মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ভ্রমণ: যাওয়ার উপায়, খরচ ও নিরাপত্তার পরামর্শ
ট্রাভেল ডেস্ক · মৌলভীবাজার
প্রকাশ:
পাহাড়ের চূড়া থেকে সাদা ফেনার মতো পানি সোজা নিচে আছড়ে পড়ছে, নিচে তৈরি হয়েছে গভীর একটা কুণ্ড। শব্দটা দূর থেকেই শোনা যায়। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত বহু বছর ধরে দেশের সবচেয়ে পরিচিত জলপ্রপাত। স্কুলের পিকনিক থেকে পরিবারের ঈদভ্রমণ, অনেকের প্রথম জলপ্রপাত দেখার অভিজ্ঞতা এখানেই।
বিজ্ঞাপন
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত কোথায় অবস্থিত, সে প্রশ্নের উত্তর মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা। পাথারিয়া পাহাড়ের একটি ছড়া এখানে উঁচু খাড়া পাথর থেকে নিচে পড়েছে। জলপ্রপাতকে ঘিরে একটি ইকোপার্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। গাড়ি রাখার জায়গা থেকে সিঁড়ি আর পাকা পথ ধরে মিনিট দশ-পনেরো হাঁটলেই জলপ্রপাতের সামনে পৌঁছানো যায়।
অন্য অনেক ঝরনার মতো এখানে দীর্ঘ পাহাড়ি ট্রেকিং লাগে না। এ কারণেই বয়স্ক মানুষ আর শিশুরাও সহজে যেতে পারে। তবে সহজ পথের এই জায়গাতেই অসাবধানতায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বহুবার, তাই নিরাপত্তার অংশটা মন দিয়ে পড়ুন।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত যাওয়ার উপায়
এখানে পৌঁছানোর দুটি সহজ পথ আছে। একটি ট্রেনে কুলাউড়া হয়ে, অন্যটি বাসে।
বিজ্ঞাপন
১. ট্রেনে কুলাউড়া: ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোর বেশির ভাগ কুলাউড়া জংশনে থামে। কমলাপুর থেকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগতে পারে। কুলাউড়া স্টেশন থেকে সিএনজি রিজার্ভ নিয়ে মাধবকুণ্ড যেতে ঘণ্টাখানেক লাগে। সিএনজির ভাড়া আনুমানিক ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা এক দিকে, অপেক্ষাসহ আসা-যাওয়ায় বেশি।
২. বাসে বড়লেখা: সায়েদাবাদ বা মহাখালী এলাকা থেকে সিলেট অঞ্চলের কিছু বাস বড়লেখা পর্যন্ত যায়। বড়লেখা বা কাঁঠালতলী থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় জলপ্রপাতে যাওয়া যায়।
৩. সিলেট শহর থেকে: সিলেট থেকে বড়লেখার বাসে উঠে কাঁঠালতলী বা নির্দিষ্ট মোড়ে নেমে সিএনজি নিতে পারেন। সিলেট থেকে সব মিলিয়ে আড়াই-তিন ঘণ্টা ধরে রাখুন।
৪. শ্রীমঙ্গল থেকে: শ্রীমঙ্গলে থাকলে গাড়ি বা সিএনজি রিজার্ভ করে দিনে মাধবকুণ্ড ঘুরে আসা যায়, পথে কুলাউড়া পড়ে।
বিজ্ঞাপন
দলে চার-পাঁচজন থাকলে কুলাউড়া থেকে সিএনজি রিজার্ভ করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। আসা-যাওয়ার ভাড়া আর অপেক্ষার সময় আগেই ঠিক করে নিন।
কখন গেলে ভালো
মাধবকুণ্ডের পানি নির্ভর করে বৃষ্টির ওপর। বর্ষায়, মোটামুটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর, জলপ্রপাত পুরো শক্তিতে নামে, দেখতে সবচেয়ে নাটকীয়। শরতের শুরুতেও ভালো পানি থাকে। শীতে পানি অনেক কমে যায়, তখন একটা চিকন ধারা দেখা যায়, তবে আবহাওয়া আরামের এবং পথ শুকনো।
যাঁরা পানির তোড় দেখতে চান, তাঁরা বর্ষা বা বর্ষার পরপর যান। যাঁরা আরামে পরিবার নিয়ে ঘুরতে চান, তাঁদের জন্য অক্টোবর-নভেম্বর ভালো সময়। ঈদ ও সরকারি ছুটিতে প্রচণ্ড ভিড় হয়, পারলে সপ্তাহের মাঝামাঝি যান।
বিজ্ঞাপন
জলপ্রপাতে পৌঁছে যা দেখবেন
১. মূল জলপ্রপাত: খাড়া পাথরের দেয়াল বেয়ে পড়া পানির ধারা আর নিচের কুণ্ড। সামনের পাথুরে এলাকা থেকে দেখা ও ছবি তোলা যায়।
২. পরিকুণ্ড ঝরনা: মাধবকুণ্ডের কাছেই ছড়া ধরে কিছুটা হাঁটলে আরেকটি ঝরনা, তুলনামূলক নিরিবিলি। পথে পানি আর পিচ্ছিল পাথর থাকে, তাই সাবধানে যেতে হয়। বর্ষায় পানি বেশি থাকলে এই পথে না যাওয়াই ভালো।
৩. শিবমন্দির: জলপ্রপাতের কাছে একটি প্রাচীন শিবমন্দির আছে। চৈত্র মাসে এখানে বারুণী স্নান উপলক্ষে মেলা বসে, তখন বহু পুণ্যার্থী আসেন।
বিজ্ঞাপন
৪. ইকোপার্কের পথ ও টিলা: পার্কের ভেতরে গাছপালাঘেরা হাঁটার পথ আছে।
৫. খাসিয়া পানপুঞ্জি: আশপাশের পাহাড়ে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর পানের বাগান চোখে পড়ে।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত ভ্রমণ খরচ
নিচের হিসাব আনুমানিক এবং সময়ের সঙ্গে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. প্রবেশ টিকিট: ইকোপার্কে ঢুকতে জনপ্রতি অল্প অঙ্কের টিকিট লাগে, গাড়ি রাখতে আলাদা ফি। বিদেশিদের জন্য টিকিটের দাম বেশি।
২. ঢাকা-কুলাউড়া আসা-যাওয়া: ট্রেনের শোভন চেয়ারে জনপ্রতি আনুমানিক ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা, এসি আসনে বেশি।
৩. স্থানীয় যাতায়াত: কুলাউড়া থেকে সিএনজি আসা-যাওয়ায় আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকা, পুরো গাড়ির জন্য।
৪. খাওয়া: জলপ্রপাতের কাছে কয়েকটি খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ আছে, সাধারণ মানের খাবার পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. থাকা: কুলাউড়া, মৌলভীবাজার শহর বা শ্রীমঙ্গলে নানা দামের হোটেল আছে, রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
রাতের ট্রেনে গিয়ে দিনে ঘুরে রাতের ট্রেনে ফিরলে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় ঘুরে আসা সম্ভব, দলের আকারের ওপর নির্ভর করে।
নিরাপত্তা: যে ভুলগুলো প্রাণ কেড়েছে
মাধবকুণ্ডের সামনের কুণ্ডটি দেখতে শান্ত মনে হলেও বেশ গভীর এবং নিচে পাথর আছে। এখানে গোসল করতে নেমে বা পাথরে পিছলে পড়ে প্রাণহানির খবর বিভিন্ন সময়ে এসেছে। কিছু নিয়ম তাই কঠোরভাবে মেনে চলুন।
বিজ্ঞাপন
১. কুণ্ডে নামবেন না: কর্তৃপক্ষ যেখানে নামতে নিষেধ করে, সেখানে কোনোভাবেই নামবেন না। সাঁতার জানলেও না।
২. উঁচু পাথরে উঠবেন না: জলপ্রপাতের পাশের খাড়া পাথর বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা খুব বিপজ্জনক। শেওলা জমা পাথর ভীষণ পিচ্ছিল।
৩. ঠিক জুতা পরুন: স্যান্ডেলের বদলে গ্রিপওয়ালা জুতা বা স্পোর্টস স্যান্ডেল পরুন।
৪. ভারী বৃষ্টির সময়: পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ পানি বেড়ে যেতে পারে। তখন ছড়ার ভেতরে বা পরিকুণ্ডের পথে যাবেন না।
বিজ্ঞাপন
৫. শিশুদের দিকে নজর: পাথুরে এলাকায় শিশুর হাত ধরে রাখুন।
সেলফি তুলতে গিয়ে কিনারায় যাওয়া, দলবেঁধে হইচই করে পাথরে লাফানো, এগুলোই বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ। পার্কের কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলুন।
থাকা, খাওয়া ও এক দিনের পরিকল্পনা
জলপ্রপাতের একদম পাশে থাকার সুযোগ খুব সীমিত, তাই বেশির ভাগ পর্যটক আশপাশের শহরকে ঘাঁটি বানান। কুলাউড়ায় সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল আছে, মৌলভীবাজার জেলা শহরে বিকল্প আরও বেশি। আর শ্রীমঙ্গলে সাধারণ গেস্টহাউস থেকে শুরু করে চা-বাগানঘেঁষা রিসোর্ট পর্যন্ত সব ধরনের থাকার জায়গা পাওয়া যায়। যাঁরা মাধবকুণ্ডের সঙ্গে লাউয়াছড়া বা চা-বাগানও দেখতে চান, তাঁদের জন্য শ্রীমঙ্গলে থাকা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
বিজ্ঞাপন
খাবারের জন্য জলপ্রপাতের পার্কিং এলাকার কাছে কিছু রেস্তোরাঁ আর ছোট দোকান আছে। ভাত, ডাল, মুরগি, মাছের মতো সাধারণ খাবার মেলে। ছুটির দিনে ভিড়ে খাবার দ্রুত ফুরিয়ে যায়, তাই সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার রাখা ভালো।
এক দিনের একটা সহজ পরিকল্পনা এমন হতে পারে। রাতের ট্রেনে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে ভোরে কুলাউড়া নামুন। স্টেশনের কাছে নাশতা সেরে সিএনজি নিয়ে সকাল আটটা-নয়টার মধ্যে মাধবকুণ্ড পৌঁছান, তখন ভিড় কম থাকে। দুপুর পর্যন্ত জলপ্রপাত আর ইকোপার্ক ঘুরে খাওয়া সেরে কুলাউড়া ফিরুন। বিকেলের বা রাতের ট্রেনে ঢাকার পথ ধরুন। ফিরতি ট্রেনের টিকিট আগেই কেটে রাখলে দুশ্চিন্তা থাকে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত কত উঁচু?
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন সূত্রে উচ্চতা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়, সাধারণভাবে দেড়শ থেকে দুইশ ফুটের মতো বলা হয়। দেশের বড় জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
শীতে কি মাধবকুণ্ডে পানি থাকে?
থাকে, তবে অনেক কম। শীতে সরু একটি ধারা দেখা যায়। ভরা জলপ্রপাত দেখতে চাইলে বর্ষা বা বর্ষার পরপর যান।
এক দিনে ঢাকা থেকে ঘুরে আসা যায়?
বিজ্ঞাপন
রাতের ট্রেনে কুলাউড়া গিয়ে সকালে জলপ্রপাত দেখে বিকেল বা রাতের ট্রেনে ফেরা যায়। তবে বিশ্রামের জন্য এক রাত থাকলে ভালো।
মাধবকুণ্ডের কাছে কি থাকার জায়গা আছে?
জলপ্রপাতের একদম পাশে থাকার সুযোগ সীমিত। বেশির ভাগ পর্যটক কুলাউড়া, মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গলে থাকেন।