দোয়া করার নিয়ম ও আদব: মোনাজাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
দোয়া কোনো আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়, এটি বান্দা ও আল্লাহর সরাসরি কথোপকথন। তবু কীভাবে কথা বলতে হয়, তার একটি সৌন্দর্য আছে। মহানবী (সা.) নিজে যেভাবে দোয়া করেছেন এবং সাহাবিদের শিখিয়েছেন, সেখান থেকেই দোয়া করার নিয়ম ও আদব জানা যায়।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে নিয়মটি এমন: সম্ভব হলে ওজু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে বসুন, দুই হাত বুক বরাবর তুলে ধরুন, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করুন ও মহানবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়ুন, তারপর বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রয়োজন চান, অন্যদের জন্যও চান, শেষে আবার দরুদ পড়ে আমিন বলুন।
এর কোনোটিই দোয়া কবুলের শর্ত নয়, ওজু ছাড়া, শুয়ে বা হাঁটতে হাঁটতেও দোয়া করা যায়। তবে আদবগুলো মানলে দোয়া পূর্ণাঙ্গ হয় এবং মনোযোগ বাড়ে।
দোয়ার আগে প্রস্তুতি
মন স্থির করুন: কী চাইবেন, তা আগে থেকে ভেবে নিলে মোনাজাতে এলোমেলো লাগে না। অনেকে ছোট একটি তালিকা করে রাখেন: নিজের গুনাহ মাফ, মা-বাবা, পরিবার, অসুস্থ আত্মীয়, দেশের মানুষ।
বিজ্ঞাপন
পবিত্রতা: ওজু থাকলে ভালো। অবশ্য ওজু না থাকলেও দোয়া করা নিষেধ নয়।
কিবলামুখী হওয়া: মহানবী (সা.) অনেক সময় কিবলামুখী হয়ে দোয়া করেছেন বলে হাদিসে এসেছে। এটি মুস্তাহাব।
সময় বেছে নেওয়া: শেষ রাত, আজান ও ইকামতের মাঝের সময়, ফরজ নামাজের পর ও জুমার দিনের শেষ ভাগ দোয়ার জন্য বিশেষ সময় হিসেবে হাদিসে এসেছে।
মোনাজাতের নিয়ম: ধাপে ধাপে
বিজ্ঞাপন
১. হাত তোলা: দুই হাত একসঙ্গে বুক বা কাঁধ বরাবর তুলুন, হাতের তালু আকাশের দিকে খোলা রাখুন। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, তোমাদের রব লজ্জাশীল ও দাতা; বান্দা যখন তাঁর দিকে দুই হাত তোলে, তখন তা খালি ফিরিয়ে দিতে তিনি লজ্জাবোধ করেন।
২. আল্লাহর প্রশংসা: আলহামদুলিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ বা কোরআনের কোনো প্রশংসাবাক্য দিয়ে শুরু করুন। চাইলে সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত পড়তে পারেন।
৩. দরুদ শরিফ: নামাজে যে দরুদে ইবরাহিম পড়া হয়, সেটি পড়া উত্তম। ছোট করে "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ" বললেও দরুদ হয়। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি প্রশংসা ও দরুদ ছাড়া দোয়া করলে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, সে তাড়াহুড়া করেছে। এরপর তিনি শিখিয়ে দেন, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা, তারপর দরুদ, তারপর যা ইচ্ছা চাওয়া।
৪. আল্লাহর নাম ধরে ডাকা: সূরা আরাফের ১৮০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সেসব নামে তাঁকে ডাকো। ক্ষমা চাইলে ইয়া গাফুর, রিজিক চাইলে ইয়া রাজ্জাক, রোগমুক্তি চাইলে ইয়া শাফি বলে ডাকা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. নিজের গুনাহ স্বীকার: সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার বা সহজ ভাষায় নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। ক্ষমা চাওয়া দোয়ার দরজা খুলে দেয়।
৬. প্রয়োজন চাওয়া: আরবি জানা না থাকলে বাংলায় চান। ছোট-বড় সব প্রয়োজন চাওয়া যায়। কোরআন-হাদিসের দোয়াগুলো জানা থাকলে সেগুলো আগে পড়ুন, তারপর নিজের ভাষায় বলুন।
৭. নিজেকে দিয়ে শুরু, অন্যদের অন্তর্ভুক্ত: তিরমিজির বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) কারও জন্য দোয়া করলে নিজেকে দিয়ে শুরু করতেন। এরপর মা-বাবা, পরিবার ও সব মুসলমানের জন্য দোয়া করুন।
৮. পুনরাবৃত্তি: সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) দোয়া করলে তিনবার করতেন। গুরুত্বপূর্ণ কথাটি তিনবার বলুন।
বিজ্ঞাপন
৯. শেষ করা: আবার দরুদ পড়ুন এবং আমিন বলে শেষ করুন। কোরআনের "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ" দোয়াটি দিয়ে শেষ করাও প্রচলিত ও সুন্দর।
দোয়ার আদব: যা মনে রাখবেন
বিনয় ও নিচু স্বর: সূরা আরাফের ৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে। চিৎকার করে বা অন্যকে শুনিয়ে দোয়া করার প্রয়োজন নেই, যদি না জামাতে ইমাম দোয়া করেন আর মুক্তাদিরা আমিন বলেন।
দৃঢ়তা: "পারলে দিয়ো" ধরনের দ্বিধা নয়, আশা নিয়ে দৃঢ়ভাবে চাইতে হবে। বুখারির হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে।
বিজ্ঞাপন
কাতরতা: দোয়ায় চোখে পানি এলে তা ভালো লক্ষণ। জোর করে কান্নার ভান করার দরকার নেই।
সীমালঙ্ঘন না করা: কারও অন্যায় ক্ষতি, আত্মীয়তা ছিন্ন হওয়া বা হারাম কিছু চেয়ে দোয়া করা নিষেধ।
অধৈর্য না হওয়া: ফল দেরিতে এলে দোয়া ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
হালাল জীবন: দোয়ার আদবের ভিত্তি হলো হালাল খাবার ও হালাল আয়।
বিজ্ঞাপন
মোনাজাতে পড়ার মতো কোরআনের তিনটি দোয়া
নিজের ভাষায় চাওয়ার আগে বা পরে কোরআনের কিছু ছোট দোয়া পড়লে মোনাজাত পূর্ণাঙ্গ হয়। এগুলো মুখস্থ করাও সহজ।
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া, সূরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান নার। অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দাও, আখিরাতেও কল্যাণ দাও এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করো। বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) এই দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়তেন।
মা-বাবার জন্য দোয়া, সূরা বনি ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াত:
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ: রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা। অর্থ: হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
নিজের, মা-বাবার ও সব মুমিনের ক্ষমার দোয়া, সূরা ইবরাহিমের ৪১ নম্বর আয়াত:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
উচ্চারণ: রাব্বানাগফিরলি ওয়ালিওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মু'মিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব। অর্থ: হে আমাদের রব, যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার মা-বাবাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করো।
যেসব বিষয়ে আলেমদের মতভেদ আছে
বিজ্ঞাপন
মোনাজাত শেষে মুখে হাত বোলানো: এ বিষয়ে কয়েকটি বর্ণনা আছে, যেগুলোর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে। অনেক আলেম একাধিক সূত্র মিলিয়ে একে বৈধ বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন না করাই উত্তম। বাংলাদেশে সাধারণত মুখে হাত বোলানো হয়; এ নিয়ে বাড়াবাড়ি বা বিবাদের সুযোগ নেই।
ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত: ফরজ নামাজের পর দোয়া কবুলের কথা হাদিসে আছে। তবে ইমাম-মুক্তাদি মিলে প্রতিদিন নিয়মিত সম্মিলিত মোনাজাত নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। কেউ একে বৈধ বলেন, কেউ এটিকে আবশ্যক বানিয়ে ফেলাকে অপছন্দ করেন। যিনি যে মসজিদে নামাজ পড়েন, সেখানকার প্রচলন মেনে চলা এবং এ নিয়ে বিতর্ক এড়ানোই শান্তির পথ।
নামাজের ভেতরে দোয়া
নামাজের শেষ বৈঠকে দরুদের পর সালাম ফেরানোর আগে দোয়া মাসুরা পড়া হয়। হানাফি মতে নামাজের ভেতরে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত আরবি দোয়াই পড়তে হবে, বাংলায় নিজের ভাষায় দোয়া করা যাবে না। নফল নামাজের সিজদায় বর্ণিত দোয়াগুলো দীর্ঘ সময় নিয়ে পড়া যায়। বাংলায় নিজের মনের কথা বলতে চাইলে সালাম ফেরানোর পর মোনাজাতে বলুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দোয়ার সময় হাত তোলা কি বাধ্যতামূলক?
না। হাত তোলা সুন্নাহসম্মত আদব, তবে হাত না তুলেও দোয়া করা যায়। হাঁটতে, কাজ করতে বা শুয়ে থেকেও মনে মনে দোয়া করা বৈধ।
নারীরা কি ঋতুস্রাবের সময় দোয়া করতে পারেন?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। এ সময় নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতে বিধিনিষেধ থাকলেও দোয়া, জিকির, দরুদ ও ইস্তেগফারে কোনো বাধা নেই।
অন্যকে দিয়ে দোয়া করানো কি ভালো?
নেককার কারও কাছে দোয়া চাওয়া বৈধ। তবে নিজের দোয়াই সবচেয়ে বড় সম্বল। নিজের প্রয়োজনের কথা নিজে আল্লাহকে বলুন।
দোয়ায় কি আরবি শব্দ জানা জরুরি?
বিজ্ঞাপন
না। নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় দোয়া করা সম্পূর্ণ বৈধ। আল্লাহ মনের কথাও জানেন।