উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপায়: খাবার, লবণ আর জীবনযাপনের নিয়ম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
উচ্চ রক্তচাপ এমন এক সমস্যা, যা বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ক্ষতি করে যেতে পারে। অনেকে প্রথম জানতে পারেন অন্য কোনো কারণে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে প্রেসার মাপানোর পর। অথচ নিয়ন্ত্রণে না রাখলে এটি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক আর কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
সুখবর হলো, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো বেশির ভাগই আমাদের হাতে। খাবারে লবণ কমানো, প্রতিদিন হাঁটা, ওজন কমানো, ধূমপান ও তামাক ছাড়া, পর্যাপ্ত ঘুম আর মানসিক চাপ সামলানো, এই কয়েকটি অভ্যাস প্রেসার কমাতে প্রমাণিতভাবে কাজ করে। যাঁদের চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছেন, তাঁদের জন্য এসব অভ্যাস ওষুধের পরিপূরক, বিকল্প নয়।
প্রেসার কত হলে উচ্চ রক্তচাপ
রক্তচাপ দুটি সংখ্যায় লেখা হয়। ওপরেরটি সিস্টোলিক, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ড যখন রক্ত পাম্প করে তখনকার চাপ। নিচেরটি ডায়াস্টোলিক, দুই স্পন্দনের মাঝে বিশ্রামের সময়ের চাপ। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ১২০/৮০ বা তার কাছাকাছি স্বাভাবিক ধরা হয়।
একাধিক দিনে মেপে সাধারণত ১৪০/৯০ বা তার বেশি পাওয়া গেলে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়। কিছু আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় ১৩০/৮০ থেকেই সতর্ক হতে বলা হয়। একবার বেশি এলেই ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই; দৌড়ঝাঁপ, দুশ্চিন্তা বা চা-কফির পরপর মাপলে সংখ্যা বেশি আসতে পারে। তবে বারবার বেশি এলে চিকিৎসকের কাছে যান।
বিজ্ঞাপন
কাদের ঝুঁকি বেশি, সেটাও জেনে রাখা ভালো। বয়স চল্লিশ পেরোলে, মা-বাবা বা ভাইবোনের উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, ওজন বেশি হলে, ডায়াবেটিস বা কিডনির সমস্যা থাকলে, ধূমপান করলে এবং দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটালে উচ্চ রক্তচাপের আশঙ্কা বাড়ে। এই দলের মানুষদের লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত প্রেসার মাপানো উচিত।
হাই প্রেসারের লক্ষণ
বেশির ভাগ মানুষের কোনো লক্ষণই থাকে না, এ কারণেই নিয়মিত মাপা জরুরি। কারও কারও মাথার পেছনে ভার, মাথাব্যথা, ঘাড়ে টান, মাথা ঘোরা বা অস্থিরতা লাগতে পারে। তবে এসব লক্ষণ দিয়ে প্রেসার বোঝা যায় না, মেশিনে মাপতেই হয়।
কিছু উপসর্গ জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত দেয়: তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ এক পাশের হাত-পা অবশ লাগা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা মুখ বেঁকে যাওয়া। এমন হলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।
বিজ্ঞাপন
লবণ কমানো: সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ
আমাদের খাবারে লবণের ব্যবহার অনেক বেশি। ভাতের পাতে কাঁচা লবণ নেওয়া, আচার, চানাচুর, চিপস, নোনা বিস্কুট, ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর ফাস্টফুডে প্রচুর সোডিয়াম থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে পাঁচ গ্রামের কম লবণ খেতে বলে, যা মোটামুটি এক চা-চামচের সমান। এর মধ্যে রান্নার লবণও ধরা।
১. পাতে কাঁচা লবণ বন্ধ করুন: এটি সবচেয়ে সহজ শুরু। প্রথম দুই সপ্তাহ খাবার পানসে লাগবে, পরে জিভ অভ্যস্ত হয়ে যায়।
২. রান্নায় ধীরে ধীরে কমান: হঠাৎ অর্ধেক না করে প্রতি সপ্তাহে একটু করে কমালে পরিবারের অন্যরাও টের পান না।
বিজ্ঞাপন
৩. স্বাদের বিকল্প ব্যবহার করুন: লেবুর রস, ধনেপাতা, পুদিনা, রসুন, আদা আর ভাজা জিরার গুঁড়া খাবারে স্বাদ আনে, লবণের অভাব কম বোঝা যায়।
৪. প্যাকেটজাত খাবার কমান: সস, স্যুপের প্যাকেট, প্রক্রিয়াজাত মাংস, শুঁটকি আর নোনা ইলিশে লবণ অনেক বেশি।
প্রেসার কমানোর খাবার
প্লেটের অর্ধেক ভরুন শাকসবজি দিয়ে। লালশাক, পালংশাক, কলমি শাক, লাউ, ঝিঙে, পটোল, ঢ্যাঁড়স, টমেটো, গাজর সবই উপকারী। এসব খাবারে পটাশিয়াম, আঁশ আর নানা খনিজ থাকে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
ফলের মধ্যে কলা, পেয়ারা, পেঁপে, কমলা, আপেল, ডাব ভালো বিকল্প। ডাল, ছোলা, বাদাম আর বীজজাতীয় খাবার পরিমিত খান। মাছ, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ সপ্তাহে কয়েক দিন রাখুন। চর্বিযুক্ত গরু-খাসির মাংস, ঘি, ডালডা আর ভাজাপোড়া কমান। সাদা ভাতের পরিমাণ কমিয়ে লাল চাল বা লাল আটার রুটি খেতে পারেন। টক দই ও ননিতোলা দুধও খাবার তালিকায় রাখা যায়।
একটি সতর্কতা: যাঁদের কিডনির রোগ আছে বা যাঁরা কিছু নির্দিষ্ট প্রেসারের ওষুধ খান, তাঁদের পটাশিয়াম বেশি খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাঁরা খাদ্যতালিকা বদলানোর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
ঘরোয়া উপায়ে প্রেসার কমানো: জীবনযাপনের অভ্যাস
হাঁটা ও ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি গতিতে হাঁটা, অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা করে, রক্তচাপ কমাতে বেশ কার্যকর। এমন গতিতে হাঁটুন, যাতে কথা বলা যায় কিন্তু গান গাওয়া কষ্টকর হয়।
বিজ্ঞাপন
ওজন নিয়ন্ত্রণ: পেটের মেদ বেশি থাকলে প্রেসারও বাড়ে। কয়েক কেজি ওজন কমালেই অনেকের রক্তচাপ লক্ষণীয়ভাবে কমে।
ধূমপান ও তামাক ছাড়ুন: সিগারেট, জর্দা, সাদাপাতা, গুল সবই রক্তনালির ক্ষতি করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ঘুম ও মানসিক চাপ: রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমান। নাক ডাকা আর ঘুমের মধ্যে দম আটকে আসার সমস্যা থাকলে চিকিৎসককে জানান, এটি প্রেসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জন্য রাখুন, প্রার্থনা, হালকা শ্বাসের ব্যায়াম বা পরিবারের সঙ্গে গল্প মানসিক চাপ কমায়।
চা-কফি পরিমিত: অতিরিক্ত ক্যাফেইন সাময়িকভাবে প্রেসার বাড়াতে পারে। দিনে এক-দুই কাপের বেশি না খাওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত মাপা আর ওষুধ নিয়ে জরুরি কথা
ঘরে মাপার সঠিক নিয়ম: ডিজিটাল মেশিন থাকলে ঘরেই নিয়মিত মাপা যায়। মাপার আগে পাঁচ মিনিট চুপচাপ বসে থাকুন। আধা ঘণ্টা আগে চা-কফি, ধূমপান বা ব্যায়াম করবেন না। পিঠ হেলান দিয়ে বসুন, পা মাটিতে সমান রাখুন, হাত টেবিলে হৃৎপিণ্ডের সমান উচ্চতায় রাখুন। কাফ খালি হাতের ওপর বাঁধুন, জামার হাতার ওপর নয়। এক মিনিট বিরতি দিয়ে দুবার মেপে গড় লিখে রাখুন। এই খাতা চিকিৎসকের কাছে গেলে দেখান।
কত দিন পরপর মাপবেন, তা নির্ভর করে অবস্থার ওপর। যাঁদের প্রেসার স্বাভাবিক, তাঁরা অন্তত বছরে একবার মাপান। যাঁদের প্রেসার ধরা পড়েছে বা নতুন ওষুধ শুরু হয়েছে, তাঁদের চিকিৎসক সাধারণত কিছুদিন নিয়মিত মেপে লিখে রাখতে বলেন। মেশিন কেনার সময় বাহুতে বাঁধার ধরন বেছে নিন, কবজির মেশিনে ভুল আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। মোটা বাহুর জন্য বড় মাপের কাফ লাগে, ছোট কাফে সংখ্যা বেশি আসে।
ওষুধ খাওয়ার নিয়ম: চিকিৎসক ওষুধ দিলে প্রতিদিন একই সময়ে খান। প্রেসার স্বাভাবিক হয়ে গেলেও নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না; অনেক সময় ওষুধের কারণেই প্রেসার স্বাভাবিক থাকে। অন্যের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ খাওয়া, দোকান থেকে নিজে ওষুধ কেনা বা ডোজ বদলানো বিপজ্জনক। ওষুধে মাথা ঘোরা, পা ফোলা বা কাশির মতো সমস্যা হলে চিকিৎসককে জানান, তিনি প্রয়োজনে ওষুধ বদলে দেবেন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রেসার বাড়লে তেঁতুল বা টক খেলে কি কমে?
এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। হঠাৎ প্রেসার অনেক বেড়ে গেলে টক খাওয়ার ওপর ভরসা না করে বিশ্রাম নিন, আবার মাপুন এবং উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।
কম বয়সে কি উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। ওজন বেশি, পরিবারে ইতিহাস, অতিরিক্ত লবণ, ধূমপান আর শুয়ে-বসে থাকার অভ্যাসে তরুণদেরও হয়। তাই ১৮ বছরের পর থেকে মাঝেমধ্যে প্রেসার মাপা ভালো।
গর্ভাবস্থায় প্রেসার বাড়লে কী করব?
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশু দুজনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা বা হাত-মুখ ফুলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যান।
প্রেসারের ওষুধ কি সারা জীবন খেতে হয়?
বিজ্ঞাপন
অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে খেতে হয়। তবে জীবনযাপন বদলালে কারও কারও ওষুধের মাত্রা কমানো যায়। সে সিদ্ধান্ত শুধু চিকিৎসকই নেবেন।