শীতে ত্বকের যত্ন: রুক্ষ আর টান ধরা ত্বক ভালো রাখার উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
অগ্রহায়ণের শেষ দিক থেকেই টের পাওয়া যায়, গোসলের পর মুখ টান টান লাগছে, হাত-পায়ে সাদা খসখসে দাগ পড়ছে, ঠোঁট ফেটে যাচ্ছে। শীতের বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে, তার ওপর আমরা গরম পানিতে লম্বা সময় গোসল করি। দুয়ে মিলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল আর পানি দ্রুত হারিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
শীতে ত্বকের যত্নের মূল কথা তিনটি: ত্বক থেকে তেল কম তুলে ফেলা, যতটুকু আর্দ্রতা আছে তা আটকে রাখা, আর ফাটার ঝুঁকি থাকা জায়গাগুলোর আলাদা যত্ন নেওয়া। কুসুম গরম পানিতে অল্প সময় গোসল, মৃদু সাবান, গোসলের তিন মিনিটের মধ্যে ময়েশ্চারাইজার, রাতে ঠোঁট ও গোড়ালিতে ঘন ক্রিম বা পেট্রোলিয়াম জেলি, এই অভ্যাসগুলো প্রায় সবার ত্বকে কাজ করে।
দামি প্রসাধনী লাগে না। বাজারের সাধারণ গ্লিসারিন, পেট্রোলিয়াম জেলি বা সুগন্ধিহীন লোশনেই শীত পার করা যায়, যদি নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হয়।
শীতকালে ত্বক কেন এত শুষ্ক হয়
ত্বকের সবচেয়ে ওপরের স্তরটি ইটের দেয়ালের মতো। কোষগুলো ইট, আর তাদের মাঝের প্রাকৃতিক তেল ও চর্বি হলো গাঁথুনি। এই গাঁথুনি ঠিক থাকলে ভেতরের পানি বের হতে পারে না। শীতের শুকনো বাতাস, গরম পানি আর কড়া সাবান এই গাঁথুনিকে দুর্বল করে দেয়। তখন ত্বক থেকে পানি বেরিয়ে যায়, ত্বক খসখসে হয়, চুলকায়, কখনো সূক্ষ্ম ফাটল ধরে।
বিজ্ঞাপন
বয়স্কদের ত্বকে প্রাকৃতিক তেল এমনিতেই কম থাকে, তাই শীতে তাঁদের কষ্ট বেশি হয়। শিশু, ডায়াবেটিস রোগী আর যাঁদের একজিমা বা অ্যালার্জির প্রবণতা আছে, তাঁদেরও বাড়তি যত্ন দরকার।
গোসল আর মুখ ধোয়ার নিয়ম বদলান
১. পানির তাপমাত্রা: খুব গরম নয়, কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন। গরম পানি আরাম দেয়, কিন্তু ত্বকের তেল সবচেয়ে বেশি তুলে ফেলে।
২. সময়: গোসল ১০ মিনিটের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করুন।
বিজ্ঞাপন
৩. সাবান: কড়া ক্ষারযুক্ত বা অনেক সুগন্ধিযুক্ত সাবানের বদলে মৃদু, ময়েশ্চারাইজিং সাবান বা বডিওয়াশ বেছে নিন। সাবান মূলত বগল, কুঁচকি আর পায়ে দিলেই চলে, পুরো শরীরে বারবার ঘষার দরকার নেই।
৪. মোছার ধরন: তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে না মুছে আলতো চেপে চেপে পানি শুষে নিন, ত্বক সামান্য ভেজা থাকুক।
৫. মুখ ধোয়া: দিনে দুবারের বেশি ফেসওয়াশ ব্যবহার করবেন না। শুষ্ক ত্বক হলে ক্রিমি বা হালকা ফেসওয়াশ ভালো। স্ক্রাব সপ্তাহে একবারের বেশি নয়।
শীতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার: কোনটি, কখন, কীভাবে
বিজ্ঞাপন
গোসল বা মুখ ধোয়ার পর তিন মিনিটের মধ্যে, ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগান। এতে ত্বকের ওপর থাকা পানি আটকে যায়। দিনে অন্তত দুবার, আর হাত ধোয়ার পর প্রতিবার লাগানো ভালো।
হালকা লোশন: স্বাভাবিক বা মিশ্র ত্বকে দিনের বেলায় উপযোগী।
ঘন ক্রিম: শুষ্ক ত্বক, হাত আর পায়ের জন্য ভালো। লেবেলে সেরামাইড, গ্লিসারিন, শিয়া বাটার বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিড থাকলে তা আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
পেট্রোলিয়াম জেলি: খুব শুষ্ক জায়গা, ফাটা ঠোঁট আর গোড়ালির জন্য সস্তা ও কার্যকর। এটি ত্বকের ওপর একটি আবরণ তৈরি করে পানি বের হতে দেয় না। ভেজা ত্বকে পাতলা করে লাগান।
বিজ্ঞাপন
গ্লিসারিন: খাঁটি গ্লিসারিন বেশ চটচটে; গোলাপজল বা পানির সঙ্গে মিশিয়ে পাতলা করে নিলে ব্যবহার সহজ হয়। খুব শুকনো আবহাওয়ায় শুধু গ্লিসারিন লাগিয়ে ওপরে কোনো ক্রিম না দিলে কারও কারও ত্বক উল্টো টান ধরতে পারে।
তেল: নারকেল বা অলিভ তেল গোসলের পর ভেজা শরীরে অল্প লাগালে অনেকের উপকার হয়। তবে মুখে ব্রণের প্রবণতা থাকলে মুখে ভারী তেল এড়িয়ে চলুন।
তৈলাক্ত ত্বকের মানুষও শীতে ময়েশ্চারাইজার বাদ দেবেন না; তাঁদের জন্য জেল বা পানিভিত্তিক হালকা ময়েশ্চারাইজার উপযোগী।
ঠোঁট, হাত আর ফাটা গোড়ালির যত্ন
বিজ্ঞাপন
ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজাবেন না, এতে আরও শুকায়। দিনে কয়েকবার লিপবাম বা পেট্রোলিয়াম জেলি দিন, রাতে ঘুমানোর আগে একটু ঘন করে। ফাটা চামড়া টেনে তুলবেন না।
হাত ধোয়ার পর প্রতিবার ক্রিম লাগানোর অভ্যাস করুন। কাপড় কাচা বা থালাবাসন মাজার সময় সম্ভব হলে রাবারের গ্লাভস পরুন, কারণ ডিটারজেন্ট হাতের ত্বক খুব শুকিয়ে ফেলে।
গোড়ালি ফাটা কমাতে রাতে পা কুসুম গরম পানিতে দশ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন, ঝামা বা ফুট স্ক্রাবার দিয়ে আলতো ঘষে মরা চামড়া তুলুন, তারপর মুছে ঘন ক্রিম বা পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে সুতির মোজা পরে ঘুমান। কয়েক দিনের মধ্যেই পার্থক্য বোঝা যায়।
খাবার, পানি আর রোদের দিকেও নজর
বিজ্ঞাপন
শীতে তৃষ্ণা কম লাগে বলে অনেকে পানি কম খান। এতে ত্বকও শুকিয়ে যায়। দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, স্যুপ আর মৌসুমি ফল খান। শীতের সবজি যেমন গাজর, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, পালংশাক আর কমলা, ছোট মাছ ও ডিম ত্বকের জন্য দরকারি পুষ্টি জোগায়।
শীতে রোদ মিষ্টি লাগলেও অতিবেগুনি রশ্মি ঠিকই থাকে। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে মুখ ও হাতে সানস্ক্রিন লাগান। ঘরের ভেতরে হিটার চালালে বাতাস আরও শুকায়; পাশে এক বাটি পানি রাখলে কিছুটা আর্দ্রতা থাকে।
উলের কাপড় সরাসরি ত্বকে লাগলে অনেকের চুলকানি হয়। ভেতরে একটি সুতির জামা পরে ওপরে সোয়েটার পরুন। শীতের কাপড় আলমারি থেকে বের করে সরাসরি না পরে একবার ধুয়ে বা রোদে দিয়ে নিন, জমে থাকা ধুলা আর পোকামাকড়ের কারণেও চুলকানি হতে পারে।
শীতের এক দিনের সহজ রুটিন এমন হতে পারে: সকালে কুসুম গরম পানিতে মুখ ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার আর বাইরে গেলে সানস্ক্রিন; দুপুরে গোসলের পরপর শরীরে লোশন বা তেল; সন্ধ্যায় হাত ধোয়ার পর ক্রিম; রাতে মুখে ময়েশ্চারাইজার, ঠোঁটে লিপবাম আর গোড়ালিতে পেট্রোলিয়াম জেলি দিয়ে মোজা।
বিজ্ঞাপন
যে ভুলগুলো এড়াবেন, কখন চিকিৎসক দেখাবেন
চুলকানি হলে নখ দিয়ে জোরে চুলকানো, ত্বকে কেরোসিন বা ডিটারজেন্ট লাগানো, শিশুর গায়ে খুব গরম পানি ঢালা, আর লেবু বা অ্যালকোহলযুক্ত টোনার মুখে ঘষা শীতে ক্ষতি বাড়ায়।
ময়েশ্চারাইজার নিয়মিত লাগানোর পরও যদি ত্বক লাল হয়ে চুলকায়, ফাটল থেকে রক্ত বা পুঁজ বের হয়, আঁশের মতো মোটা চাকা ওঠে কিংবা ঘুম নষ্ট করার মতো চুলকানি থাকে, তাহলে একজিমা, সোরিয়াসিস বা ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে। এমন হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের ফাটলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি, তাই দেরি করবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
শীতে তৈলাক্ত ত্বকেও কি ময়েশ্চারাইজার লাগবে?
হ্যাঁ। তেল আর আর্দ্রতা এক জিনিস নয়। তৈলাক্ত ত্বকেও শীতে পানি কমে যায়। হালকা, জেলভিত্তিক ময়েশ্চারাইজার বেছে নিন।
শীতে কি প্রতিদিন গোসল করা উচিত?
প্রতিদিন গোসল করা যায়, তবে কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ে আর মৃদু সাবানে। গোসলের পরপর ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বক শুকায় না।
বিজ্ঞাপন
রাতে মুখে কী লাগাব?
মুখ ধুয়ে সামান্য ভেজা থাকতে একটি ময়েশ্চারাইজিং নাইট ক্রিম বা সাধারণ ঘন ময়েশ্চারাইজার লাগালেই যথেষ্ট। খুব শুষ্ক জায়গায় পাতলা করে পেট্রোলিয়াম জেলি দেওয়া যায়।
শিশুর শীতের ত্বকের যত্ন কীভাবে নেব?
শিশুকে কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ে গোসল করিয়ে সুগন্ধিহীন বেবি লোশন বা ক্রিম লাগান। চুলকানি, লাল দানা বা ফাটল দেখা দিলে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।
বিজ্ঞাপন
ফাটা ঠোঁটে ঘি বা সরিষার তেল দেওয়া কি ভালো?
অল্প ঘি বা নারকেল তেল সাময়িক আরাম দিতে পারে। তবে ঠোঁটে আবরণ তৈরি করে আর্দ্রতা আটকাতে পেট্রোলিয়াম জেলি বা লিপবাম বেশি কার্যকর। সরিষার তেলে অনেকের ঝাঁজ লাগে, তাই ফাটা ও জ্বালা করা ঠোঁটে এড়িয়ে চলাই ভালো।