দোয়া কি তাকদির পরিবর্তন করতে পারে: কোরআন-হাদিস যা বলে
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"সবই যদি আগে থেকে লেখা থাকে, তাহলে দোয়া করে লাভ কী?" প্রশ্নটি নতুন নয়। সাহাবিরাও মহানবী (সা.)-কে প্রায় একই প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরটি এক বাক্যে বললে: হ্যাঁ, দোয়া তাকদিরকে প্রভাবিত করে, তবে এমনভাবে যা আল্লাহর জ্ঞান ও পরিকল্পনার বাইরে নয়।
বিজ্ঞাপন
তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দোয়া ছাড়া আর কিছু তাকদির ফেরাতে পারে না, আর নেক আমল ছাড়া আর কিছু আয়ু বাড়াতে পারে না। ইবনে মাজাহতেও কাছাকাছি শব্দে হাদিসটি আছে।
আবার একই সঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হলো, আল্লাহ সবকিছু আগে থেকেই জানেন এবং তা লাওহে মাহফুজে লেখা আছে। এই দুই কথার মধ্যে বিরোধ নেই। কেন নেই, সেটি বোঝার জন্য তাকদিরের ধারণাটি একটু খুলে দেখা দরকার।
তাকদির কী এবং কেন এটি ঈমানের অংশ
তাকদির অর্থ নির্ধারণ বা পরিমাপ। আকিদার পরিভাষায়, জগতে যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর জ্ঞান, ইচ্ছা ও নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে জিবরাইল (আ.) যখন ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, মহানবী (সা.) ঈমানের ছয়টি বিষয়ের মধ্যে তাকদিরের ভালো-মন্দে বিশ্বাসকে উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে তাকদিরে বিশ্বাস মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা ও কাজের সামর্থ্য দিয়েছেন, এবং সেই ইচ্ছা ও কাজের জন্যই সে জবাবদিহি করবে। আল্লাহর জ্ঞান মানুষকে কোনো কাজে বাধ্য করে না, বরং মানুষ কী করবে, আল্লাহ তা আগে থেকে জানেন।
একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক বছরের শুরুতেই বুঝতে পারেন কোন ছাত্র ভালো করবে। তাঁর এই জানা ছাত্রকে পরীক্ষায় ফেল করতে বাধ্য করে না। আল্লাহর জ্ঞান তো এর চেয়ে অসীম গুণ নিখুঁত, তবু উদাহরণটি বোঝার জন্য কাজে আসে।
দোয়া তাকদিরকে কীভাবে প্রভাবিত করে
আলেমরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন কয়েকটি স্তরে।
বিজ্ঞাপন
১. দোয়াও তাকদিরের অংশ: আল্লাহ শুধু ফলাফল নির্ধারণ করেননি, ফলাফলের কারণও নির্ধারণ করেছেন। কেউ রোগমুক্ত হবে ওষুধ খেয়ে, এটি যেমন নির্ধারিত, তেমনি কেউ বিপদ থেকে রক্ষা পাবে দোয়ার মাধ্যমে, এটিও নির্ধারিত। তাই দোয়া তাকদিরের বাইরের কিছু নয়, বরং তাকদির বাস্তবায়নের একটি মাধ্যম।
২. লিখিত দুই স্তরের ধারণা: অনেক আলেম তাকদিরকে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন। একটি হলো আল্লাহর চূড়ান্ত জ্ঞানে থাকা অপরিবর্তনীয় তাকদির, যাকে তাকদিরে মুবরাম বলা হয়। আরেকটি হলো ফেরেশতাদের কাছে থাকা শর্তযুক্ত লিখন, যেখানে লেখা থাকে, অমুক ব্যক্তি দোয়া করলে বা সদকা দিলে এমন হবে, না করলে অমন। একে তাকদিরে মুআল্লাক বলা হয়। দোয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন ঘটে এই দ্বিতীয় স্তরে, আর বান্দা দোয়া করবে কি না, তা আল্লাহর চূড়ান্ত জ্ঞানে আগে থেকেই আছে।
৩. কোরআনের ইঙ্গিত: সূরা রাদের ৩৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ যা ইচ্ছা মুছে দেন এবং যা ইচ্ছা বহাল রাখেন, আর তাঁর কাছেই রয়েছে মূল কিতাব। তাফসিরকারকেরা এই আয়াতকে উপরের ব্যাখ্যার পক্ষে উল্লেখ করেছেন।
৪. বিপদের সঙ্গে দোয়ার লড়াই: কিছু বর্ণনায় এসেছে, বিপদ নেমে আসে আর দোয়া তার মোকাবিলা করে। এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে, তবে মূল বক্তব্যটি তিরমিজির উপরোক্ত হাদিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
আয়ু ও রিজিক কি বাড়ে
বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, যে চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। এখানেও একই নীতি কাজ করছে। আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক একটি কারণ, আর আয়ু ও রিজিকে বরকত তার ফল।
আলেমরা আয়ু বৃদ্ধির দুটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, এখানে বরকত বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ অল্প সময়ে বেশি কল্যাণ। কেউ বলেছেন, শর্তযুক্ত লিখনে প্রকৃত সময়ই বাড়ে। দুই ব্যাখ্যাই মূল বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
তাহলে কি চেষ্টা লাগবে না
বিজ্ঞাপন
তাকদির নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হলো, যা হওয়ার তা হবেই, তাই চেষ্টা বা দোয়ার দরকার নেই। সাহাবিরা একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, সব যদি লেখা থাকে, তাহলে আমরা কি লেখার ওপর ভরসা করে আমল ছেড়ে দেব? বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত উত্তরে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, তোমরা আমল করে যাও, যাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেটি সহজ করে দেওয়া হয়।
শামে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার সময় হজরত উমর (রা.) সেখানে প্রবেশ না করে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পালাচ্ছেন? বুখারিতে বর্ণিত উত্তরে উমর (রা.) বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে যাচ্ছি।
তিরমিজির এক হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, তিনি উট বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন, নাকি না বেঁধে ভরসা করবেন। মহানবী (সা.) বলেছিলেন, উট বাঁধো, তারপর ভরসা করো। অর্থাৎ নিজের দিক থেকে করণীয় শেষ করেই তাওয়াক্কুল।
এই কথাগুলোই পুরো বিষয়ের চাবি। সাবধানতা, চিকিৎসা, পরিশ্রম ও দোয়া সবই আল্লাহর নির্ধারিত ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ভালো ফলের দিকে এগোনো।
বিজ্ঞাপন
দোয়ার গুরুত্ব কেন এত বেশি
তিরমিজি ও আবু দাউদের হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দোয়াই ইবাদত। এরপর তিনি সূরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াত পাঠ করেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।
দোয়ার মধ্যে বান্দা নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে এবং আল্লাহর ক্ষমতায় আস্থা রাখে। তাকদিরে বিশ্বাস দোয়াকে অর্থহীন করে না, বরং দোয়ার ভিত্তি দেয়। কারণ যিনি সব নির্ধারণ করেন, তাঁর কাছেই তো চাওয়া হচ্ছে।
তাকদির ও দোয়ার সম্পর্ক: দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ
বিজ্ঞাপন
ফলাফলের আগে: পরীক্ষা, চাকরির সাক্ষাৎকার, অপারেশন বা ব্যবসার বড় সিদ্ধান্তের আগে প্রস্তুতি নিন এবং দোয়া করুন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ইস্তিখারার নামাজও পড়া যায়।
ফলাফলের পরে: পছন্দমতো ফল এলে শুকরিয়া আদায় করুন। অপছন্দের ফল এলে ধৈর্য ধরুন এবং মনে রাখুন, হয়তো এতেই কল্যাণ ছিল। সহিহ মুসলিমের হাদিসে আছে, মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণকর; সুখে সে শোকর করে, দুঃখে ধৈর্য ধরে।
অতীত নিয়ে আফসোস: সহিহ মুসলিমের আরেক হাদিসে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, বিপদ এলে এ কথা বলো না যে, যদি এমন করতাম তাহলে এমন হতো। বরং বলো, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং যা চেয়েছেন, তা-ই করেছেন। কারণ "যদি" শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
দোয়া কি ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে?
হাদিস অনুযায়ী দোয়া তাকদির ফেরাতে পারে। আলেমদের ব্যাখ্যা হলো, এই পরিবর্তনও আল্লাহর জ্ঞানের ভেতরে; তিনি আগেই জানেন বান্দা দোয়া করবে এবং তার ফল কী হবে।
জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে কি সব লেখা আছে?
হ্যাঁ, মানুষের রিজিক, আয়ু ও কাজ সম্পর্কে আল্লাহর লিখনের কথা সহিহ হাদিসে এসেছে। তবু মানুষকে চেষ্টা ও দোয়া করতে বলা হয়েছে, কারণ সে জানে না কী লেখা আছে।
বিজ্ঞাপন
তাকদির নিয়ে বেশি চিন্তা করা কি ঠিক?
তাকদিরের গভীর রহস্য নিয়ে তর্কে জড়াতে আলেমরা নিরুৎসাহিত করেছেন। মূল বিশ্বাস রেখে নিজের দায়িত্ব পালন ও দোয়ায় মনোযোগ দেওয়াই নিরাপদ পথ।
খারাপ কাজের দায় কি তাকদিরের ওপর চাপানো যায়?
না। মানুষ নিজের ইচ্ছায় কাজ করে এবং তার জন্য জবাবদিহি করবে। গুনাহ করে তাকদিরের অজুহাত দেওয়া ইসলামি শিক্ষা নয়।