লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণ: ট্রেইল, বন্যপ্রাণী ও যাওয়ার উপায়
ট্রাভেল ডেস্ক · মৌলভীবাজার
প্রকাশ:
ভোরের দিকে লাউয়াছড়ার ভেতরে দাঁড়ালে প্রথমে কানে আসে একটা অদ্ভুত ডাক, অনেকটা হুপ-হুপ শব্দের মতো, গাছ থেকে গাছে ছড়িয়ে পড়ছে। এটা উল্লুকের ডাক। বাংলাদেশের একমাত্র বনমানুষ এই উল্লুক দেখার সবচেয়ে পরিচিত জায়গা লাউয়াছড়া। ঘন চিরসবুজ বন, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন আর ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক মিলে জায়গাটা শহুরে মানুষের কাছে আলাদা এক জগৎ।
বিজ্ঞাপন
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত, এই প্রশ্নের উত্তর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা। তবে পর্যটকেরা যান শ্রীমঙ্গল হয়ে, কারণ শ্রীমঙ্গল শহর থেকে উদ্যানের গেট মাত্র কয়েক কিলোমিটার, সিএনজিতে মিনিট বিশেকের পথ। নব্বইয়ের দশকে এলাকাটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়।
একটা বিষয় শুরুতেই মনে রাখা দরকার। এটা পার্ক নয়, সংরক্ষিত বন। এখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য চুপচাপ হাঁটা, শোনা আর দেখা।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান যাওয়ার উপায়
১. ট্রেনে শ্রীমঙ্গল: ঢাকার কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সিলেটগামী আন্তনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গলে থামে। পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস এই পথের পরিচিত ট্রেন। সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। শোভন চেয়ারের ভাড়া আনুমানিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে, এসি আসনে বেশি। ট্রেনের সময়সূচি বদলাতে পারে, যাত্রার আগে মিলিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. বাসে শ্রীমঙ্গল: সায়েদাবাদ ও মহাখালী এলাকা থেকে শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারের বাস ছাড়ে। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার পথ, নন-এসি বাসে ভাড়া আনুমানিক ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা।
৩. শ্রীমঙ্গল থেকে উদ্যানে: শহর থেকে কমলগঞ্জ সড়ক ধরে সিএনজি বা অটোরিকশায় সরাসরি উদ্যানের প্রধান গেটে যাওয়া যায়। রিজার্ভ নিলে আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, আসা-যাওয়া ও অপেক্ষাসহ নিলে বেশি। কমলগঞ্জগামী লোকাল বাসেও গেটের সামনে নামা যায়।
ভেতরের ট্রেইলগুলো
উদ্যানে হাঁটার জন্য চিহ্নিত পথ আছে। প্রচলিতভাবে তিনটি ট্রেইলের কথা বলা হয়, সময়ের হিসাবে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা আর তিন ঘণ্টা।
বিজ্ঞাপন
১. আধা ঘণ্টার ট্রেইল: শিশু ও বয়স্কদের জন্য উপযোগী। বড় গাছ, লতাগুল্ম আর বনের সাধারণ চেহারা দেখা হয়ে যায়।
২. এক ঘণ্টার ট্রেইল: একটু ভেতরে যায়, ছড়া বা ছোট খাল পার হতে হতে পারে। এই পথে বানর বা উল্লুক দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।
৩. তিন ঘণ্টার ট্রেইল: বনের গভীরে যায়, পথে খাসিয়া পল্লির কাছ দিয়ে যাওয়া যায়। এই ট্রেইলে গাইড নেওয়া ভালো, কারণ পথ হারানোর সুযোগ আছে।
গেটে নিবন্ধিত গাইড পাওয়া যায়। গাইড থাকলে কোন গাছে কোন প্রাণী থাকে, কোন ডাক কার, তা চিনিয়ে দেন। গাইডের পারিশ্রমিক ট্রেইল ও সময়ভেদে আলাদা, আগে ঠিক করে নিন।
বিজ্ঞাপন
উদ্যানের ভেতর দিয়ে যে রেললাইন গেছে, সেটি ঢাকা-সিলেট রেলপথের অংশ। রেললাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা জনপ্রিয়, তবে এটা সচল লাইন। ট্রেন আসার শব্দ পেলেই সরে যান, লাইনের ওপর হাঁটা এড়িয়ে চলুন।
কী কী বন্যপ্রাণী দেখা যায়
লাউয়াছড়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ উল্লুক, যা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমান, বানর, কাঠবিড়ালি আর রাতে চলাফেরা করা লজ্জাবতী বানরের দেখা মেলে। পাখির মধ্যে নানা প্রজাতির কাঠঠোকরা, ধনেশ, বুলবুলি আর মৌটুসি চোখে পড়ে। সাপ, গিরগিটি আর অসংখ্য প্রজাপতিও আছে।
তবে প্রাণী দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। চিড়িয়াখানার মতো নিশ্চয়তা নেই। সম্ভাবনা বাড়াতে চাইলে সকাল সকাল যান, দলে কম লোক রাখুন আর চুপচাপ হাঁটুন। উজ্জ্বল লাল-হলুদ জামার বদলে সবুজ, বাদামি বা ধূসর রঙের পোশাক পরলে প্রাণীরা কম ভয় পায়।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন
সারা বছরই যাওয়া যায়, তবে প্রতিটি মৌসুমের আলাদা রূপ আছে। অক্টোবর থেকে মার্চ আবহাওয়া শুকনো ও আরামদায়ক, হাঁটা সহজ, জোঁকও কম। বর্ষায় বন সবচেয়ে সবুজ ও জীবন্ত, কিন্তু পথ কাদাময় হয় আর জোঁকের উপদ্রব বাড়ে। গ্রীষ্মে দুপুরে গরম ও আর্দ্রতা বেশি, তখন সকাল বা বিকেলে হাঁটুন।
দিনের মধ্যে সকাল সাতটা থেকে দশটা প্রাণী দেখার সেরা সময়। ছুটির দিনে দুপুরের দিকে ভিড় বাড়ে, শব্দও বাড়ে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণ খরচ
বিজ্ঞাপন
নিচের হিসাব আনুমানিক, সময়ের সঙ্গে বদলায়।
১. প্রবেশ ফি: দেশি দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রতি অল্প অঙ্কের টিকিট, শিক্ষার্থীদের জন্য কখনো কম। বিদেশিদের জন্য ফি বেশি।
২. যাতায়াত: ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল আসা-যাওয়া ট্রেনে বা বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
৩. গাইড: ট্রেইলভেদে আনুমানিক কয়েকশ টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত, পুরো দলের জন্য।
বিজ্ঞাপন
৪. থাকা: শ্রীমঙ্গলে সাধারণ হোটেল ও গেস্টহাউসে রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা, চা-বাগানঘেঁষা রিসোর্টে অনেক বেশি।
শ্রীমঙ্গলে এক রাত থেকে লাউয়াছড়া, চা-বাগান আর আশপাশ ঘুরলে জনপ্রতি আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৬০০০ টাকায় সাধারণ মানের ভ্রমণ হয়ে যায়।
লাউয়াছড়ার সঙ্গে আর যা জুড়ে নিতে পারেন
শ্রীমঙ্গল পর্যন্ত গিয়ে শুধু লাউয়াছড়া দেখে ফিরে আসা একটু অপচয়ই বলা যায়। আশপাশে কাছাকাছি দূরত্বে আরও কয়েকটি জায়গা আছে।
বিজ্ঞাপন
১. চা-বাগান: শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কের দুই পাশেই বিস্তীর্ণ চা-বাগান। বাগানের ভেতরের রাস্তায় হাঁটা যায়, তবে কারখানা বা সংরক্ষিত অংশে ঢুকতে অনুমতি লাগে।
২. মাধবপুর লেক: কমলগঞ্জে চা-বাগানের ভেতরে টিলাঘেরা একটি শান্ত লেক। বর্ষা-শরতে শাপলা ফোটে।
৩. খাসিয়া পল্লি: উদ্যানের পাশেই খাসিয়া জনগোষ্ঠীর গ্রাম, যাঁরা পান চাষের জন্য পরিচিত। ঘুরে দেখতে চাইলে বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি নিন।
৪. সাত রঙের চা: শ্রীমঙ্গল শহরের কাছে কয়েকটি দোকানে স্তরে স্তরে আলাদা রঙের চা পরিবেশন করা হয়, পর্যটকদের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয়।
বিজ্ঞাপন
লাউয়াছড়া সকালে, চা-বাগান ও মাধবপুর লেক দুপুর-বিকেলে রাখলে এক দিনেই দারুণভাবে কাজে লাগানো যায়।
বনের নিয়ম ও সতর্কতা
উদ্যানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো, পিকনিক বা রান্না করা নিষেধ। প্রাণীদের খাবার দেবেন না, এতে তাদের স্বাভাবিক আচরণ নষ্ট হয়। গাছের ডাল ভাঙা, ফুল তোলা বা কিছু সংগ্রহ করা যাবে না।
বর্ষায় ফুলপ্যান্ট, মোজা আর বন্ধ জুতা পরুন, জোঁক থেকে বাঁচতে মোজার ওপর লবণ বা জোঁক তাড়ানোর স্প্রে কাজে আসে। পানি ও হালকা শুকনো খাবার সঙ্গে নিন, কিন্তু মোড়ক ফেরত আনুন। সন্ধ্যার আগে বন থেকে বেরিয়ে আসুন, একা গভীর ট্রেইলে যাবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
লাউয়াছড়ায় কি গাইড ছাড়া ঢোকা যায়?
ছোট ট্রেইলে অনেকে গাইড ছাড়াই হাঁটেন। লম্বা ট্রেইলে বা প্রাণী দেখতে চাইলে গাইড নেওয়া উচিত, কারণ পথ ও প্রাণীর অবস্থান তাঁরা ভালো চেনেন।
উল্লুক দেখার নিশ্চয়তা আছে কি?
বিজ্ঞাপন
না। উল্লুক বনের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় থাকে, সকালে বেশি সক্রিয়। ভোরে গেলে এবং গাইড সঙ্গে থাকলে দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।
এক দিনে ঢাকা থেকে ঘুরে আসা সম্ভব?
ভোরের ট্রেনে গিয়ে রাতের ট্রেনে ফিরলে সম্ভব, তবে খুব তাড়াহুড়া হয়। শ্রীমঙ্গলে এক রাত থাকলে চা-বাগানসহ আরাম করে দেখা যায়।
উদ্যানে কি খাবার পাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
গেটের কাছে ছোট দোকান থাকে, ভেতরে কিছু নেই। ভারী খাবার শ্রীমঙ্গল শহরে সেরে নেওয়াই ভালো।