ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দৃষ্টি হারানো আরাফাতুল এখন জাতীয় দলের খেলোয়াড়
বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠেয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী
খেলা ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ক্রিকেট খেলতে গিয়ে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো আরাফাতুল ইসলাম (২৫) দমে যাননি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটলেও তিনি ক্রিকেট ছাড়েননি, বরং এখন খেলছেন ‘ব্লাইন্ড ক্রিকেট’-এর জাতীয় দলে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আগামী ১৪ থেকে ২০ নভেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এশিয়া কাপের জন্য ঘোষিত বাংলাদেশ দলের ১৭ সদস্যের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন তিনি। অলরাউন্ডার হিসেবে আসন্ন এই প্রতিযোগিতায় তাঁর খেলার কথা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরাফাতুলের এই দীর্ঘ যাত্রা সহজ ছিল না। ২০১১ সালের ২৮ মে ফটিকছড়ির জাফতনগর লতিফ রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী থাকাকালীন স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে চোখে বলের আঘাত পান তিনি। এতে তাঁর দুই চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়। সে সময় চট্টগ্রাম ও ঢাকায় চিকিৎসার পাশাপাশি ভারতের চেন্নাইয়েও যেতে হয়েছিল তাঁকে। প্রায় এক বছর ধরে ছয় দফা অস্ত্রোপচার করেও শেষ পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি তিনি।
নিজের চোখ হারানোর স্মৃতিচারণ করে আরাফাতুল বলেন, ‘ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বাম চোখের ওপরের দিকে বলের আঘাত লাগে আমার। এতে দুই চোখের রেটিনা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর এক বছর ধরে ছয় দফায় অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নেওয়া হয়। চিকিৎসার পর কিছুটা দেখতে পেতাম। তবে পড়তে পারার মতো দেখতাম না। এসএসসির পর পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলি।’
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও পড়াশোনা থামিয়ে দেননি তিনি। ২০১২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়তে শেখেন। পরে নবম শ্রেণি থেকে নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষাক্রমে পড়াশোনা চালিয়ে যান। বন্ধুদের সহযোগিতা ও প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শুনে পড়তেন তিনি। পিএসসি থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পার করে সম্প্রতি স্নাতকোত্তরের পরীক্ষাও দিয়েছেন। স্নাতকে তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩ এবং স্নাতকোত্তরের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে আবার ক্রিকেট খেলা শুরু করেন আরাফাতুল। ২০১২ সালে চট্টগ্রামের একটি ক্রিকেট ক্লাবের অনুশীলনে ভালো করার পর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পান। ২০১৪ সালের দিকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় জাতীয় লিগেও খেলেন। ২০১৭ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও এইচএসসি পরীক্ষার কারণে অনুশীলনে অংশ নিতে পারেননি। ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার কারণেও একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়। অবশেষে ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারতের ভোপালে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সিরিজে জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক হয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর ২০২২ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলেন তিনি, যেখানে বাংলাদেশ রানার্সআপ হয়। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসেও বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন আরাফাতুল, যেখানে বাংলাদেশ ব্রোঞ্জপদক অর্জন করে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষেও জয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। জাতীয় পর্যায়ের চারটি লিগের মধ্যে তাঁর দল তিনটিতে চ্যাম্পিয়ন ও একটিতে রানার্সআপ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্লাইন্ড ক্রিকেট কাউন্সিলের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ তাইজ উদ্দিন বলেন, ‘আরাফাতুল প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম থেকে আমাদের হয়ে খেলছেন। মাঝখানে কিছুদিন বিরতি ছিল। এবার এশিয়া কাপের জন্য বাংলাদেশ দল গঠনের সময় দুই ধাপের ট্রায়াল পেরিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তিনি দলে জায়গা করে নিয়েছেন। সে অলরাউন্ডার হিসেবে খেলবেন। আরাফাতুল ভালো ছেলে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ক্রিকেটও চালিয়ে যাচ্ছেন।’
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের দৃষ্টিশক্তির মাত্রা অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ করা হয়। আরাফাতুল বি-১ শ্রেণির খেলোয়াড়, অর্থাৎ তিনি চোখে একবারেই দেখতে পান না। তিনি জানান, ‘আমাদের খেলার মূল পার্থক্য বলের শব্দে। বলের মধ্যে এমন ব্যবস্থা আছে, যাতে সেটি চলার সময় শব্দ হয়। সেই শব্দ শুনে ব্যাটসম্যান বলের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন।’ বোলিংয়ের সময়ও বিশেষ নিয়ম মেনে বল বাউন্স করাতে হয়।
বর্তমানে আরাফাতুল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজঅ্যাবল স্টুডেন্ট সোসাইটির সভাপতি এবং চট্টগ্রামের ডিজেবল স্পোর্টিং ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। অনেকে জানেন না, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীও পড়াশোনা করতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেন। আমাদেরও কাজ করার যোগ্যতা আছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা অনেক কাজই করতে পারি। তবে সেটা প্রমাণের সুযোগ আমাদের দেওয়া হয় না।’ এশিয়া কাপে ভালো খেলার পাশাপাশি দলকে চ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।