের ভাসমান পেয়ারা বাজার সবচেয়ে সুন্দর রূপে থাকে। তবে ভারী বর্ষণ ও বন্যার সতর্কতা থাকলে যাত্রা পিছিয়ে দিন।