বেলে মাছ কেন বালির নিচে থাকে
নদীর তলদেশে ছদ্মবেশে থাকা বেলে মাছের বৈশিষ্ট্য ও তাদের টিকে থাকার সংকট নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন।
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ভোরবেলা নদীর ঘাটে জেলেদের জালে নানা রঙের ও আকৃতির মাছ দেখা যায়। কোনোটা রুপালি, কোনোটা লম্বাটে, আবার কোনোটা কাঁটায় ভরা। এর মধ্যে বেলে মাছ নামে একটি মাছ আছে, যার গায়ের রং বালির মতো ধূসর-বাদামি এবং তার ওপর গাঢ় ছোপ থাকায় হঠাৎ তাকালে সহজে চোখ পড়ে না। মাছটি কেন বালির কাছে বা নিচে থাকে, তা বুঝতে হলে আগে এর জীবনধারা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
বেলে মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Glossogobius giuris এবং এরা গোবি পরিবারের মাছ। আমাদের নদী, খাল, বিল ও পুকুরে একসময় এদের প্রচুর দেখা যেত, এমনকি মোহনার লোনাপানিতেও এরা টিকে থাকতে পারে। লম্বায় সাধারণত ১৫-২০ সেন্টিমিটার হলেও কোনো কোনোটা আরও বড় হয়। এদের মাথা চ্যাপটা, মুখ বড় এবং চোখ মাথার ওপরের দিকে বসানো থাকে। পিঠে দুটো আলাদা পাখনা থাকলেও অন্য অনেক মাছের মতো এরা সারাক্ষণ ভেসে বেড়ায় না, বরং বেশির ভাগ সময় নদীর তলায় কাটায়।
বেলের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো লুকিয়ে থাকা, যেখানে বালু ও কাদার রঙের সঙ্গে গায়ের রং মিলে যাওয়ায় তাকে ওপর থেকে বোঝাই যায় না। একে বলা হয় ‘ছদ্মবেশ’, যা বক, মাছরাঙা বা বড় মাছের হাত থেকে তাদের রক্ষা করে। আবার বেলে নিজেও শিকারি; সে চুপচাপ পড়ে থেকে ছোট মাছ, চিংড়ি বা পোকার লার্ভা কাছে এলে এক ঝটকায় ঝাঁপ দেয়। নড়াচড়া করলে শিকারির চোখে পড়ার ভয় থাকে বলে বেলে ছোট ছোট লাফে চলে এবং কয়েক হাত গিয়ে আবার থেমে যায়।
বেলের শরীর নদীর তলায় থাকার উপযোগী করে তৈরি। গোবি পরিবারের মাছের নিচের দিকের পাখনা জোড়া লেগে চোষকের মতো একটি অংশ তৈরি করে, যার সাহায্যে তারা শক্ত কিছুর গায়ে আটকে থাকতে পারে এবং স্রোত জোরালো হলেও ভেসে যায় না। এছাড়া অনেক মাছের শরীরে বায়ুথলি থাকলেও গোবি জাতীয় মাছের তা থাকে না বা থাকলেও খুব ছোট হয়। তাই ভেসে থাকার চেয়ে তলায় থাকাই এদের জন্য বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের।
নদীর তলা বেলের কাছে শুধু লুকোনোর জায়গা নয়, এটি তাদের ঘরও। ডিম পাড়ার সময় এরা নিরাপদ ও আড়ালের জায়গা বেছে নেয়। গোবি পরিবারের অনেক মাছ পাথর বা গর্তের গায়ে ডিম আটকে রাখে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে তারাও তলার কাছাকাছি বড় হয়। বেলে ছোট প্রাণী খায় এবং নিজেও বড় মাছ ও পাখির খাবার হয়, অর্থাৎ খাদ্যশৃঙ্খলের ঠিক মাঝখানে তার অবস্থান। এই কড়া খুলে গেলে ওপরে-নিচে দুই দিকেই প্রভাব পড়ে।
বিজ্ঞাপন
আমাদের নদীগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বালু সরে গেলে বা কাদা অন্য রকম হয়ে গেলে মাছের আশ্রয় থাকে না। নদীর তলায় শুধু বেলে নয়, শামুক, ছোট চিংড়ি ও নানা পোকার লার্ভাও থাকে, যাদের থেকে বেলের খাবার আসে। তলদেশ নষ্ট হলে সবাই একসঙ্গে বিপদে পড়ে। বর্তমানে যন্ত্র দিয়ে বালু তোলা হলে নদীর তলদেশ ওলটপালট হয়ে যায়, পানি ঘোলা হয় এবং ছোট প্রাণী মরে যায় বা সরে পড়ে। নদী ভরাট হলে গভীরতা কমে যায়, বিশেষ করে শুকনা মৌসুমে অনেক জায়গায় পানিই থাকে না। এছাড়া কচুরিপানা, দূষণ ও কারখানার বর্জ্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। বেলে খেতে সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদাও অনেক, ফলে একদিকে আবাস নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধরার চাপ বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী তালিকায় প্রজাতিটি এখনো ঝুঁকিতে ধরা না হলেও, এলাকাভেদে সংখ্যা কমার কথা জেলেরা বলেন। প্রবীণদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, আগের মতো সহজে বেলে মেলে না। দেশে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের আইন থাকলেও অনেক জায়গায় তা ঠিকমতো মানা হয় না বলে অভিযোগ ওঠে। নদী বাঁচাতে হলে আইন মানা ও নজরদারি দুটোই জরুরি। বেলে আসলে নদীর স্বাস্থ্যের একটি ইঙ্গিত। যে নদীর তলদেশ ঠিক আছে এবং পানি পরিষ্কার, সেখানেই এমন মাছ টিকে থাকে। মাছ কমে গেলে বুঝতে হয় নদীর কোথাও গোলমাল হয়েছে। নদী একটি বড় ঘর আর তার মেঝেটাই হলো বালু ও কাদা; মেঝে ভেঙে গেলে বাসিন্দারা থাকবে কোথায়? বেলে মাছ সেই প্রশ্নটাই আমাদের সামনে রেখে যায়।