নীলাচল ভ্রমণ: পাহাড়ি পথে যাতায়াত, থাকা, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
বান্দরবানে যাঁদের হাতে সময় কম, তাঁদের জন্য নীলাচল একটা উপহারের মতো। শহর থেকে বেরিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায় মিনিট বিশেক উঠলেই চোখের সামনে খুলে যায় ঢেউখেলানো পাহাড়ের সারি, তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট পাড়া আর দূরে সাঙ্গু নদীর রেখা। বর্ষায় মেঘ এসে পায়ের কাছে জমে, আর পরিষ্কার দিনে বিকেলের সূর্যাস্ত এখানে দেখার মতো।
বিজ্ঞাপন
নীলাচল কোথায় অবস্থিত, তা এক কথায় বললে বান্দরবান সদর উপজেলার টাইগারপাড়া এলাকায়, শহর থেকে মোটামুটি ছয় কিলোমিটার দূরে। জায়গাটি জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। চূড়ায় কয়েকটি ভিউপয়েন্ট, বসার ছাউনি, হাঁটার পথ আর রেস্তোরাঁ আছে। প্রবেশের জন্য টিকিট কাটতে হয়।
নীলগিরি বা নাফাখুমের মতো দূরের গন্তব্যে যাওয়ার আগে বা পরে অনেকে নীলাচলে একটা বিকেল কাটান। আবার যাঁরা পরিবার নিয়ে শুধু শহরের আশপাশ দেখতে চান, তাঁদের জন্য নীলাচল, মেঘলা আর স্বর্ণমন্দির মিলে চমৎকার এক দিনের সফর হয়ে যায়।
নীলাচল যাওয়ার উপায়
নীলাচলে যেতে হলে আগে বান্দরবান শহরে পৌঁছাতে হবে।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ, কলাবাগান ও গাবতলী থেকে বান্দরবানের এসি ও নন-এসি বাস চলে, বেশির ভাগই রাতে। আট থেকে দশ ঘণ্টা লাগতে পারে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা, এসি বাসে বেশি।
২. ট্রেনে চট্টগ্রাম হয়ে: আন্তনগর ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বান্দরবানের বাস ধরুন। এই পথে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে, বাস প্রায় সারা দিন পাওয়া যায়।
৩. কক্সবাজার থেকে: কক্সবাজার থেকেও বান্দরবানের বাস চলে, অনেকে দুই জায়গা একসঙ্গে ঘোরেন।
৪. বান্দরবান শহর থেকে নীলাচলে: শহরের বাসস্ট্যান্ড বা ট্রাফিক মোড় এলাকা থেকে সিএনজি, মাহিন্দ্রা বা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করা যায়। সিএনজির ভাড়া আনুমানিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা আসা-যাওয়ায়, অপেক্ষার সময়ভেদে। শেষ দিকের রাস্তা বেশ খাড়া, তাই ইজিবাইক বা দুর্বল যানবাহনে না যাওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
চাঁদের গাড়ি মানে খোলা জিপ, দশ-বারো জনের দল হলে পুরো দিনের জন্য রিজার্ভ নিয়ে নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির, শৈলপ্রপাত একসঙ্গে ঘোরা যায়। দরদাম আগে থেকে পরিষ্কার করে নিন, কোন কোন জায়গায় যাবে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে।
কখন গেলে নীলাচল সবচেয়ে সুন্দর
নীলাচলের রূপ মৌসুম আর দিনের সময়ের ওপর অনেকটা নির্ভর করে।
১. বর্ষা, জুন থেকে সেপ্টেম্বর: মেঘ দেখার সেরা সময়। সকালে বা বৃষ্টির পরপর চূড়া থেকে নিচের উপত্যকায় মেঘ জমে থাকতে দেখা যায়। তবে পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল থাকে, ধসের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
২. শরৎ ও হেমন্ত, অক্টোবর-নভেম্বর: আকাশ পরিষ্কার, পাহাড় তখনো সবুজ, দূরের দৃশ্য স্পষ্ট। অনেকের মতে এটিই বান্দরবান ঘোরার সেরা সময়।
৩. শীত, ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি: আবহাওয়া আরামদায়ক, ভোরে কুয়াশা থাকে। এ সময় পর্যটকের ভিড় সবচেয়ে বেশি।
দিনের মধ্যে বিকেল চারটা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীলাচলে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়, কারণ সূর্যাস্ত দেখতেই বেশির ভাগ মানুষ আসেন। ভোরে গেলে নিরিবিলি পরিবেশে মেঘ আর কুয়াশা দেখা যায়, তবে গাড়ি আগের রাতেই ঠিক করে রাখতে হয়।
চূড়ায় কী দেখবেন, কী করবেন
বিজ্ঞাপন
চূড়ায় কয়েকটি আলাদা ভিউপয়েন্ট আছে, প্রতিটি থেকে ভিন্ন দিকের দৃশ্য দেখা যায়। এক দিকে বান্দরবান শহর আর সাঙ্গু নদীর বাঁক, অন্য দিকে পাহাড়ের পর পাহাড়। পরিষ্কার দিনে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
হাঁটার পথ ধরে ঘুরে ঘুরে সব কটি ভিউপয়েন্টে যান, তাড়াহুড়া করবেন না। ছাউনির নিচে বসে চা খেতে খেতে আলো বদলানো দেখাও একটা অভিজ্ঞতা। ছবি তোলার শখ থাকলে বিকেলের সোনালি আলো আর সূর্যাস্তের পরের নীলচে আকাশ, দুটোই ধরার চেষ্টা করুন।
চূড়ার আশপাশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পাড়া আছে। সেখানে ঢুকতে চাইলে বিনয়ের সঙ্গে অনুমতি নিন, আর কারও ছবি তোলার আগে জিজ্ঞেস করুন।
নীলাচলকে ঘিরে এক দিনের রুট
বিজ্ঞাপন
বান্দরবান শহরের আশপাশের জায়গাগুলো এমনভাবে ছড়ানো যে একটু বুদ্ধি করে সাজালে এক দিনেই অনেকটা দেখা হয়ে যায়। সকালে নাশতা সেরে প্রথমে চলুন শৈলপ্রপাতের দিকে, থানচি সড়কে শহর থেকে কিছুটা দূরে ছোট একটি ঝরনা, পাশে বম নারীদের হাতে বোনা কাপড়ের দোকান। ফেরার পথে মেঘলা পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে লেক, ঝুলন্ত সেতু আর ছোট চিড়িয়াখানা আছে।
দুপুরে শহরে খাওয়া সেরে স্বর্ণমন্দিরে যান, তবে খোলার সময় মিলিয়ে নেবেন। বিকেল চারটার দিকে রওনা দিন নীলাচলের দিকে, যাতে সূর্যাস্তের আগে ভালো একটা জায়গা খুঁজে বসতে পারেন। সূর্য ডোবার পর আরও কিছুক্ষণ থাকুন, আকাশের রং তখন দ্রুত বদলায় আর নিচে শহরের আলো জ্বলে ওঠে।
পুরো দিনের জন্য একটি সিএনজি বা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করলে এই রুট আরামে শেষ করা যায়। চালকের সঙ্গে আগেই প্রতিটি জায়গার নাম ধরে কথা বলে নিন, যাতে পরে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা না হয়।
কোথায় থাকবেন
বিজ্ঞাপন
নীলাচলে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কিছু কটেজ ও রিসোর্টধর্মী থাকার ব্যবস্থা আছে। আশপাশে বেসরকারি কয়েকটি রিসোর্টও গড়ে উঠেছে। এখানে রাত কাটালে ভোরের মেঘ আর রাতের তারাভরা আকাশ দেখা যায়, যা শহরে থেকে সম্ভব নয়। তবে কক্ষসংখ্যা সীমিত, তাই ছুটির মৌসুমে আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। খরচ শহরের সাধারণ হোটেলের চেয়ে বেশি।
কম খরচে থাকতে চাইলে বান্দরবান শহরে থাকুন। শহরে নানা মানের আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস আছে, রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যে সাধারণ কক্ষ পাওয়া যায়। শহর থেকে নীলাচল এত কাছে যে দিনে দুবার আসা-যাওয়াও কঠিন নয়।
নীলাচল ভ্রমণ খরচ
নিচের হিসাব আনুমানিক, মৌসুম ও দলের আকারভেদে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা-বান্দরবান আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা।
২. শহর থেকে নীলাচল: সিএনজিতে আসা-যাওয়া আনুমানিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, তিন-চারজনে ভাগ হলে জনপ্রতি অল্পই পড়ে।
৩. প্রবেশ টিকিট: জনপ্রতি অল্প অঙ্কের টিকিট, গাড়ির জন্য আলাদা পার্কিং ফি থাকতে পারে।
৪. থাকা: শহরে রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা, নীলাচলের কটেজ বা রিসোর্টে এর বেশি।
বিজ্ঞাপন
৫. খাওয়া: বেলাপ্রতি জনপ্রতি আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
দুই রাত বাসে আর এক দিন বান্দরবান শহর ও আশপাশ ঘুরে ফিরলে জনপ্রতি আনুমানিক ৩৫০০ থেকে ৬০০০ টাকায় সাধারণ মানের ভ্রমণ সম্ভব।
পাহাড়ি পথের সতর্কতা
১. সন্ধ্যার পর ফেরা: সূর্যাস্ত দেখে অন্ধকারে নামতে হয় বলে চালককে আগে থেকে অপেক্ষা করতে বলে রাখুন। অচেনা গাড়ির অপেক্ষায় থাকবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. খাড়া ঢাল ও রেলিং: ভিউপয়েন্টের কিনারায় রেলিং পেরিয়ে ছবি তুলবেন না। নিচে গভীর খাদ।
৩. বর্ষায় সাবধানতা: টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি রাস্তায় ধস নামতে পারে। আবহাওয়া খারাপ হলে যাত্রা পিছিয়ে দিন।
৪. পরিবেশ রক্ষা: চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল যেখানে-সেখানে ফেলবেন না। নির্দিষ্ট ঝুড়ি ব্যবহার করুন।
৫. প্রশাসনের নির্দেশনা: বান্দরবানের কিছু উপজেলায় সময়ে সময়ে নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। নীলাচল শহরের কাছে বলে সাধারণত খোলা থাকে, তবু যাওয়ার আগে সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নিন। সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নীলাচল আর নীলগিরি কি একই জায়গা?
না। নীলাচল বান্দরবান শহরের কাছে, আর নীলগিরি থানচি সড়কে শহর থেকে অনেক দূরে, যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। দুটোই পাহাড়চূড়ার পর্যটনকেন্দ্র।
নীলাচলে কি মেঘ দেখা যায়?
বিজ্ঞাপন
বর্ষায় এবং বর্ষার পরপর ভোরে বা বৃষ্টির পর মেঘ দেখার সম্ভাবনা বেশি। শীতকালে কুয়াশা দেখা যায়, তবে মেঘের সমুদ্র সব দিন পাওয়া যায় না।
নীলাচল ঘুরতে কত সময় লাগে?
শহর থেকে আসা-যাওয়াসহ দুই থেকে তিন ঘণ্টা যথেষ্ট। সূর্যাস্ত দেখতে চাইলে বিকেলে যান।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে কি যাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, গাড়ি প্রায় চূড়া পর্যন্ত যায়, হাঁটতে হয় সামান্য। শুধু কিনারার দিকে শিশুদের হাত ধরে রাখুন।