কী খেলে রক্ত বাড়ে: রক্তস্বল্পতা দূর করার খাবারের তালিকা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
"রক্ত কম" কথাটি আমাদের দেশে খুব পরিচিত, বিশেষ করে নারী, কিশোরী আর শিশুদের ক্ষেত্রে। চিকিৎসার ভাষায় একে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া বলে, যখন রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ শরীরে আয়রনের ঘাটতি।
বিজ্ঞাপন
কী খেলে রক্ত বাড়ে, এর সংক্ষিপ্ত উত্তর: আয়রন, ফলিক অ্যাসিড আর ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার। প্রাণিজ উৎস যেমন কলিজা, গরু-খাসির মাংস, মুরগি, ডিম ও ছোট মাছ থেকে আয়রন সবচেয়ে ভালো শোষিত হয়। উদ্ভিজ্জ উৎসের মধ্যে কচুশাক, লালশাক, পুঁইশাক, ডাঁটাশাক, ডাল, ছোলা, সয়াবিন আর বাদাম উল্লেখযোগ্য। এসবের সঙ্গে লেবু, পেয়ারা বা আমলকীর মতো ভিটামিন সি থাকলে শরীর আয়রন বেশি কাজে লাগাতে পারে।
তবে মনে রাখা দরকার, সব রক্তস্বল্পতা আয়রনের অভাবে হয় না। কারণ না জেনে শুধু খাবার বা আয়রন ট্যাবলেটের ওপর ভরসা করা ঠিক নয়।
রক্তশূন্যতার লক্ষণ
সামান্য রক্তস্বল্পতায় অনেক সময় কিছুই টের পাওয়া যায় না। ঘাটতি বাড়লে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
বিজ্ঞাপন
১. অল্পতে ক্লান্তি ও দুর্বলতা: সামান্য কাজেই হাঁপিয়ে ওঠা, সারা দিন ঘুম ঘুম ভাব।
২. ফ্যাকাশে ভাব: চোখের নিচের পাতার ভেতরের অংশ, নখ, ঠোঁট আর হাতের তালু সাদাটে দেখানো।
৩. বুক ধড়ফড় ও শ্বাসকষ্ট: সিঁড়ি ভাঙতে বা দ্রুত হাঁটতে কষ্ট।
৪. মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথা: বিশেষ করে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে।
বিজ্ঞাপন
৫. নখ ভঙ্গুর হওয়া, চুল পড়া, হাত-পা ঠান্ডা থাকা।
৬. মাটি, চাল বা বরফ খাওয়ার অস্বাভাবিক ইচ্ছা: আয়রনের ঘাটতিতে এমন হতে পারে।
এসব লক্ষণ অন্য রোগেও হয়। তাই নিশ্চিত হতে রক্তের সিবিসি পরীক্ষা করে হিমোগ্লোবিন দেখে নেওয়াই ভালো।
রক্ত বাড়ানোর খাবার: প্রাণিজ উৎস
বিজ্ঞাপন
কলিজা: মুরগি বা গরুর কলিজা আয়রন, ভিটামিন বি১২ আর ফোলেটের ভালো উৎস। সপ্তাহে এক-দুবার পরিমিত খাওয়া যায়। তবে গর্ভবতী নারীরা কলিজা বেশি খাবেন না, কারণ এতে ভিটামিন এ অনেক বেশি থাকে; পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লাল মাংস: গরু ও খাসির মাংসে সহজে শোষণযোগ্য আয়রন থাকে। তবে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগ থাকলে চর্বি ছাড়িয়ে পরিমিত খান।
মাছ ও ডিম: মলা, ঢেলা, কাচকি, চিংড়ির মতো ছোট মাছ কাঁটাসহ খেলে আয়রন ও ক্যালসিয়াম দুটোই মেলে। ডিমও আয়রন ও বি১২ জোগায়।
মুরগি: সাদা মাংসের চেয়ে রান অংশে আয়রন কিছুটা বেশি।
বিজ্ঞাপন
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: উদ্ভিজ্জ উৎস
যাঁরা মাংস কম খান বা যাঁদের সামর্থ্য সীমিত, তাঁদের জন্য দেশি শাক আর ডাল বড় ভরসা। কচুশাক, লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক, সজনে পাতা, মসুর ও মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, চিনাবাদাম, তিল আর কালো কিশমিশে উল্লেখযোগ্য আয়রন থাকে। গুড় আর খেজুরেও কিছুটা আয়রন আছে।
উদ্ভিজ্জ আয়রন শরীর তুলনামূলক কম শোষণ করে। তাই এসব খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি রাখা খুব কাজের কৌশল। শাক বা ডালের সঙ্গে লেবুর রস চিপে নিন, খাবারের পর একটি পেয়ারা, কমলা বা কয়েকটি আমলকী খান। কাঁচা মরিচ আর টমেটোতেও ভিটামিন সি আছে।
বিট আর ডালিম নিয়ে প্রচলিত ধারণা: রক্ত বাড়ানোর কথা উঠলেই অনেকে বিটরুট আর ডালিমের কথা বলেন। এগুলো পুষ্টিকর খাবার, সন্দেহ নেই। তবে আয়রনের পরিমাণের দিক থেকে কচুশাক, ডাল বা কলিজার চেয়ে এগুলো এগিয়ে নয়। দামি ফলের পেছনে না ছুটে সহজলভ্য শাক, ডাল আর ছোট মাছ নিয়মিত খেলেই বেশি উপকার পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
ফলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন বি১২: লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে শুধু আয়রন নয়, ফোলেট আর বি১২-ও লাগে। সবুজ শাক, ডাল, ছোলা, কমলা আর ডিমে ফোলেট পাওয়া যায়। বি১২ মূলত প্রাণিজ খাবারে থাকে: মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও দই। যাঁরা একেবারে নিরামিষ খান, তাঁদের বি১২-এর ঘাটতি হতে পারে, এ বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
শাক রান্নার কৌশল: শাক বেশিক্ষণ সেদ্ধ করে পানি ফেলে দিলে কিছু পুষ্টি নষ্ট হয়। অল্প পানিতে ঢেকে রান্না করুন, রসুন দিয়ে ভাজি করুন এবং পাতে লেবু চিপে নিন। কচুশাক খেলে গলা চুলকানো এড়াতে লেবু বা তেঁতুল দেওয়া হয়, যা আবার আয়রন শোষণেও সাহায্য করে।
রক্ত বাড়ানোর এক দিনের নমুনা: সকালে রুটি, ডিম আর ডাল; দুপুরে ভাত, কচুশাক বা লালশাক, ছোট মাছ আর লেবু; বিকেলে ছোলা ভুনা বা এক মুঠো চিনাবাদাম, সঙ্গে একটি পেয়ারা; রাতে ভাত বা রুটির সঙ্গে মাংস বা কলিজা ভুনা আর সবজি। চা খেলে দুই বেলার খাবারের মাঝখানে খান।
যা আয়রনের শোষণ কমায়
বিজ্ঞাপন
১. খাবারের সঙ্গে চা-কফি: চায়ের ট্যানিন আয়রন শোষণে বাধা দেয়। ভাত খাওয়ার পরপর চা না খেয়ে অন্তত এক ঘণ্টা বিরতি দিন।
২. একই সময়ে অনেক দুধ বা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট: ক্যালসিয়ামও আয়রনের শোষণ কমাতে পারে। আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট দুটোই খেলে আলাদা সময়ে খান।
৩. কৃমি: পেটে কৃমি থাকলে রক্তক্ষরণ হয় এবং পুষ্টি নষ্ট হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত কৃমিনাশক খাওয়া এবং খালি পায়ে না হাঁটা জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বিজ্ঞাপন
মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয় এমন নারী, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা, দ্রুত বেড়ে ওঠা শিশু ও কিশোরী, নিরামিষভোজী, পাইলস বা পাকস্থলীর আলসারে রক্তক্ষরণ হচ্ছে এমন ব্যক্তি এবং বয়স্করা রক্তস্বল্পতার ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকেরা সাধারণত আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড দিয়ে থাকেন, তা নিয়ম মেনে খাওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ভাব বা বুক ধড়ফড় কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে, কালো পায়খানা বা মলের সঙ্গে রক্ত গেলে, মাসিকে অস্বাভাবিক বেশি রক্ত গেলে কিংবা অকারণে ওজন কমলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান।
চিকিৎসক সাধারণত প্রথমে সিবিসি পরীক্ষা করান, প্রয়োজনে রক্তে আয়রনের মজুত বোঝার পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা দেন। কারণ জানার পর আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, বি১২ বা কৃমির ওষুধ, যা দরকার তা দেওয়া হয়। কোথাও রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না, সেটিও খুঁজে দেখা হয়।
বিজ্ঞাপন
নিজে থেকে আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করবেন না। আমাদের দেশে অনেকে থ্যালাসেমিয়ার বাহক, যাঁদের রক্ত কম দেখালেও আয়রনের ঘাটতি না-ও থাকতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বাড়তি আয়রন উল্টো ক্ষতি করে। তাই পরীক্ষা করে কারণ জেনে তবেই চিকিৎসা নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খাবার খেয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়তে কত দিন লাগে?
হালকা ঘাটতিতে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগতে পারে। ঘাটতি বেশি হলে শুধু খাবারে যথেষ্ট নাও হতে পারে, তখন চিকিৎসক ওষুধ দেন।
বিজ্ঞাপন
লোহার কড়াইয়ে রান্না করলে কি আয়রন বাড়ে?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, লোহার পাত্রে রান্না করলে খাবারে কিছুটা আয়রন যোগ হয়, বিশেষ করে টক জাতীয় খাবারে। এটি সহায়ক হতে পারে, তবে চিকিৎসার বিকল্প নয়।
আয়রন ট্যাবলেট খেলে পায়খানা কালো হয় কেন?
আয়রন ট্যাবলেটে পায়খানা কালচে হওয়া সাধারণ ব্যাপার। তবে পেটব্যথা, বমি বা আলকাতরার মতো কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পায়খানা হলে চিকিৎসককে জানান।
বিজ্ঞাপন
শিশুর রক্তস্বল্পতা হলে কী খাওয়াব?
বয়স অনুযায়ী ডিম, ডাল, মাছ, মাংসের কিমা, শাক মেশানো খিচুড়ি আর ফল। শিশুকে গরুর দুধ বেশি খাওয়ালে অন্য খাবার কম খায়, এতে আয়রনের ঘাটতি বাড়তে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শে পরীক্ষা করিয়ে নিন।