মাসিকের ব্যথা কমানোর উপায়: গরম সেঁক, খাবার আর হালকা ব্যায়াম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
মাসিক শুরুর আগের দিন বা প্রথম দুই দিন তলপেটে মোচড়ানো ব্যথা, কোমর আর ঊরুতে টান, সঙ্গে বমিভাব, এই অভিজ্ঞতা অনেক কিশোরী ও নারীর প্রতি মাসের সঙ্গী। কারও ব্যথা হালকা, কয়েক ঘণ্টায় কমে যায়; কারও এত তীব্র যে স্কুল, কলেজ বা অফিসে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
ভালো খবর হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাসিকের ব্যথা কমানোর উপায় ঘরেই আছে। তলপেটে গরম পানির ব্যাগ বা গরম কাপড়ের সেঁক, হালকা হাঁটা ও স্ট্রেচিং, গরম পানীয়, পর্যাপ্ত পানি আর বিশ্রাম ব্যথা অনেকটা কমিয়ে দেয়। প্রয়োজনে ফার্মেসির সাধারণ ব্যথানাশক চিকিৎসকের পরামর্শে খাওয়া যায়।
তবে ব্যথা যদি প্রতি মাসে বাড়তে থাকে, মাসিকের বাইরেও থাকে, অথবা অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ হয়, তাহলে সেটিকে "স্বাভাবিক" বলে মেনে নেওয়া ঠিক নয়। কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, তা নিচে আলাদা করে বলা হয়েছে।
তলপেটে ব্যথা কেন হয়
মাসিকের সময় জরায়ু তার ভেতরের আস্তরণ বের করে দিতে সংকুচিত হয়। এই সংকোচন ঘটায় প্রোস্টাগ্লান্ডিন নামের কিছু রাসায়নিক। যাঁদের শরীরে এর মাত্রা বেশি, তাঁদের সংকোচন জোরালো হয়, ব্যথাও বেশি লাগে। এ ধরনের ব্যথা সাধারণত কিশোর বয়সে মাসিক শুরুর কিছুদিন পর থেকে দেখা দেয় এবং বয়স বাড়লে বা সন্তান জন্মের পর অনেকের কমে আসে।
বিজ্ঞাপন
আরেক ধরনের ব্যথা হয় জরায়ু বা ডিম্বাশয়ের কোনো সমস্যার কারণে, যেমন এন্ডোমেট্রিওসিস, ফাইব্রয়েড বা শ্রোণি অঞ্চলের সংক্রমণ। এ ধরনের ব্যথা অনেক সময় বেশি বয়সে শুরু হয়, ধীরে ধীরে বাড়ে এবং মাসিকের আগে-পরেও থাকে। এর জন্য চিকিৎসা দরকার।
পিরিয়ডের ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
১. গরম সেঁক: গরম পানির ব্যাগ, গরম পানি ভরা বোতল তোয়ালে পেঁচিয়ে বা ইস্ত্রি করা গরম কাপড় তলপেটে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রাখুন। গরমে পেশি শিথিল হয়, ব্যথা কমে। ত্বক যেন না পোড়ে, তাই সরাসরি খুব গরম কিছু চামড়ায় লাগাবেন না এবং সেঁক দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন না।
২. গরম পানিতে গোসল: কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে পুরো শরীর আরাম পায়, কোমরের টানও কমে।
বিজ্ঞাপন
৩. হালকা ম্যাসাজ: তলপেট ও কোমরে হাতের তালু দিয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে আলতো করে ম্যাসাজ করুন। চাইলে সামান্য সরিষা বা নারকেল তেল নিতে পারেন।
৪. আরামদায়ক ভঙ্গিতে বিশ্রাম: পাশ ফিরে হাঁটু ভাঁজ করে শুলে, অথবা চিত হয়ে শুয়ে হাঁটুর নিচে বালিশ দিলে তলপেটের চাপ কমে।
৫. গরম পানীয়: আদা চা, হালকা লাল চা বা কুসুম গরম পানি খেলে অনেকে আরাম পান। আদা নিয়ে কিছু গবেষণায় ব্যথা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে এটি ওষুধের বিকল্প নয়।
৬. পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুম কম হলে ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাও কমে। মাসিকের দিনগুলোতে রাতে আগে আগে ঘুমাতে যান।
বিজ্ঞাপন
মাসিকের সময় কী খাবেন, কী এড়াবেন
এই সময়ে অনেকের খিদে কমে যায়, আবার কারও মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাওয়ার ঝোঁক বাড়ে। শরীরের জন্য যা ভালো:
খাবেন: শাকসবজি, ডাল, ডিম, মাছ, মুরগি, ফল আর পর্যাপ্ত পানি। কলা, পেঁপে, কমলা আর দই সহজে হজম হয়। মাসিকে রক্ত যায় বলে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন কচুশাক, লালশাক, কলিজা, ডিম আর ডাল রাখুন। কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে আঁশযুক্ত খাবার আর পানি বাড়ান, এতে তলপেটের চাপও কমে।
এড়াবেন বা কমাবেন: অতিরিক্ত লবণ, চিপস ও প্যাকেটজাত খাবার, যা পেট ফাঁপা বাড়ায়। বেশি চা-কফি আর কোমল পানীয়ও কমান। ধূমপান মাসিকের ব্যথা বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঠান্ডা পানি বা টক খেলে মাসিকের ব্যথা বাড়ে, এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। যা খেলে আপনার শরীর আরাম পায়, পরিমিতভাবে তা খেতে পারেন।
হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং
ব্যথার সময় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করলেও হালকা নড়াচড়া উপকারী। ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধীর গতিতে হাঁটলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, পেশির টান কমে।
কয়েকটি সহজ স্ট্রেচ ঘরেই করা যায়। হাঁটু গেড়ে বসে সামনে ঝুঁকে কপাল মাটিতে রাখুন, হাত সামনে ছড়িয়ে দিন, এভাবে কয়েকটি গভীর শ্বাস নিন। চিত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু বুকের কাছে টেনে আনুন, আধা মিনিট ধরে রাখুন। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে পিঠ একবার ওপরের দিকে বাঁকা করুন, আরেকবার নিচের দিকে নামান। কোনো ভঙ্গিতে ব্যথা বাড়লে তা বন্ধ করুন।
বিজ্ঞাপন
সারা মাস নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস থাকলে অনেকের মাসিকের ব্যথাও তুলনামূলক কম হয়।
ব্যথানাশক ও পরিচ্ছন্নতা
ঘরোয়া উপায়ে না কমলে ফার্মেসিতে পাওয়া সাধারণ ব্যথানাশক কাজে আসে। তবে কোনটি, কতটুকু খাবেন, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছে জেনে নিন। গ্যাস্ট্রিক, হাঁপানি, কিডনির সমস্যা থাকলে কিছু ব্যথানাশক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খালি পেটে ব্যথানাশক না খাওয়াই ভালো।
মাসিকের সময় প্যাড চার থেকে ছয় ঘণ্টা পরপর বা প্রয়োজনে তার আগেই বদলান। কাপড় ব্যবহার করলে সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে ভালো করে শুকিয়ে নিন। অপরিচ্ছন্নতা থেকে সংক্রমণ হলে তলপেটের ব্যথা আরও বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
১. ব্যথার কারণে প্রতি মাসে স্কুল, কাজ বা দৈনন্দিন জীবন বন্ধ হয়ে যায়।
২. ব্যথা আগের চেয়ে ধীরে ধীরে বাড়ছে, অথবা ২৫ বছরের পর হঠাৎ নতুন করে শুরু হয়েছে।
৩. এত রক্ত যায় যে এক-দুই ঘণ্টা পরপর প্যাড ভিজে যায়, বড় বড় রক্তের চাকা যায়, অথবা মাসিক সাত দিনের বেশি চলে।
বিজ্ঞাপন
৪. মাসিকের বাইরেও তলপেটে ব্যথা থাকে, সহবাসে ব্যথা হয় বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যায়।
৫. ব্যথার সঙ্গে জ্বর, তীব্র বমি বা মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
৬. পিরিয়ড পিছিয়ে গিয়ে তলপেটে তীব্র ব্যথা হয়; এটি গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতার লক্ষণ হতে পারে, দ্রুত হাসপাতালে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মাসিকের ব্যথা কি বিয়ের পর ভালো হয়ে যায়?
বিয়ের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই। বয়স বাড়লে বা সন্তান জন্মের পর অনেকের ব্যথা কমে, তবে সবার নয়। কষ্ট বেশি হলে বিয়ের অপেক্ষা না করে চিকিৎসা নিন।
প্রতি মাসে ব্যথানাশক খাওয়া কি ক্ষতিকর?
চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট মাত্রায় মাসিকের দুই-এক দিন খাওয়া সাধারণত নিরাপদ ধরা হয়। তবে প্রতি মাসে বেশি বেশি লাগলে কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের কাছে যান।
বিজ্ঞাপন
মাসিকের সময় গোসল বা ব্যায়াম করা যাবে কি?
হ্যাঁ। গোসল পরিচ্ছন্নতা আর আরামের জন্য ভালো। হালকা ব্যায়াম ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
কিশোরী মেয়ের তীব্র ব্যথা হলে কী করব?
ঘরোয়া উপায়গুলো চেষ্টা করুন, তাকে বিশ্রাম নিতে দিন। ব্যথায় স্কুল কামাই হলে বা বমি-অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে স্ত্রীরোগ বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বিজ্ঞাপন
মেয়েকে আগে থেকেই মাসিক সম্পর্কে সহজ ভাষায় জানিয়ে রাখুন, স্কুলব্যাগে একটি বাড়তি প্যাড আর ছোট পানির বোতল রাখার অভ্যাস করান। ব্যথা নিয়ে লজ্জা না পেয়ে মা, বড় বোন বা শিক্ষিকাকে জানাতে উৎসাহ দিন। এতে সমস্যা গুরুতর হলে তা সময়মতো ধরা পড়ে।
মাসিকের ব্যথা কমাতে কোন ব্যায়াম সবচেয়ে ভালো?
নির্দিষ্ট কোনো একটি ব্যায়াম নেই। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, হালকা যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং, যেটি নিয়মিত করতে পারবেন, সেটিই ভালো। মাসিকের দিনগুলোতে ভারী ব্যায়ামের বদলে হালকা নড়াচড়া বেছে নিন।