স্বর্ণমন্দির বান্দরবান: ইতিহাস, উৎসব, দর্শনের নিয়ম ও যাওয়ার উপায়
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
বান্দরবান শহর থেকে বালাঘাটার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ পাহাড়ের মাথায় সোনালি চূড়াগুলো চোখে পড়ে। রোদ পড়লে ঝলমল করে ওঠে। পর্যটকেরা একে স্বর্ণমন্দির বলেন, তবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এর নাম বুদ্ধ ধাতু জাদি। এটি মূলত একটি উপাসনালয়, পর্যটনকেন্দ্র নয়। এই কথাটা মাথায় রেখে গেলে অভিজ্ঞতা যেমন সুন্দর হয়, তেমনি স্থানীয়দের অনুভূতিও সম্মান পায়।
বিজ্ঞাপন
স্বর্ণমন্দির বান্দরবান কোথায় অবস্থিত, এর উত্তর বান্দরবান সদর উপজেলার বালাঘাটা এলাকার পুলপাড়া, শহরের কেন্দ্র থেকে মোটামুটি চার কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে বেশ কিছু সিঁড়ি ভাঙতে হয়। ওপর থেকে চারপাশের পাহাড় আর শহরের দৃশ্যও চমৎকার।
স্থাপত্যরীতিতে মন্দিরটি মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থেরবাদী বৌদ্ধ মন্দিরের ধাঁচে তৈরি। এ দেশে এমন নকশার বড় ধাতু জাদি হাতে গোনা, তাই দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে এটি বান্দরবানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
স্বর্ণমন্দির বান্দরবান ইতিহাস
ধাতু জাদি বলতে এমন স্তূপ বা মন্দিরকে বোঝায়, যেখানে গৌতম বুদ্ধের দেহাবশেষ বা ধাতু সংরক্ষিত থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়। বান্দরবানের এই জাদিতেও বুদ্ধের ধাতু সংরক্ষিত আছে বলে স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিশ্বাস করে, আর সে কারণেই এটি তাঁদের কাছে বিশেষ পবিত্র।
বিজ্ঞাপন
জাদিটি নির্মিত হয়েছে নব্বইয়ের দশকে, স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভক্তদের উদ্যোগে, আর এর উদ্বোধন হয় মোটামুটি দুই হাজার সালের দিকে। নির্মাণে মিয়ানমারের কারিগরদের সহায়তা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। মূল চূড়াকে ঘিরে ছোট ছোট চূড়া, প্রবেশপথের দুই পাশে ড্রাগন ও অন্যান্য প্রতীকী মূর্তি, আর ভেতরে বুদ্ধমূর্তি রয়েছে।
জাদির পাশের পাহাড়ে একটি পুকুর আছে, যা দেবতা পুকুর নামে পরিচিত। পাহাড়ের এত ওপরে সারা বছর পানি থাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা বিশ্বাস ও গল্প প্রচলিত।
স্বর্ণমন্দির বান্দরবান যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে বান্দরবান: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান বা গাবতলী থেকে বান্দরবানের সরাসরি বাস পাওয়া যায়, সাধারণত রাতে ছেড়ে সকালে পৌঁছায়। আট থেকে দশ ঘণ্টা লাগতে পারে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. চট্টগ্রাম হয়ে: ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে বহদ্দারহাট থেকে বান্দরবানের বাসে আড়াই-তিন ঘণ্টা।
৩. শহর থেকে মন্দিরে: বান্দরবান শহর থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় বালাঘাটা হয়ে মন্দিরের নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায়, ১৫ থেকে ২০ মিনিটের পথ। রিজার্ভ ভাড়া আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা এক দিকে। বালাঘাটাগামী শেয়ার গাড়িতেও গিয়ে কাছাকাছি নামা যায়।
৪. অন্য দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে: নীলাচল, মেঘলা আর শৈলপ্রপাত একই দিনে দেখতে চাইলে পুরো দিনের জন্য সিএনজি বা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করুন। স্বর্ণমন্দির খোলার সময় মিলিয়ে রুট সাজান।
চূড়ায় উঠে কী খুঁটিয়ে দেখবেন
বিজ্ঞাপন
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পথেই স্থাপত্যের খুঁটিনাটি চোখে পড়তে শুরু করে। প্রবেশপথের রেলিং ও দেয়ালে ড্রাগন আর নাগের আকৃতি, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ মন্দিরে রক্ষাকর্তার প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। ওপরে মূল জাদিকে ঘিরে সারিবদ্ধ ছোট চূড়া, প্রতিটির মাথায় ছাতার মতো অলংকার। বাতাসে ছোট ঘণ্টাগুলো বাজলে এক ধরনের মৃদু সুর তৈরি হয়।
মূল চত্বরে বুদ্ধের বিভিন্ন ভঙ্গির মূর্তি আছে। ভক্তরা এখানে ফুল, মোমবাতি আর আগরবাতি দিয়ে প্রার্থনা করেন। আপনি দর্শনার্থী হলে দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখুন, প্রার্থনার জায়গায় ভিড় করবেন না।
চত্বরের কিনারা থেকে চারপাশের দৃশ্যও দেখার মতো। এক দিকে বান্দরবান শহর, অন্য দিকে পাহাড়ের সারি। বিকেলের দিকে গেলে সোনালি চূড়ায় রোদের খেলা সবচেয়ে সুন্দর লাগে। তারপর একটু হেঁটে দেবতা পুকুরের দিকেও যেতে পারেন, তবে পথটি খাড়া, তাই সময় ও শক্তি হিসাব করে যান।
দর্শনের সময় ও নিয়ম
বিজ্ঞাপন
স্বর্ণমন্দির সব সময় খোলা থাকে না। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে খোলা রাখা হয়, আর ধর্মীয় কাজের সময় বা দুপুরের দিকে কিছু সময় বন্ধ থাকতে পারে। সময়সূচি কর্তৃপক্ষ বদলাতে পারে, তাই শহরে পৌঁছে হোটেল বা গাড়িচালকের কাছে বর্তমান সময় জেনে নিন।
ঢোকার সময় যে নিয়মগুলো মানতে হয়:
১. টিকিট: পর্যটকদের প্রবেশ টিকিট কাটতে হয়। দাম অল্প, তবে বিদেশিদের জন্য আলাদা।
২. জুতা খোলা: নির্দিষ্ট জায়গা থেকে জুতা খুলে খালি পায়ে উঠতে হয়। রোদের দিনে মেঝে গরম হতে পারে, মোজা পরে থাকলে আরাম।
বিজ্ঞাপন
৩. পোশাক: হাফপ্যান্ট, স্লিভলেস বা আঁটসাঁট খোলামেলা পোশাক পরে ঢুকতে নিষেধ করা হয়। কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা শালীন পোশাক পরুন।
৪. আচরণ: উচ্চস্বরে কথা বলা, দৌড়াদৌড়ি, মূর্তিতে হাত দেওয়া বা মূর্তির দিকে পা দিয়ে বসা অসম্মানজনক। প্রার্থনারত কারও সামনে দিয়ে হাঁটবেন না।
৫. ছবি তোলা: সাধারণত বাইরের অংশে ছবি তোলা যায়, তবে কিছু জায়গায় নিষেধ থাকতে পারে। নির্দেশনা দেখে নিন। ভিক্ষু বা ভক্তদের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
উৎসবের সময় স্বর্ণমন্দির
বিজ্ঞাপন
বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবের সময় স্বর্ণমন্দির ঘিরে আলাদা আবহ তৈরি হয়।
১. বুদ্ধপূর্ণিমা: বৈশাখী পূর্ণিমায় বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ স্মরণে প্রার্থনা, প্রদীপ প্রজ্বালন ও ধর্মীয় আয়োজন হয়।
২. প্রবারণা পূর্ণিমা: আশ্বিন মাসের পূর্ণিমায় বর্ষাবাস শেষে এই উৎসব হয়। বান্দরবানে এ সময় সাঙ্গু নদীতে রথ ভাসানো এবং আকাশে ফানুস ওড়ানো হয়, যা দেখতে বহু মানুষ আসেন।
৩. কঠিন চীবর দান: প্রবারণার পরের সময়ে ভিক্ষুদের চীবর দান উপলক্ষে বিভিন্ন বিহারে অনুষ্ঠান হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. সাংগ্রাই: এপ্রিলের মাঝামাঝি মারমা জনগোষ্ঠীর নববর্ষ উৎসব, যার অন্যতম অংশ পানিখেলা। এ সময় বান্দরবান শহর উৎসবমুখর থাকে।
উৎসবের দিনে ভিড় অনেক বেশি থাকে এবং ধর্মীয় কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পর্যটক হিসেবে গেলে একপাশে থেকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখুন।
খরচ ও থাকার পরিকল্পনা
নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক, সময়ের সঙ্গে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা-বান্দরবান আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা।
২. শহর থেকে মন্দির আসা-যাওয়া: সিএনজিতে আনুমানিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, পুরো গাড়ির জন্য।
৩. প্রবেশ টিকিট: জনপ্রতি অল্প কিছু টাকা।
৪. থাকা: বান্দরবান শহরে সাধারণ হোটেলে রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা। শহরের বাইরে পাহাড়ি রিসোর্টে খরচ বেশি।
বিজ্ঞাপন
স্বর্ণমন্দির ঘুরতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা যথেষ্ট। সকালে স্বর্ণমন্দির, দুপুরে মেঘলা আর শৈলপ্রপাত, বিকেলে নীলাচলে সূর্যাস্ত, এভাবে সাজালে এক দিনে শহরের আশপাশের প্রধান জায়গাগুলো দেখা হয়ে যায়।
যাওয়ার আগে কিছু পরামর্শ
সিঁড়ি অনেক, তাই বয়স্ক বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে ধীরে উঠুন, মাঝে বিশ্রাম নিন। পানির বোতল সঙ্গে রাখুন, তবে মন্দির চত্বরে খাওয়াদাওয়া করবেন না। জুতা রাখার জায়গায় দামি জুতা না রেখে সাধারণ স্যান্ডেল পরে যাওয়া ভালো।
বান্দরবানের কিছু দূরবর্তী উপজেলায় সময়ে সময়ে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ থাকে। স্বর্ণমন্দির শহরের কাছে, তবু ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
স্বর্ণমন্দির কি আসলেই সোনার তৈরি?
না। চূড়া ও কাঠামো সোনালি রঙে রাঙানো, তাই দূর থেকে সোনার মতো দেখায়। এ কারণেই স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিতি পেয়েছে।
অন্য ধর্মের মানুষ কি ঢুকতে পারেন?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, নির্দিষ্ট সময়ে যেকোনো ধর্মের দর্শনার্থী টিকিট কেটে ঢুকতে পারেন। শুধু উপাসনালয়ের নিয়ম ও পোশাকবিধি মানতে হয়।
দুপুরে গেলে কি মন্দির খোলা পাওয়া যাবে?
দুপুরের দিকে কিছু সময় পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকতে পারে। সকাল বা বিকেলে গেলে নিশ্চিন্ত থাকা যায়, তবে সময়সূচি স্থানীয়ভাবে মিলিয়ে নিন।
স্বর্ণমন্দির থেকে নীলাচল কত দূরে?
বিজ্ঞাপন
দুটিই শহরের কাছে, তবে ভিন্ন দিকে। সিএনজিতে শহর হয়ে আধা ঘণ্টার মতো লাগে।