দোয়া কেন কবুল হয় না: হাদিসে বর্ণিত কারণ ও করণীয়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
তিন বছর ধরে একটি চাকরির জন্য দোয়া করছেন, কিংবা সন্তানের অসুখ সারার জন্য প্রতি রাতে কাঁদছেন, কিন্তু অবস্থা বদলাচ্ছে না। এমন সময় মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: আমার দোয়া কেন কবুল হয় না। প্রশ্নটি দোষের নয়, তবে উত্তর খোঁজার জায়গা হওয়া উচিত কোরআন ও হাদিস।
বিজ্ঞাপন
হাদিসে দোয়া কবুল না হওয়ার কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ এসেছে। সবচেয়ে বড় কারণ হারাম উপার্জন। এরপর আছে দোয়ায় তাড়াহুড়া করে হাল ছেড়ে দেওয়া, গুনাহের কাজ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার জন্য দোয়া করা, উদাসীন মনে দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর সন্দেহ রাখা।
তবে তার আগে একটি সত্য মনে রাখা দরকার। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী দোয়ার ফল সব সময় হুবহু চাওয়া জিনিস হয়ে আসে না। তাই "কবুল হয়নি" মনে হওয়াটা অনেক সময় আমাদের দেখার সীমাবদ্ধতা।
আগে বুঝুন: দোয়া কি আসলেই কবুল হয়নি
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি হাদিসের মর্ম হলো, কোনো মুসলমান যখন এমন দোয়া করে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার কিছু নেই, তখন আল্লাহ তাকে তিনটির একটি অবশ্যই দেন। হয় চাওয়া জিনিসটি দ্রুত দেন, নয়তো আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো অনিষ্ট তার থেকে দূর করে দেন। সাহাবিরা বলেছিলেন, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। মহানবী (সা.) বলেছিলেন, আল্লাহ আরও বেশি দানশীল।
বিজ্ঞাপন
কোরআনও একই কথা মনে করিয়ে দেয়। সূরা বাকারার ২১৬ নম্বর আয়াতে আছে, হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর হতে পারে কোনো কিছু পছন্দ করো অথচ তা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর; আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।
যে চাকরিটা পাননি, হয়তো সেখানে এমন কিছু অপেক্ষা করছিল যা আপনি জানেন না। তাই দোয়ার ফল নিয়ে হতাশ হওয়ার আগে এই তিন সম্ভাবনার কথা ভাবুন।
হাদিসে বর্ণিত দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ
১. হারাম উপার্জন: সহিহ মুসলিমের পরিচিত হাদিসে মহানবী (সা.) এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত, চুল এলোমেলো, ধুলোমলিন। সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলছে, হে রব, হে রব। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, হারাম দিয়েই সে পুষ্ট। এরপর তিনি বলেছেন, তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে। লক্ষ করুন, সফর ও কাতরতা দুটিই দোয়া কবুলের অনুকূল অবস্থা, তবু হারাম সব আটকে দিয়েছে। ঘুষ, সুদ, ওজনে কম দেওয়া, অফিসের সময় ফাঁকি, অন্যের হক মেরে খাওয়া সবই এর আওতায় পড়ে।
বিজ্ঞাপন
২. দোয়ায় তাড়াহুড়া: বুখারি ও মুসলিমে আছে, তোমাদের কারও দোয়া কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে। জিজ্ঞেস করা হলো, তাড়াহুড়া কী। বলা হলো, সে বলে, আমি দোয়া করেছি, আবার দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হতে দেখিনি। এরপর সে হতাশ হয়ে দোয়া ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ হাল ছেড়ে দেওয়াটাই সমস্যা, দেরি নয়।
৩. গুনাহ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া: সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় দোয়া কবুলের শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া করে। কারও অন্যায় ক্ষতি চেয়ে দোয়া, হারাম কিছু পাওয়ার দোয়া এর মধ্যে পড়ে।
৪. সন্দেহ নিয়ে দোয়া: বুখারির হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ যেন না বলে, হে আল্লাহ, তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো। বরং সে দৃঢ়ভাবে চাইবে, কারণ আল্লাহকে বাধ্য করার কেউ নেই। দোয়ার সময় "হবে কি না কে জানে" মনোভাব দোয়াকে দুর্বল করে।
৫. উদাসীন মন: তিরমিজির এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। মোনাজাতে মুখে আরবি শব্দ চলছে, মন পড়ে আছে বাজারের হিসাবে, এমন দোয়ার কথাই এখানে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
৬. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ছেড়ে দেওয়া: তিরমিজির আরেক হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে, মানুষ যদি ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ ছেড়ে দেয়, তাহলে এমন সময় আসবে যখন তারা দোয়া করবে কিন্তু কবুল হবে না। নিজের পরিবার ও আশপাশে অন্যায় দেখে নীরব থাকা নিয়ে ভাবার আছে।
হারাম উপার্জন ও দোয়া: কোথা থেকে শুরু করবেন
হারাম আয়ের প্রশ্নটি অনেকের জন্য অস্বস্তিকর, কারণ আয়ের উৎস রাতারাতি বদলানো যায় না। তবু শুরু করা যায়।
প্রথমে নিজের আয়ের প্রতিটি উৎস খোলা চোখে দেখুন। কোনটি সন্দেহজনক, তা চিহ্নিত করুন। স্পষ্ট হারাম যেমন ঘুষ বা প্রতারণা হলে তা এখনই বন্ধ করুন। যেসব বিষয়ে নিশ্চিত নন, যেমন নির্দিষ্ট কোনো চাকরি বা ব্যবসার ধরন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন।
বিজ্ঞাপন
কারও হক নষ্ট করে থাকলে তা ফেরত দেওয়া বা মাফ চেয়ে নেওয়া তওবার অংশ। শুধু মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ বলে অন্যের পাওনা আটকে রাখলে তওবা পূর্ণ হয় না।
দোয়া কবুলের পথে ফেরার করণীয়
১. তওবা দিয়ে শুরু: আন্তরিকভাবে গুনাহ স্বীকার করুন, ছেড়ে দিন এবং আর না করার সংকল্প করুন।
২. দোয়া চালিয়ে যান: দেরি দেখে থামবেন না। হাদিস অনুযায়ী থেমে যাওয়াটাই কবুলের পথ বন্ধ করে।
বিজ্ঞাপন
৩. আদব মেনে দোয়া: আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে শুরু করুন, বিনয়ের সঙ্গে চান, শেষে আবার দরুদ পড়ুন।
৪. উপযুক্ত সময় বেছে নিন: শেষ রাত, আজান-ইকামতের মাঝের সময়, সিজদা ও জুমার দিনের শেষ ভাগের মতো সময়গুলো কাজে লাগান।
৫. চেষ্টাও করুন: চাকরির দোয়ার পাশাপাশি দক্ষতা বাড়ান, রোগমুক্তির দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা নিন। দোয়া ও চেষ্টা একে অপরের বিকল্প নয়।
৬. অন্যের জন্যও দোয়া করুন: সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী অগোচরে অন্যের জন্য দোয়া করলে ফেরেশতা আপনার জন্যও সেই কল্যাণ চান।
বিজ্ঞাপন
হতাশা নয়, আশা
কোরআনে বারবার আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে নিষেধ করা হয়েছে। নবী জাকারিয়া (আ.) বার্ধক্যে পৌঁছে সন্তানের জন্য দোয়া করেছিলেন, নবী আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ অসুস্থতায় ধৈর্য ধরে দোয়া করে গেছেন। তাঁদের ঘটনা শেখায়, দোয়ার উত্তর আসে আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে।
তিরমিজি ও আবু দাউদের হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দোয়াই ইবাদত। এরপর তিনি সূরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াত পড়েছেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। দোয়াকে কেবল চাওয়ার মাধ্যম না ভেবে ইবাদত হিসেবে দেখলে হতাশা কমে। কারণ ফল যা-ই হোক, দোয়া করার সওয়াব বান্দার আমলনামায় থেকেই যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
গুনাহগার মানুষের দোয়া কি কবুল হয় না?
হয়। কোনো মানুষই গুনাহমুক্ত নয়। হাদিসে যে বাধার কথা এসেছে, তা মূলত হারাম উপার্জন ও গুনাহের দোয়া। গুনাহ থাকলে তওবা করে দোয়া করুন।
কত দিন দোয়া করার পর বুঝব কবুল হয়নি?
এমন কোনো সময়সীমা নেই। হাদিস অনুযায়ী দোয়া কখনো নষ্ট হয় না; হয় দুনিয়ায় ফল আসে, নয়তো আখিরাতে জমা থাকে বা বিপদ দূর হয়।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের অন্য কারও হারাম আয়ে চললে কি দোয়া কবুল হবে না?
নির্ভরশীল সদস্যের অবস্থা আলাদা; বিষয়টি পরিস্থিতিভেদে জটিল। নিজের সাধ্যমতো হালাল পথে চলার চেষ্টা করুন এবং নির্দিষ্ট অবস্থা জানিয়ে কোনো মুফতির পরামর্শ নিন।