রাঙামাটি ঝুলন্ত সেতু: কোথায়, কীভাবে যাবেন ও ঘোরার টিপস
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
লাল রঙের রেলিং দেওয়া সরু একটা সেতু, নিচে কাপ্তাই লেকের সবুজ-নীল পানি। হাঁটার সময় পায়ের নিচে সেতুটা হালকা দোলে। রাঙামাটির পরিচয় দিতে গেলে যে ছবিটা সবার আগে আসে, সেটি এই ঝুলন্ত সেতুর। রাঙামাটি শহরে গেলে প্রায় সবাই অন্তত একবার এখানে হেঁটে আসেন।
বিজ্ঞাপন
রাঙামাটি ঝুলন্ত সেতু কোথায় অবস্থিত, তা জানতে চাইলে বলতে হয় শহরের দক্ষিণ প্রান্তে, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে। সেতুটি লেকের দুই পাশের দুটি টিলাকে যুক্ত করেছে। দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩৫ ফুট বলে প্রচলিত। শহরের যেকোনো জায়গা থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিতে অল্প সময়ে এখানে আসা যায়।
সেতুটি দেখতে আধা ঘণ্টার বেশি লাগে না, তাই একে আলাদা গন্তব্য না ভেবে রাঙামাটি সফরের একটা অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করাই ভালো। একই দিনে নৌকায় শুভলং, রাজবন বিহার আর লেকের দ্বীপগুলোও ঘোরা যায়।
রাঙামাটি ঝুলন্ত সেতু যাওয়ার উপায়
প্রথম ধাপ হলো রাঙামাটি শহরে পৌঁছানো। এরপর সেতুতে যাওয়া খুবই সহজ।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা থেকে বাসে: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান বা গাবতলী থেকে রাঙামাটির সরাসরি বাস পাওয়া যায়। বেশির ভাগ বাস রাতে ছেড়ে ভোরে পৌঁছায়, পথে সাত থেকে নয় ঘণ্টা লাগে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা।
২. ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে: আন্তনগর ট্রেনে চট্টগ্রাম পৌঁছে অক্সিজেন মোড় থেকে রাঙামাটির বাস ধরুন। এই পথে সময় একটু বেশি লাগলেও ট্রেনযাত্রা অনেকের কাছে আরামদায়ক।
৩. চট্টগ্রাম থেকে: অক্সিজেন বা বহদ্দারহাট থেকে প্রতি কিছুক্ষণ পরপর বাস ছাড়ে, আড়াই থেকে তিন ঘণ্টায় রাঙামাটি পৌঁছায়।
৪. শহর থেকে সেতুতে: রিজার্ভ বাজার, বনরূপা বা তবলছড়ি থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় পর্যটন কমপ্লেক্সে যান। ভাড়া আনুমানিক ৫০ থেকে ১৫০ টাকা, দূরত্ব ও দর-কষাকষির ওপর নির্ভর করে।
বিজ্ঞাপন
৫. নৌপথে: লেকে ট্রলার ভাড়া নিলে চালককে বলুন পর্যটন ঘাটে নামাতে। নৌকা থেকেই সেতুর সুন্দর ছবি তোলা যায়।
প্রবেশ, সময় ও যা জানা দরকার
পর্যটন কমপ্লেক্সে ঢুকতে সাধারণত একটি ছোট প্রবেশ টিকিট কাটতে হয়। টিকিটের দাম আনুমানিক কয়েক ডজন টাকার মধ্যে, তবে কর্তৃপক্ষ সময়ে সময়ে তা বদলায়। কমপ্লেক্সটি সাধারণত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে।
একটা বিষয় অনেকেই জানেন না। ভারী বর্ষণে বা লেকের পানি অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সেতুর পাটাতন পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেছে। তখন নিরাপত্তার কারণে সেতুতে চলাচল বন্ধ রাখা হয়। বর্ষার ভরা মৌসুমে যাওয়ার আগে তাই স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিন সেতু খোলা আছে কি না।
বিজ্ঞাপন
একসঙ্গে অনেক মানুষ উঠলে সেতু বেশি দোলে। ভিড়ের সময় একটু অপেক্ষা করে তারপর উঠুন, রেলিং ধরে হাঁটুন।
কখন গেলে ভালো লাগবে
বর্ষার পর থেকে শরৎ পর্যন্ত লেক ভরা থাকে, চারপাশের পাহাড় থাকে সবুজ। তখন সেতুর নিচে পানির রং আর পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি সবচেয়ে সুন্দর লাগে। শীতে পানি কমে যায়, সেতুর নিচে কাদা বা চর দেখা যেতে পারে, তবে আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে।
দিনের মধ্যে সকাল আর বিকেল সবচেয়ে ভালো সময়। সকালে ভিড় কম, আলো নরম। বিকেলে সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়লে লেকের পানিতে সোনালি আভা পড়ে। দুপুরে রোদ কড়া, ছায়াও কম। সরকারি ছুটির দিনে এবং ঈদের সময় প্রচুর ভিড় হয়।
বিজ্ঞাপন
আশপাশে আর যা দেখবেন
১. শুভলং ঝরনা: ট্রলারে দেড় ঘণ্টার মতো পথ, বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর।
২. রাজবন বিহার: বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান বিহার, শান্ত পরিবেশ।
৩. চাকমা রাজবাড়ি: রাজবন বিহারের কাছেই লেকের পাড়ে।
বিজ্ঞাপন
৪. ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের জাদুঘর: পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পোশাক, অলংকার আর ব্যবহার্য জিনিসের সংগ্রহ দেখা যায়।
৫. পলওয়েল পার্ক ও লেকপাড়ের বিনোদনকেন্দ্র: বিকেল কাটানোর জন্য ভালো, পরিবার নিয়ে গেলে শিশুরা উপভোগ করে।
৬. তবলছড়ি ও বনরূপা বাজার: পাহাড়ি তাঁতের কাপড়, হস্তশিল্প আর স্থানীয় ফল কেনার জায়গা।
রাঙামাটি ঝুলন্ত সেতু ভ্রমণ খরচ
বিজ্ঞাপন
সেতু দেখার খরচ সামান্য, মূল খরচ রাঙামাটি যাওয়া-আসা আর থাকায়। নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক, মৌসুম ও সময়ভেদে বদলায়।
১. ঢাকা-রাঙামাটি আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।
২. শহরের ভেতরে যাতায়াত: সারা দিনে আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।
৩. প্রবেশ টিকিট: জনপ্রতি অল্প কিছু টাকা।
বিজ্ঞাপন
৪. ট্রলার ভাড়া: লেক ঘুরতে চাইলে পুরো দিনের জন্য আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, দলে ভাগ করে নেওয়া যায়।
৫. থাকা: সাধারণ হোটেলে রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে সরকারি মোটেলও আছে, যেখানে থাকলে সকালে ভিড়ের আগেই সেতুতে হাঁটা যায়।
সেতুকে ঘিরে এক দিনের সাজানো রুটিন
যাঁরা রাতের বাসে গিয়ে ভোরে রাঙামাটি নামবেন, তাঁরা দিনটা এভাবে সাজাতে পারেন। সকালে নাশতা সেরে সরাসরি পর্যটন কমপ্লেক্সে চলে যান। এ সময় ভিড় সবচেয়ে কম থাকে, তাই সেতুতে নিশ্চিন্তে হাঁটা ও ছবি তোলা যায়। এরপর পর্যটন ঘাট বা কাছের কোনো ঘাট থেকে ট্রলার নিয়ে শুভলংয়ের দিকে রওনা দিন।
বিজ্ঞাপন
ফেরার পথে লেকের কোনো দ্বীপের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নিন। বিকেলে রাজবন বিহার আর রাজবাড়ি এলাকা দেখে শহরে ফিরুন। সন্ধ্যার আগে আবার লেকপাড়ে বসলে সূর্যাস্তের আলোয় সেতুর আরেক রূপ দেখা যায়। রাতে তবলছড়ি বা বনরূপায় পাহাড়ি খাবার আর কেনাকাটা সেরে পরদিন ফিরতে পারেন, কিংবা রাতের বাসেই ঢাকার পথ ধরতে পারেন।
ছবি তোলার শখ থাকলে সেতুর মাঝখান থেকে দুই পাশের লেক, আর লেকপাড়ের টিলা থেকে পুরো সেতুর বাঁক ধরার চেষ্টা করুন। নৌকা থেকে নিচু কোণে তোলা ছবিতে সেতুটা সবচেয়ে নাটকীয় দেখায়। ড্রোন ওড়াতে চাইলে আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়ে খোঁজ নিন, কারণ পার্বত্য এলাকায় এ নিয়ে বিধিনিষেধ থাকতে পারে।
ছোট কিছু পরামর্শ
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে লাফানো বা ইচ্ছা করে দোলানো বিপজ্জনক, অন্যদের জন্যও অস্বস্তিকর। সেলফি তোলার সময় রেলিংয়ের বাইরে ঝুঁকবেন না।
বিজ্ঞাপন
পানির বোতল বা চিপসের প্যাকেট লেকে ফেলবেন না। কমপ্লেক্সে ডাস্টবিন আছে। বর্ষায় ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন, আর পিচ্ছিল সিঁড়িতে সাবধানে হাঁটুন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কারও ছবি তুলতে চাইলে আগে অনুমতি নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাঙামাটি ঝুলন্ত সেতু দেখতে কত সময় লাগে?
সেতু পার হওয়া আর ছবি তোলায় আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা যথেষ্ট। কমপ্লেক্সে বসে লেক দেখতে চাইলে আরও কিছু সময় রাখুন।
বিজ্ঞাপন
বর্ষায় কি সেতু বন্ধ থাকে?
সব সময় নয়। তবে লেকের পানি খুব বেড়ে গেলে সেতু ডুবে যেতে পারে এবং তখন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। ভরা বর্ষায় যাওয়ার আগে খোঁজ নিয়ে যান।
শিশু বা বয়স্কদের জন্য কি সেতু নিরাপদ?
সাধারণভাবে নিরাপদ, তবে সেতু দোলে বলে কারও কারও অস্বস্তি লাগতে পারে। শিশুর হাত ধরে রাখুন এবং ভিড় কম থাকলে পার হোন।
বিজ্ঞাপন
সেতুটি কাপ্তাই উপজেলায় নাকি রাঙামাটি শহরে?
সেতুটি রাঙামাটি শহরের পর্যটন কমপ্লেক্সে। কাপ্তাই আলাদা উপজেলা, সেখানে যেতে শহর থেকে আরও সময় লাগে।