ডায়াবেটিস রোগীর খাবার তালিকা: কী খাবেন, কতটুকু খাবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর বেশির ভাগ মানুষের প্রথম প্রশ্ন: ভাত কি একেবারে ছেড়ে দিতে হবে? উত্তর হলো, না। ভাত, রুটি, ফল সবই খাওয়া যায়, তবে পরিমাণ, সময় আর সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটাই আসল। ডায়াবেটিস রোগীর খাবার তালিকা মানে না খেয়ে থাকা নয়, বরং মেপে আর বুঝে খাওয়া।
বিজ্ঞাপন
সহজ একটি নিয়ম মনে রাখুন। খাবারের প্লেটকে চার ভাগ করুন। অর্ধেক ভরুন শাকসবজি দিয়ে, এক ভাগে রাখুন মাছ, মুরগি, ডিম বা ডাল, আর বাকি এক ভাগে ভাত বা রুটি। সঙ্গে চিনি ও মিষ্টি পানীয় বাদ দিন, দিনে তিন বেলা মূল খাবার আর প্রয়োজনে দুটি হালকা নাশতা নির্দিষ্ট সময়ে খান।
প্রত্যেকের ওজন, বয়স, কাজের ধরন আর ওষুধ আলাদা। তাই এখানকার পরামর্শ সাধারণ দিকনির্দেশনা। নিজের জন্য সঠিক ক্যালরি ও খাবারের পরিমাণ ঠিক করতে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলুন।
কেন খাবারই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল
আমরা যে শর্করা খাই, তা ভেঙে গ্লুকোজ হয়ে রক্তে মেশে। ডায়াবেটিসে শরীর এই গ্লুকোজ ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারে না, ফলে রক্তে সুগার বেড়ে যায়। একসঙ্গে অনেক বেশি শর্করা খেলে সুগার দ্রুত লাফিয়ে ওঠে। আবার দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে, বিশেষ করে যাঁরা ইনসুলিন বা কিছু ওষুধ নেন, তাঁদের সুগার বিপজ্জনকভাবে নেমে যেতে পারে। তাই নিয়মিত সময়ে পরিমিত খাওয়াই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর।
বিজ্ঞাপন
কী খাবেন: শাকসবজি, আমিষ আর ফল
শাকসবজি: লাউ, চালকুমড়া, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পটোল, ঢ্যাঁড়স, করলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, শসা, টমেটো, পেঁপে (কাঁচা), ডাঁটা এবং সব ধরনের শাক। এগুলোতে আঁশ বেশি, শর্করা কম। সালাদ দিয়ে খাওয়া শুরু করলে পেট তাড়াতাড়ি ভরে, ভাতও কম লাগে।
আমিষ: মাছ, চামড়া ছাড়া মুরগি, ডিম, ডাল, ছোলা, টক দই। আমিষ খাবার শর্করার শোষণ ধীর করে, ফলে সুগার হঠাৎ বাড়ে না।
স্বাস্থ্যকর চর্বি: অল্প পরিমাণ বাদাম, তিসি বা চিয়া বীজ, রান্নায় সয়াবিন, সরিষা বা অলিভ তেল পরিমিত।
বিজ্ঞাপন
ফল: ফল একেবারে বাদ দেওয়ার দরকার নেই। পেয়ারা, আপেল, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, নাশপাতি, আমড়া, জামরুল তুলনামূলক ভালো বিকল্প। আম, কাঁঠাল, লিচু, পাকা কলা আর আঙুরে চিনি বেশি; এগুলো খেলে অল্প পরিমাণে, যেমন আমের দুই-তিনটি টুকরো। ফল মূল খাবারের সঙ্গে না খেয়ে দুই বেলার মাঝে নাশতা হিসেবে খাওয়া ভালো। দিনে দুই থেকে তিনটি ছোট পরিবেশন যথেষ্ট।
পানি: তৃষ্ণা পেলে পানিই সবচেয়ে ভালো পানীয়। সুগার বেশি থাকলে প্রস্রাব বেশি হয়, শরীর পানিশূন্য হতে পারে, তাই সারা দিন অল্প অল্প করে পানি খান। কিডনি বা হৃদরোগের কারণে চিকিৎসক পানি সীমিত করতে বললে সেটিই মানুন।
ভাত, রুটি ও শর্করা কতটুকু
ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই। অনেক পুষ্টিবিদ এক বেলায় এক থেকে দেড় কাপ রান্না করা ভাত খেতে পরামর্শ দেন, তবে ওজন ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী এটি কমবেশি হয়। সাদা চালের চেয়ে লাল চাল বা ঢেঁকিছাঁটা চাল ভালো, কারণ এতে আঁশ বেশি। আটার রুটি খেলে লাল আটা বেছে নিন। মাঝারি আকারের দুটি রুটি সাধারণত এক বেলার জন্য যথেষ্ট ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
আলু, মিষ্টি আলু, চিড়া, মুড়ি, সুজি, নুডলস আর পাউরুটিও শর্করা। এগুলো খেলে সেই বেলায় ভাত বা রুটি কমিয়ে দিন। অর্থাৎ ভাতের সঙ্গে আলুভর্তা আর আলুর তরকারি একসঙ্গে খেলে শর্করার পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
ডায়াবেটিস রোগীর নিষেধ খাবার
১. চিনি ও মিষ্টি: রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপি, পায়েস, কেক, চিনি দেওয়া চা। একান্ত খেতে চাইলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে খুব অল্প পরিমাণে, ভারী খাবারের পরপর।
২. মিষ্টি পানীয়: কোমল পানীয়, প্যাকেটের জুস, এনার্জি ড্রিংক, শরবত। এগুলো সুগার সবচেয়ে দ্রুত বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
৩. ফলের রস: ফল খেলে আস্ত খান, রস করে নয়। রস করলে আঁশ চলে যায়, আর এক গ্লাসে কয়েকটি ফলের চিনি একসঙ্গে ঢোকে।
৪. ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড: সিঙারা, পুরি, পরোটা, বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। এগুলো ওজন বাড়ায়, আর ওজন বাড়লে সুগার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়।
৫. গুড়, মধু ও খেজুর বেশি পরিমাণে: অনেকে ভাবেন চিনির বদলে গুড় বা মধু নিরাপদ। আসলে এগুলোও সুগার বাড়ায়।
সুগার কমানোর খাবার নিয়ে ভুল ধারণা: করলার রস, মেথি ভেজানো পানি, দারুচিনি বা নিমপাতা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। এসব খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, কিন্তু কোনোটিই ওষুধের বিকল্প নয় এবং কোনো খাবার খেয়ে ডায়াবেটিস সেরে যায় না। এসবের ওপর ভরসা করে ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ করলে সুগার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
রান্নার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ: একই সবজি ডুবো তেলে ভাজলে আর অল্প তেলে রান্না করলে ক্যালরির পার্থক্য অনেক। তরকারিতে তেল মেপে দিন, ভাজির বদলে ঝোল, ভাপা বা সেদ্ধ পদ বেশি রাখুন। মাছ-মাংস ভাজার চেয়ে রান্না বা গ্রিল করা ভালো।
এক দিনের নমুনা খাবার তালিকা
সকাল: দুটি লাল আটার রুটি, এক বাটি সবজি, একটি সেদ্ধ ডিম। চিনি ছাড়া চা।
মধ্য সকাল: একটি মাঝারি পেয়ারা বা আপেল, অথবা এক মুঠো বাদাম।
বিজ্ঞাপন
দুপুর: এক কাপ ভাত, এক বাটি শাক বা সবজি, এক টুকরো মাছ, এক বাটি পাতলা ডাল, শসা-টমেটোর সালাদ।
বিকেল: এক বাটি টক দই বা অল্প মুড়ির সঙ্গে ছোলা ও শসা।
রাত: দুটি রুটি বা পরিমিত ভাত, মুরগির তরকারি, সবজি। রাতের খাবার ঘুমের অন্তত দুই ঘণ্টা আগে।
খাবারের বাইরে আরও যা মানবেন
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন, পারলে খাওয়ার পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন। নিয়মিত সুগার মেপে খাতায় লিখুন। দাঁত, চোখ, পা আর কিডনির পরীক্ষা সময়মতো করান। দাওয়াত বা উৎসবের দিনে পুরো নিয়ম ভেঙে না ফেলে প্লেটের নিয়মটি মনে রাখুন: আগে সালাদ ও সবজি, তারপর মাছ-মাংস, শেষে অল্প পোলাও বা ভাত।
হঠাৎ ঘাম, হাত-পা কাঁপা, বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা বা অস্থিরতা হলে সুগার কমে গেছে কি না মাপুন। মাপার সুযোগ না থাকলে দ্রুত গ্লুকোজ, চিনির পানি বা মিষ্টি কিছু খান। বারবার এমন হলে, কিংবা সুগার দীর্ঘদিন বেশি থাকলে চিকিৎসককে জানান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ডায়াবেটিস রোগী কি আলু খেতে পারবেন?
বিজ্ঞাপন
পারবেন, তবে আলুকে সবজি নয়, শর্করা হিসেবে ধরুন। আলু খেলে সেই বেলায় ভাতের পরিমাণ কমান।
চিনির বদলে সুগার ফ্রি ব্যবহার করা কি নিরাপদ?
পরিমিত মাত্রায় অনুমোদিত কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার করা যায় বলে ধরা হয়। তবে মিষ্টির অভ্যাস ধীরে ধীরে কমানোই সবচেয়ে ভালো।
রোজা রাখা যাবে কি?
বিজ্ঞাপন
অনেক ডায়াবেটিস রোগী রোজা রাখতে পারেন, তবে ওষুধ ও ইনসুলিনের সময় বদলাতে হয়। রমজানের আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।
রাতে রুটি না ভাত, কোনটা ভালো?
দুটোই শর্করা। আসল বিষয় পরিমাণ। রুটি সাধারণত গুনে খাওয়া সহজ, তাই অনেকে রাতে রুটি পছন্দ করেন, তবে লাল চালের পরিমিত ভাতও চলে। যেটায় আপনি পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন, সেটিই বেছে নিন।