আজানের দোয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: আজানের জবাব দেওয়ার নিয়ম
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
দিনে পাঁচবার মসজিদের মাইক থেকে আজান ভেসে আসে। অনেকে তখন কথা থামিয়ে চুপ করে থাকেন, কেউ আবার কাজ চালিয়ে যান। অথচ আজান শোনার সময়টুকুর জন্যও হাদিসে সুন্দর একটি আমল আছে: আজানের জবাব দেওয়া এবং আজান শেষে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া।
বিজ্ঞাপন
নিয়মটি সংক্ষেপে এমন। মুয়াজ্জিন প্রতিটি বাক্য বলার পর আপনিও নিচু স্বরে একই বাক্য বলবেন। তবে "হাইয়া আলাস সালাহ" ও "হাইয়া আলাল ফালাহ" শুনে বলবেন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"। আজান শেষ হলে দরুদ পড়বেন, তারপর আজানের দোয়া। সহিহ বুখারিতে আছে, যে এই দোয়া পড়বে, কিয়ামতের দিন তার জন্য মহানবী (সা.)-এর শাফাআত অবধারিত হয়ে যাবে।
আজানের বাক্যগুলোর অর্থ
জবাব দেওয়ার আগে আজানের শব্দগুলোর অর্থ জানা থাকলে মনোযোগ অনেক বেড়ে যায়। সাধারণ আজানে ছয়টি ভিন্ন বাক্য আছে, ফজরের আজানে যুক্ত হয় আরও একটি।
"আল্লাহু আকবার" মানে আল্লাহ সবচেয়ে বড়। আজানের শুরুতে চারবার এবং শেষে দুবার বলা হয়। "আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ" অর্থ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। এই দুটি বাক্য দুবার করে বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর আসে আহ্বান: "হাইয়া আলাস সালাহ", নামাজের দিকে এসো; "হাইয়া আলাল ফালাহ", সফলতার দিকে এসো। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, এখানে নামাজকেই সফলতা বলা হয়েছে। শেষে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, একবার।
আহ্বানের বাক্যের জবাবে কেন হুবহু একই কথা না বলে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" বলতে হয়, আলেমরা তার সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ডাক শুনে বান্দা স্বীকার করছে, আমি আসতে চাই, কিন্তু আল্লাহর দেওয়া শক্তি ছাড়া আমার নামাজে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও নেই।
আজানের জবাব দেওয়ার নিয়ম
সহিহ মুসলিমে হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আজানের জবাবের পদ্ধতি বিস্তারিত এসেছে। সেই অনুযায়ী:
বিজ্ঞাপন
১. আল্লাহু আকবার: মুয়াজ্জিন যতবার বলবেন, আপনিও ততবার "আল্লাহু আকবার" বলবেন।
২. আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: আপনিও একই বাক্য বলবেন।
৩. আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ: একই বাক্য বলবেন।
৪. হাইয়া আলাস সালাহ: এখানে বলবেন "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ", অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
বিজ্ঞাপন
৫. হাইয়া আলাল ফালাহ: এখানেও "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"।
৬. শেষ তাকবির ও কালিমা: "আল্লাহু আকবার" ও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" মুয়াজ্জিনের সঙ্গে বলবেন।
হাদিসটির শেষে বলা হয়েছে, যে অন্তর থেকে এভাবে জবাব দেবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
ফজরের আজানে অতিরিক্ত বাক্য আছে: "আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম", অর্থাৎ ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম। এর জবাবে হানাফি ফিকহের কিতাবে "সাদাকতা ওয়া বারারতা" (আপনি সত্য বলেছেন ও কল্যাণের কথা বলেছেন) বলার কথা উল্লেখ আছে। কোনো কোনো আলেম বলেন, একই বাক্য পুনরাবৃত্তি করলেও চলবে।
বিজ্ঞাপন
আজানের পর দোয়া: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
আজানের জবাব শেষ হলে প্রথমে দরুদ পড়ুন। সহিহ মুসলিমে আছে, তোমরা মুয়াজ্জিনকে যা বলতে শোনো তা-ই বলো, তারপর আমার ওপর দরুদ পড়ো, এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ওসিলা প্রার্থনা করো। দরুদ হিসেবে নামাজের দরুদে ইবরাহিম পড়া সবচেয়ে ভালো।
এরপর সহিহ বুখারিতে হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত দোয়াটি পড়ুন:
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বা হাজিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কায়িমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ, ওয়াবআসহু মাকামাম মাহমুদানিল্লাজি ওয়াআদতাহ।
অর্থ: হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া নামাজের রব, মুহাম্মাদ (সা.)-কে ওসিলা ও শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করো এবং তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দাও, যার প্রতিশ্রুতি তুমি তাঁকে দিয়েছ।
দোয়ার শব্দগুলোর তাৎপর্য
আদ-দাওয়াতুত তাম্মাহ: পরিপূর্ণ আহ্বান, অর্থাৎ আজান। এতে তাওহিদ ও রিসালাতের পূর্ণ ঘোষণা আছে, তাই একে পরিপূর্ণ বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আস-সালাতুল কায়িমাহ: যে নামাজ এখনই কায়েম হতে যাচ্ছে।
আল-ওয়াসিলাহ: সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী এটি জান্নাতের একটি বিশেষ মর্যাদার স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল একজনের জন্য উপযুক্ত। মহানবী (সা.) আশা প্রকাশ করেছেন, তিনিই হবেন সেই ব্যক্তি।
মাকামে মাহমুদ: প্রশংসিত স্থান। সূরা বনি ইসরাইলের ৭৯ নম্বর আয়াতে এর প্রতিশ্রুতি এসেছে। তাফসিরকারকদের বড় অংশের মতে, এটি কিয়ামতের দিনের মহা শাফাআতের মর্যাদা।
প্রচলিত কিছু বইয়ে এই দোয়ার সঙ্গে আরও কিছু বাক্য যোগ করা দেখা যায়। বুখারির বর্ণনায় দোয়াটি এতটুকুই। বাড়তি অংশগুলোর মধ্যে কোনোটি অন্য গ্রন্থে এসেছে, কোনোটির সূত্র নিয়ে আলেমদের আপত্তি আছে। তাই বুখারির শব্দগুলো মুখস্থ রাখাই নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
আজানের সময় আরেকটি আমল
সহিহ মুসলিমে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মুয়াজ্জিনের শাহাদাতের বাক্য শুনে যে বলবে:
وَأَنَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا
উচ্চারণ: ওয়া আনা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু, রাদিতু বিল্লাহি রাব্বাও ওয়া বিমুহাম্মাদিন রাসুলাও ওয়া বিল ইসলামি দিনা।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই, আর মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল। আমি আল্লাহকে রব, মুহাম্মাদ (সা.)-কে রাসুল এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।
হাদিসে বলা হয়েছে, এতে তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।
কখন জবাব দেবেন, কখন দেবেন না
আজানের জবাব দেওয়া হানাফি মাজহাবে মুস্তাহাব, কোনো কোনো আলেমের মতে মুখে জবাব দেওয়া ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ। নারী-পুরুষ সবাই জবাব দেবেন।
বিজ্ঞাপন
তবে নামাজরত অবস্থায়, টয়লেটে, স্ত্রী-সহবাসের সময় এবং খুতবা চলাকালে মুখে জবাব দেবেন না। কোরআন তিলাওয়াত করতে থাকলে তিলাওয়াত থামিয়ে জবাব দেওয়া উত্তম, পরে আবার তিলাওয়াত শুরু করবেন। একাধিক মসজিদ থেকে আজান এলে প্রথম যে আজানটি শুনবেন, সেটির জবাব দেওয়াই যথেষ্ট।
শিশুদের আজানের জবাব শেখানোর সহজ উপায় হলো, আজান শুরু হলে টিভি বা গান বন্ধ করে তাদের পাশে বসে নিজে নিচু স্বরে জবাব দেওয়া। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা অনুকরণ করে শিখে ফেলে। আজান ও ইকামতের মাঝের সময়টিও দোয়ার জন্য বিশেষ। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, এই সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তাই আজানের দোয়া শেষ করে নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহকে বলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আজানের দোয়া পড়ার সময় হাত তুলতে হয়?
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সুন্নাহ বর্ণিত হয়নি। হাত না তুলে স্বাভাবিকভাবে পড়াই প্রচলিত।
টিভি বা মোবাইলে আজান শুনলে কি জবাব দিতে হবে?
সরাসরি সম্প্রচারিত আজানের ক্ষেত্রে অনেক আলেম জবাব দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। রেকর্ড করা আজানের জবাব দেওয়া জরুরি নয় বলে বেশির ভাগ আলেম মনে করেন।
ইকামতের জবাব কীভাবে দেব?
বিজ্ঞাপন
ইকামতের জবাবও আজানের মতো দেওয়া যায়। "কাদ কামাতিস সালাহ" শুনে "আকামাহাল্লাহু ওয়া আদামাহা" বলার কথা আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে, যার সনদ দুর্বল বলে মুহাদ্দিসরা উল্লেখ করেছেন।
ঋতুমতী নারী কি আজানের জবাব দিতে পারবেন?
হ্যাঁ। আজানের জবাব ও দোয়া জিকিরের অন্তর্ভুক্ত, এতে কোনো বাধা নেই।