রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়: খাবার, ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাস
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাজারে এমন অনেক পণ্য পাওয়া যায়, যার গায়ে লেখা থাকে "ইমিউনিটি বুস্টার"। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো একটি খাবার, পানীয় বা ক্যাপসুল খেয়ে রাতারাতি শরীরের প্রতিরোধ শক্তি বাড়ানো যায় না। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একটি জটিল ব্যবস্থা, যা ঠিকমতো কাজ করে তখনই, যখন শরীর সামগ্রিকভাবে ভালো থাকে।
বিজ্ঞাপন
তাহলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় কী? উত্তর সহজ, কিন্তু মেনে চলতে ধৈর্য লাগে: প্রতিদিন নানা রঙের শাকসবজি ও ফল, পর্যাপ্ত আমিষ, রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, হাত ধোয়ার অভ্যাস, ধূমপান থেকে দূরে থাকা এবং সময়মতো টিকা নেওয়া। এগুলো একসঙ্গে চললে শরীর সংক্রমণের সঙ্গে লড়তে বেশি প্রস্তুত থাকে।
শরীরের প্রতিরোধ শক্তি আসলে কী
আমাদের ত্বক, নাক-মুখের ভেতরের আবরণ, পাকস্থলীর অম্ল আর রক্তের শ্বেতকণিকা মিলে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। জীবাণু শরীরে ঢুকলে এই ব্যবস্থা তাকে চিনে ফেলে এবং ধ্বংস করার চেষ্টা করে। একবার কোনো জীবাণুর সঙ্গে লড়াই হলে শরীর অনেক সময় তা মনে রাখে, পরেরবার দ্রুত সাড়া দেয়। টিকা এই স্মৃতিকেই কাজে লাগায়।
এই ব্যবস্থা চালাতে শরীরের দরকার নিয়মিত পুষ্টি, বিশ্রাম আর সুস্থ রক্ত সঞ্চালন। বয়স বাড়লে, ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগ থাকলে, অপুষ্টিতে ভুগলে কিংবা কিছু ওষুধ দীর্ঘদিন খেলে প্রতিরোধ শক্তি কমে যেতে পারে। তাই একই পরামর্শ সবার জন্য সমান কাজ করে না।
বিজ্ঞাপন
ইমিউনিটি বাড়ানোর খাবার: যা রোজ প্লেটে রাখবেন
পুষ্টির ঘাটতি থাকলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, এটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই লক্ষ্য হলো ঘাটতি না রাখা।
ভিটামিন সি: আমলকী, পেয়ারা, লেবু, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, আমড়া, কাঁচা মরিচ, টমেটো আর সবুজ শাকে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। আমাদের দেশি পেয়ারা আর আমলকী সস্তায় পাওয়া যায় এবং ভিটামিন সির চমৎকার উৎস। ভিটামিন সি শরীরে জমা থাকে না, তাই প্রতিদিন কিছু না কিছু খেতে হয়।
আমিষ: রোগ প্রতিরোধে কাজ করা কোষ আর অ্যান্টিবডি তৈরিতে আমিষ লাগে। মাছ, ডিম, মুরগি, ডাল, ছোলা, দুধ আর দই থেকে প্রতিবেলায় কিছু আমিষ রাখুন।
বিজ্ঞাপন
জিংক: মাংস, ডিম, ডাল, বাদাম, বীজ আর সামুদ্রিক খাবারে জিংক পাওয়া যায়। জিংকের ঘাটতিতে সংক্রমণ বেশি হতে পারে।
ভিটামিন এ: গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পাকা পেঁপে, আম, লালশাক, পুঁইশাক আর ছোট মাছে ভিটামিন এ থাকে। এটি শ্বাসনালি ও অন্ত্রের আবরণ সুস্থ রাখতে দরকারি।
ভিটামিন ডি: সকালের দিকের রোদে কিছুক্ষণ থাকলে শরীর নিজেই ভিটামিন ডি তৈরি করে। তৈলাক্ত মাছ ও ডিমের কুসুমেও কিছুটা থাকে। যাঁরা সারা দিন ঘরে বা অফিসে থাকেন, তাঁদের ঘাটতি হতে পারে।
দই ও আঁশযুক্ত খাবার: টক দই, শাকসবজি, ডাল আর গোটা শস্য অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য ভালো, যা রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিজ্ঞাপন
রসুন, আদা, হলুদ, মধু আমাদের রান্নার স্বাস্থ্যকর অংশ। তবে এগুলো খেলেই সংক্রমণ হবে না, এমন দাবির শক্ত প্রমাণ নেই। এগুলোকে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে দেখুন, ওষুধ হিসেবে নয়।
একটি সাধারণ দিনের উদাহরণ ধরা যাক। সকালে রুটি, ডিম আর সবজি; দুপুরে ভাত, শাক, ডাল আর মাছ; বিকেলে একটি পেয়ারা বা কয়েকটি আমলকী; রাতে ভাত বা রুটির সঙ্গে মুরগি বা ডাল আর এক বাটি দই। এমন সাধারণ ঘরোয়া খাবারেই প্রয়োজনীয় পুষ্টির বড় অংশ মিটে যায়। আলাদা দামি খাবারের দরকার পড়ে না।
ঘুম আর শরীরচর্চা: সবচেয়ে অবহেলিত দুই উপায়
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর সংক্রমণ ঠেকাতে কম দক্ষ হয়ে পড়ে। প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার, স্কুলপড়ুয়া শিশু ও কিশোরদের আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন একই সময়ে শোয়া ও ওঠার চেষ্টা করুন। শোয়ার এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ও টিভি বন্ধ করুন। সন্ধ্যার পর চা-কফি কমান। ঘর অন্ধকার ও আরামদায়ক ঠান্ডা রাখুন। দুপুরে ঘুমালে আধা ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখুন।
শরীরচর্চার ক্ষেত্রে মাত্রা বোঝা জরুরি। মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম, যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা ঘরের কাজ, রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়। জ্বর বা শরীর খারাপ থাকলে ব্যায়াম না করে বিশ্রাম নিন।
পরিচ্ছন্নতা ও টিকা
শরীরের প্রতিরোধ শক্তি যত ভালোই হোক, জীবাণু ঢোকার সুযোগ কমানো দরকার। খাওয়ার আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর আর বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধোন। পানি ফুটিয়ে বা নিরাপদভাবে বিশুদ্ধ করে পান করুন। কাঁচা সবজি ও ফল ভালো করে ধুয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
টিকা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট জীবাণু চিনতে শেখায়। শিশুদের ইপিআই কর্মসূচির সব টিকা সময়মতো দিন। বয়স্ক, ডায়াবেটিস বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিরা কোন টিকা নিতে পারেন, তা চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন।
যে অভ্যাসগুলো প্রতিরোধ শক্তি কমায়
১. ধূমপান ও তামাক: ফুসফুসের প্রাকৃতিক সুরক্ষা নষ্ট করে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়ায়।
২. অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার: ওজন বাড়ায় এবং পুষ্টিকর খাবারের জায়গা দখল করে।
বিজ্ঞাপন
৩. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ: দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রার্থনা, হাঁটা, বন্ধু-পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো আর শখের কাজ চাপ কমায়।
৪. অতিরিক্ত ওজন: স্থূলতা নানা সংক্রমণের জটিলতা বাড়ায়।
৫. নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া: প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক অন্ত্রের উপকারী জীবাণু নষ্ট করে এবং ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
সাপ্লিমেন্ট কি দরকার, চিকিৎসক কখন দেখাবেন
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ মানুষের সুষম খাবারেই চলে যায়। গর্ভবতী নারী, বয়স্ক, দীর্ঘদিনের রোগী বা যাঁদের রক্ত পরীক্ষায় ঘাটতি ধরা পড়েছে, তাঁদের চিকিৎসক প্রয়োজনে ভিটামিন বা খনিজ দিতে পারেন। নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন খাওয়া ঠিক নয়; কিছু ভিটামিন বেশি খেলে ক্ষতিও হতে পারে।
ঘন ঘন জ্বর, সর্দি-কাশি বা প্রস্রাবের সংক্রমণ হলে, ক্ষত শুকাতে অনেক দেরি হলে, অকারণে ওজন কমতে থাকলে বা দীর্ঘ সময় ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এগুলো ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা বা অন্য কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে, যা শুধু খাবার দিয়ে ঠিক হবে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় যেসব খাবার, সেগুলো কি বেশি খেলে বেশি উপকার?
বিজ্ঞাপন
না। ঘাটতি পূরণ হয়ে গেলে বাড়তি খেয়ে বাড়তি সুরক্ষা পাওয়া যায় না। বৈচিত্র্যময় ও পরিমিত খাবারই যথেষ্ট।
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কী করব?
ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ, তারপর মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার, সময়মতো টিকা, পর্যাপ্ত ঘুম আর খেলাধুলা। শিশুকে কোনো সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার আগে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
গরম পানি বা মধু-লেবু পানি কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়?
বিজ্ঞাপন
গলা আরাম দিতে এবং পানির চাহিদা মেটাতে এগুলো ভালো। তবে এগুলো সংক্রমণ ঠেকায়, এমন প্রমাণ নেই।
কত দিনে শরীরের প্রতিরোধ শক্তি বাড়ে?
নির্দিষ্ট সময় বলা যায় না। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস ধারাবাহিকভাবে চালালে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি টের পাওয়া যায়।