সংবিধান সংশোধনে তাড়াহুড়া নয়, ঐকমত্য ও অন্তর্ভুক্তির তাগিদ
বিএনপি ও সরকারী জুলাই সনদের বিরোধে মতপার্থক্য প্রকাশ
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সংবিধান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়। ‘মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং ৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি’ শীর্ষক এই সভা বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতি পরিচালনা করে।
বিজ্ঞাপন
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যতম সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেন। তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির প্রচার সম্পাদক সানজিদ রহমান পড়া ও শোনান।
বক্তব্যের মধ্যে বলা হয়, মানুষের অধিকার রক্ষার কাজ এখনো শেষ হয়নি এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সুষ্ঠু নির্বাচন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য না করা উচিত। সবাই মিলে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, যিনি সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য, উল্লেখ করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই সনদ কোনো গণপরিষদে অনুমোদিত হয়নি, ফলে তা মানতে বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি সংবিধান সংশোধনের আগে গণপরিষদ গঠনের দাবি করেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, সংবিধান সংশোধন হতে পারে তবে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যে তা করা উচিত নয়; অতীতে এমন কোনো সংশোধনী ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থেকে সংবিধান সংশোধন করা উচিত নয়।
বিজ্ঞাপন
খোকন আরও যোগ করেন, বিএনপি জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে বাকি বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হবে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। তিনি যুক্তি দেন, সংবিধান সংশোধন যেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সরকারের পক্ষ থেকে এই চিন্তা রয়েছে। এছাড়া তিনি সুপ্রিম কোর্টে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো ও এটিকে শক্তিশালী করার দাবি জানান।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ পুনরায় বলেন, সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই সনদ কোনো গণপরিষদে অনুমোদিত হয়নি; তাই তা মানতে বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি এই সনদকে ‘জগাখিচুড়ি’ ও ‘গোঁজামিল’ বলে সমালোচনা করেন, যা জাতিকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন উল্লেখ করেন, সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে তবে তা তড়িঘড়ি করে করা উচিত নয়। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে সমাজ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিবর্তন এসেছে; এসব পরিবর্তনের প্রতিফলন সংবিধানে থাকা দরকার, পাশাপাশি মূলনীতিগুলো রক্ষাও জরুরি। তিনি অতীতে উপেক্ষিত মতামত শোনার সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান এবং জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের দাবি করেন।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি সুব্রত চৌধুরী জানান, সংবিধানের মূল আদর্শ ও নীতি থেকে দেশ অনেক দূরে সরে গেছে। তিনি দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে বারবার বাহ্যিক সংবিধানে ফিরে যেতে হবে। তিনি মৌলবাদী গোষ্ঠীকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা রোধে তাদের নির্মূলের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
বিজ্ঞাপন
সভায় গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান তারিক চৌধুরী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। রেজাউল ইসলাম ও মুরাদ আল হাসানের সঞ্চালনায় উপস্থিতরা আরও বক্তব্য দেন, যার মধ্যে রয়েছে সাবেক সভাপতি মো. ইয়াহিয়া, বর্তমান সহসভাপতি জগলুল হায়দার আফ্রিক, আলী আজম, আনোয়ারুল হক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমাউন কবির।