ফয়েজ লেক ভ্রমণ গাইড: প্রবেশের নিয়ম, দেখার জায়গা ও যাতায়াত
ট্রাভেল ডেস্ক · চট্টগ্রাম
প্রকাশ:
চট্টগ্রাম শহরে পরিবার নিয়ে এক বেলা কাটানোর জায়গা খুঁজলে বেশির ভাগ মানুষের মুখে প্রথম যে নাম আসে, তা ফয়েজ লেক। পাহাড়ের ভাঁজে আঁকাবাঁকা লম্বা একটা লেক, তার চারপাশে রাইড, নৌকা, রেস্তোরাঁ আর ওপরে ওঠার সিঁড়ি। শিশুদের জন্য এটা মেলার মতো আনন্দ, বড়দের জন্য শহরের ভেতরেই একটু সবুজ।
বিজ্ঞাপন
ফয়েজ লেক কোথায় অবস্থিত, এর উত্তর চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়তলী-খুলশী এলাকায়, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ঠিক পাশে। লেকটির জন্ম বিশ শতকের গোড়ার দিকে, তখনকার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে পানির চাহিদা মেটাতে পাহাড়ি ছড়ায় বাঁধ দিয়ে এটি তৈরি করে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়ের এক ইংরেজ প্রকৌশলীর নামে এর নাম রাখা হয়। জমির মালিকানা এখনো রেলওয়ের, আর বিনোদনকেন্দ্রটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইজারা নিয়ে পরিচালনা করে।
তাই ফয়েজ লেক এখন আর খোলা পাবলিক লেক নয়। এখানে ঢুকতে টিকিট লাগে, আর ভেতরের আকর্ষণগুলো বিভিন্ন প্যাকেজে ভাগ করা। কোন প্যাকেজ নেবেন, তা আগে বুঝে নিলে সময় ও টাকা দুটোই বাঁচে।
ফয়েজ লেক যাওয়ার উপায়
চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পর এখানে যাওয়া সহজ। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার তিনটি পথ আছে।
বিজ্ঞাপন
১. ট্রেনে: কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সোনার বাংলা, সুবর্ণ, মহানগর, তূর্ণা নিশীথাসহ বেশ কয়েকটি আন্তনগর ট্রেন চট্টগ্রাম যায়। সময় লাগে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা, ট্রেনভেদে। শোভন চেয়ারের ভাড়া আনুমানিক ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার কাছাকাছি, এসি আসনে বেশি।
২. বাসে: সায়েদাবাদ, আরামবাগ, কলাবাগানসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসি ও নন-এসি বাস চলে। পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার পথ, যানজটভেদে বেশি।
৩. বিমানে: ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় এক ঘণ্টার ফ্লাইট।
৪. শহর থেকে ফয়েজ লেকে: চট্টগ্রাম রেলস্টেশন, নিউমার্কেট বা জিইসি মোড় থেকে সিএনজিতে ফয়েজ লেক যেতে আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা লাগে, যানজটভেদে বিশ মিনিট থেকে আধা ঘণ্টা। অ্যাপভিত্তিক গাড়িও পাওয়া যায়। চালককে চিড়িয়াখানা বা ফয়েজ লেকের গেট বললেই চলবে।
বিজ্ঞাপন
ভেতরে কী কী আছে
পুরো এলাকাটি মূলত কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। প্রতিটির টিকিট আলাদা বা প্যাকেজে একসঙ্গে পাওয়া যায়।
১. অ্যামিউজমেন্ট পার্ক: নাগরদোলা, রোলার কোস্টারধর্মী রাইড, বাম্পার কার, শিশুদের ছোট রাইডসহ নানা আয়োজন। পরিবারের সবার জন্য কিছু না কিছু আছে।
২. নৌভ্রমণ: লেকের ভেতর দিয়ে নৌকা বা বোটে ঘোরা যায়। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লেকের বাঁকগুলো নৌকা থেকেই সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. ওয়াটার পার্ক: আলাদা অংশে কৃত্রিম ঢেউয়ের পুল, স্লাইড ও পানির রাইড। এখানে ঢোকার টিকিট আলাদা এবং নির্দিষ্ট পোশাকবিধি থাকে।
৪. রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ: লেকের পাড়ে থাকার রিসোর্ট আছে, যেখানে রাত কাটিয়ে সকালে লেক দেখা যায়। ভেতরে কয়েকটি খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ আছে।
৫. পাহাড়ের চূড়া ও ভিউপয়েন্ট: সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে লেক আর আশপাশের পাহাড়ের ছবির মতো দৃশ্য দেখা যায়।
ফয়েজ লেক প্রবেশ মূল্য ও টিকিটের নিয়ম
বিজ্ঞাপন
এখানে টিকিটের দাম নির্দিষ্ট একটি অঙ্কে বলা কঠিন, কারণ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সময়ে সময়ে দাম ও প্যাকেজ বদলায়। সাধারণভাবে যে বিষয়গুলো জানা দরকার:
১. শুধু প্রবেশ টিকিট: পার্কে ঢুকে হাঁটা ও লেক দেখার জন্য একটি মৌলিক টিকিট থাকে। এতে রাইড অন্তর্ভুক্ত থাকে না, রাইডের জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়।
২. প্রবেশ ও রাইডসহ প্যাকেজ: নির্দিষ্টসংখ্যক বা সব রাইডসহ প্যাকেজ পাওয়া যায়। শিশু থাকলে এ ধরনের প্যাকেজই সাধারণত সাশ্রয়ী।
৩. ওয়াটার পার্কের টিকিট: আলাদা, তুলনামূলক বেশি দামের।
বিজ্ঞাপন
৪. শিশুদের টিকিট: নির্দিষ্ট উচ্চতা বা বয়সের নিচের শিশুদের জন্য ছাড় বা ফ্রি প্রবেশের নিয়ম থাকতে পারে।
মোটামুটি ধারণা হিসেবে, শুধু প্রবেশে কয়েকশ টাকা এবং রাইডসহ প্যাকেজে আনুমানিক হাজার টাকার কাছাকাছি বা বেশি ধরে রাখুন। ওয়াটার পার্কে এর চেয়ে বেশি লাগতে পারে। গেটে টানানো মূল্যতালিকা দেখে তারপর টিকিট কিনুন।
কখন যাবেন
ফয়েজ লেক সারা বছর খোলা থাকে, সাধারণত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। বর্ষায় পাহাড় সবুজ থাকে আর লেক ভরা থাকে, কিন্তু বৃষ্টিতে কিছু রাইড বন্ধ রাখা হতে পারে এবং সিঁড়ি পিচ্ছিল হয়। গ্রীষ্মে দুপুরে রোদ কড়া, তখন ওয়াটার পার্কটাই বেশি উপভোগ্য।
বিজ্ঞাপন
শুক্র-শনিবার আর ঈদের ছুটিতে খুব ভিড় হয়, রাইডে লম্বা লাইন পড়ে। সপ্তাহের কর্মদিবসে সকালে গেলে আরামে সব দেখা যায়।
একই দিনে আশপাশে যা ঘুরবেন
১. চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা: ফয়েজ লেকের গেটের উল্টো দিকেই। শিশুদের নিয়ে গেলে একই দিনে দুটোই দেখা যায়।
২. বাটালি হিল: শহরের উঁচু টিলা, ওপর থেকে শহরের দৃশ্য দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত: বিকেলে সূর্যাস্ত দেখতে চাইলে ফয়েজ লেক থেকে সরাসরি পতেঙ্গা যাওয়া যায়, যানজটভেদে ঘণ্টাখানেক লাগে।
৪. কর্ণফুলী নদী ও কাছের দর্শনীয় স্থান: সময় থাকলে নদীর পাড় বা শহরের পুরোনো এলাকাও ঘুরে দেখা যায়।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে গেলে
ফয়েজ লেক পাহাড়ি এলাকায়, তাই ভেতরে অনেক জায়গায় ঢাল আর সিঁড়ি আছে। বয়স্ক বা হাঁটুর সমস্যা আছে এমন কেউ সঙ্গে থাকলে কোন অংশে যাবেন, তা আগে ঠিক করে নিন। নিচের লেকপাড় আর রাইডের এলাকা তুলনামূলক সমতল, কিন্তু ভিউপয়েন্টে উঠতে বেশ খাটুনি লাগে। মাঝে মাঝে বসার জায়গা আছে, তাড়াহুড়া না করে বিশ্রাম নিয়ে এগোনোই ভালো।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের জন্য পরিকল্পনা করার সময় ছোট রাইডগুলো আগে সেরে ফেলুন, কারণ দুপুরের পর লাইন লম্বা হয় আর শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ভিড়ের মধ্যে শিশু হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, তাই তাদের পকেটে অভিভাবকের মোবাইল নম্বর লেখা একটা কাগজ রেখে দিন। দলবেঁধে গেলে কোথায় আবার একত্র হবেন, তা প্রবেশপথেই ঠিক করে নিন।
গরমের দিনে টুপি, সানস্ক্রিন আর পানির বোতল সঙ্গে রাখুন। বর্ষায় ছাতা বা রেইনকোট নিন। শিশুদের এক সেট বাড়তি জামা ব্যাগে রাখলে নৌকা বা পানির রাইডের পর কাজে আসে।
কাজে লাগবে এমন কিছু পরামর্শ
ভেতরে খাবারের দাম বাইরের চেয়ে বেশি। বাইরের খাবার নিয়ে ঢোকার নিয়ম আছে কি না, গেটে জেনে নিন। পানির বোতল সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ওয়াটার পার্কে গেলে অতিরিক্ত এক সেট পোশাক, তোয়ালে আর মূল্যবান জিনিস রাখার ব্যবস্থার খোঁজ নিন। লকার সুবিধা থাকলেও ভিড়ের দিনে তা দ্রুত ভরে যায়।
রাইডে ওঠার আগে বয়স, উচ্চতা আর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা পড়ুন। হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দ্রুতগতির রাইড এড়িয়ে চলুন। নৌকায় ওঠার সময় লাইফ জ্যাকেট পরুন, শিশুদের হাত ধরে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফয়েজ লেকে কি শুধু হাঁটার জন্য ঢোকা যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, সাধারণত শুধু প্রবেশের একটি টিকিট থাকে। তবে রাইড, নৌকা বা ওয়াটার পার্ক ব্যবহার করতে আলাদা টাকা লাগে।
ফয়েজ লেক ঘুরতে কত সময় লাগে?
রাইডসহ পুরো পার্ক ঘুরতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। ওয়াটার পার্ক যোগ করলে প্রায় পুরো দিন।
রাতে কি ফয়েজ লেকে থাকা যায়?
বিজ্ঞাপন
লেকের ভেতরের রিসোর্টে আগে থেকে বুকিং দিয়ে থাকা যায়। খরচ শহরের সাধারণ হোটেলের চেয়ে বেশি।
ফয়েজ লেক আর চিড়িয়াখানার টিকিট কি একসঙ্গে?
না, দুটি আলাদা কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করে, টিকিটও আলাদা কাটতে হয়।