গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন আপনি অন্তঃসত্ত্বা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
শরীরে নতুন কোনো পরিবর্তন টের পেলে অনেক নারীর মনে প্রথম প্রশ্ন জাগে, আমি কি অন্তঃসত্ত্বা? গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। কেউ পিরিয়ড মিস হওয়ার আগেই শরীরে পরিবর্তন বুঝতে পারেন, আবার কেউ সপ্তাহ কয়েক পরেও কিছুই টের পান না।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংকেত হলো নিয়মিত মাসিক হওয়া নারীর পিরিয়ড সময়মতো না হওয়া। এর সঙ্গে স্তন ভারী বা ব্যথা হওয়া, বমিভাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আর হালকা রক্তের দাগ দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ মাসিকের আগের সময়েও হয়, তাই লক্ষণ দেখে নয়, প্রেগন্যান্সি টেস্ট আর চিকিৎসকের পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হয়।
নিচে প্রতিটি লক্ষণ কখন দেখা দিতে পারে, টেস্ট কখন করলে ঠিক ফল আসে এবং নিশ্চিত হওয়ার পর কী করবেন, তা ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
পিরিয়ড মিস: সবচেয়ে বড় সংকেত
যাঁদের মাসিক নিয়মিত, তাঁদের নির্ধারিত তারিখের পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মাসিক না হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা মাথায় রাখা উচিত। যাঁদের মাসিক অনিয়মিত, তাঁদের ক্ষেত্রে এই হিসাব মেলানো কঠিন, তাই অন্য লক্ষণ আর টেস্টের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
মনে রাখবেন, শুধু গর্ভধারণ নয়, মানসিক চাপ, হঠাৎ ওজন কমা বা বাড়া, থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, অতিরিক্ত ব্যায়াম কিংবা কিছু ওষুধের কারণেও পিরিয়ড পিছিয়ে যেতে পারে। তাই পিরিয়ড মিস মানেই গর্ভধারণ, এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না।
গর্ভধারণের প্রথম লক্ষণগুলো
১. স্তনে পরিবর্তন: গর্ভধারণের এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই হরমোনের পরিবর্তনে স্তন ভারী, ফোলা বা স্পর্শে ব্যথা লাগতে পারে। স্তনবৃন্তের চারপাশের অংশ কিছুটা গাঢ় রঙের হতে পারে।
২. বমিভাব ও বমি: যাকে প্রচলিত ভাষায় মর্নিং সিকনেস বলা হয়, তা দিনের যেকোনো সময় হতে পারে। সাধারণত গর্ভাবস্থার চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ সপ্তাহের দিকে শুরু হয়। অনেকের আবার একেবারেই হয় না।
বিজ্ঞাপন
৩. অস্বাভাবিক ক্লান্তি: কোনো কারণ ছাড়াই সারা দিন ঘুম ঘুম ভাব আর শরীর ভারী লাগা খুব সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ।
৪. ঘন ঘন প্রস্রাব: জরায়ু বড় হওয়া এবং হরমোনের প্রভাবে শুরু থেকেই প্রস্রাবের বেগ বেশি আসতে পারে।
৫. হালকা রক্তের দাগ: নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুর দেয়ালে বসার সময় কারও কারও হালকা গোলাপি বা বাদামি দাগ দেখা দেয়। এটি সাধারণত মাসিকের চেয়ে অনেক কম, এক-দুই দিনে থেমে যায়। একে ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং বলে।
৬. তলপেটে হালকা টান: মাসিকের আগের ব্যথার মতো মৃদু টান লাগতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৭. খাবারে অরুচি বা বিশেষ খাবারের প্রতি ঝোঁক: কোনো চেনা খাবারের গন্ধ হঠাৎ অসহ্য লাগা, আবার টক বা নির্দিষ্ট কিছু খেতে ইচ্ছা করা।
৮. মেজাজের ওঠানামা, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য ও মাথা ঘোরা: হরমোনের পরিবর্তনে এগুলোও দেখা দিতে পারে।
পিরিয়ড মিস হওয়ার পর লক্ষণ মেলাতে টেস্ট করুন
বাজারে যে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট পাওয়া যায়, তা প্রস্রাবে এইচসিজি নামের একটি হরমোন শনাক্ত করে। গর্ভধারণের পর এই হরমোন ধীরে ধীরে বাড়ে। খুব আগে টেস্ট করলে হরমোনের মাত্রা কম থাকায় গর্ভবতী হলেও ফল নেগেটিভ আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১. কখন করবেন: পিরিয়ড মিস হওয়ার প্রথম দিন বা তার পর থেকে টেস্ট করলে ফল বেশি নির্ভরযোগ্য হয়। এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে করলে আরও ভালো।
২. কোন প্রস্রাব: সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম প্রস্রাবে হরমোনের ঘনত্ব বেশি থাকে, তাই তখন টেস্ট করা ভালো। টেস্টের আগে বেশি পানি খেলে প্রস্রাব পাতলা হয়ে ফল ভুল আসতে পারে।
৩. কীভাবে পড়বেন: কিটের গায়ে লেখা নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফোঁটা প্রস্রাব দিন এবং নির্ধারিত সময় পর ফল দেখুন। সাধারণত দুটি দাগ পজিটিভ আর একটি দাগ নেগেটিভ। হালকা দ্বিতীয় দাগও সাধারণত পজিটিভ ধরা হয়। অনেকক্ষণ পরে ফুটে ওঠা দাগে ভরসা করবেন না।
৪. নেগেটিভ এলে: লক্ষণ থাকলে এবং পিরিয়ড না হলে তিন থেকে সাত দিন পর আবার টেস্ট করুন।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা করে এইচসিজি মাপতে পারেন, যা আরও আগে ও নিশ্চিতভাবে গর্ভধারণ ধরতে পারে। আলট্রাসনোগ্রাম করে ভ্রূণ জরায়ুর ভেতরে ঠিক জায়গায় আছে কি না, তা দেখা হয়।
অনিয়মিত মাসিক হলে কীভাবে বুঝবেন
যাঁদের মাসিক কখনো ২৫ দিনে, কখনো ৪০ দিনে হয়, তাঁদের পক্ষে "পিরিয়ড মিস" ধরাটাই কঠিন। এ ক্ষেত্রে একটি সহজ নিয়ম কাজে আসে: অরক্ষিত সহবাসের অন্তত তিন সপ্তাহ পর টেস্ট করলে ফল সাধারণত নির্ভরযোগ্য হয়। নেগেটিভ এলে এবং মাসিক না হলে এক সপ্তাহ পর আবার করুন।
মাসিক কয়েক মাস ধরে অনিয়মিত থাকলে শুধু গর্ভধারণ নয়, থাইরয়েড বা পলিসিস্টিক ওভারির মতো কারণও খুঁজে দেখা দরকার। যাঁরা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁরা মাসিকের তারিখ একটি ক্যালেন্ডারে বা মোবাইলের নোটে লিখে রাখলে পরে চিকিৎসকের কাছে হিসাব দেওয়া সহজ হয়। গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হলে চিকিৎসক শেষ মাসিকের প্রথম দিন থেকেই গর্ভকাল ও সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ হিসাব করেন, তাই এই তারিখ মনে রাখা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
নিশ্চিত হওয়ার পর প্রথম করণীয়
টেস্ট পজিটিভ এলে যত দ্রুত সম্ভব একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে গর্ভকালীন সেবা শুরু করুন। প্রথম দিকের চেকআপে রক্তচাপ, ওজন, রক্তের গ্রুপ, হিমোগ্লোবিন, সুগার আর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়।
গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র গঠনের জন্য ফলিক অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরা সাধারণত গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় থেকেই ফলিক অ্যাসিড খেতে বলেন; কতটুকু খাবেন, তা চিকিৎসকই ঠিক করবেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, ব্যথানাশক বা ভেষজ খাবেন না। ধূমপান, জর্দা-তামাক থেকে দূরে থাকুন, অন্যের ধোঁয়া থেকেও। এক্স-রে করাতে হলে আগে জানিয়ে দিন যে আপনি অন্তঃসত্ত্বা হতে পারেন। পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি আর বিশ্রামের দিকে নজর দিন।
বিজ্ঞাপন
যে লক্ষণ দেখলে দেরি করবেন না
গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে কিছু উপসর্গ বিপদের সংকেত হতে পারে। প্রচুর রক্তক্ষরণ, তলপেটের এক পাশে তীব্র ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হওয়া জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ বা গর্ভপাতের লক্ষণ হতে পারে। দিনে বহুবার বমি হয়ে কিছুই পেটে না থাকলে, প্রস্রাব কমে গেলে বা তীব্র জ্বর হলেও দ্রুত হাসপাতালে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সহবাসের কত দিন পর গর্ভাবস্থার লক্ষণ বোঝা যায়?
বিজ্ঞাপন
গর্ভধারণ হয় ডিম্বস্ফোটনের আশপাশে, সহবাসের দিনেই নয়। প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণত পরবর্তী মাসিকের তারিখের আশপাশে বা তার কিছু পরে টের পাওয়া যায়। তাই লক্ষণের অপেক্ষা না করে পিরিয়ড মিসের পর টেস্ট করাই ভালো।
পিরিয়ডের আগের লক্ষণ আর গর্ভাবস্থার লক্ষণ আলাদা করব কীভাবে?
স্তনে ব্যথা, তলপেটে টান, মেজাজ খারাপ দুই ক্ষেত্রেই হয়। লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে আলাদা করা যায় না। পিরিয়ড না এলে টেস্টই একমাত্র ভরসাযোগ্য উপায়।
টেস্টে হালকা দাগ এলে কী বুঝব?
বিজ্ঞাপন
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হালকা দ্বিতীয় দাগ এলে সাধারণত গর্ভধারণ হয়েছে বলে ধরা হয়। দু-তিন দিন পর আবার টেস্ট করলে দাগ গাঢ় হয়। নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের কাছে যান।
গর্ভাবস্থায় সব নারীর কি বমি হয়?
না। অনেক নারীর কোনো বমিভাব হয় না এবং এটি অস্বাভাবিক নয়। লক্ষণ কম থাকা মানে গর্ভাবস্থায় সমস্যা, এমন নয়।