ফোন ফ্লাশ কি, কখন দরকার এবং করার আগে যে সতর্কতা জরুরি
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে প্রায়ই শোনা যায়, "ফোনটা ফ্লাশ দিতে হবে।" অনেকে ভাবেন এটা বুঝি ফোন পরিষ্কার করা বা রিসেট দেওয়ার মতোই কিছু। আসলে ব্যাপারটা আরও গভীর।
বিজ্ঞাপন
ফোন ফ্লাশ মানে মোবাইলের ভেতরের মূল সফটওয়্যার, যাকে ফার্মওয়্যার বা রম বলা হয়, সেটি মুছে নতুন করে বসানো। ধরুন ফোনের অপারেটিং সিস্টেম একটা বাড়ির ভিত। ফ্যাক্টরি রিসেটে বাড়ির আসবাব সরিয়ে ঘর খালি করা হয়, কিন্তু ভিত একই থাকে। আর ফ্লাশে সেই ভিতটাই নতুন করে ঢালা হয়। সাধারণত কম্পিউটারের সঙ্গে ফোন যুক্ত করে নির্দিষ্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে ফোনের মডেল অনুযায়ী ফার্মওয়্যার ফাইল বসানো হয়।
কাজটি শক্তিশালী সমাধান, কিন্তু ঝুঁকিও বেশি। ভুল ফাইল বসালে বা মাঝপথে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফোন পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে। তাই ফ্লাশ কখন দরকার, কখন নয় এবং কার হাতে করাবেন, এটুকু জানা থাকা জরুরি।
ফ্লাশ আর ফ্যাক্টরি রিসেটের পার্থক্য
দুটি শব্দ প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। পার্থক্যটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
বিজ্ঞাপন
ফ্যাক্টরি রিসেট ফোনের সেটিংস থেকেই করা যায়। এতে আপনার অ্যাপ, ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য মুছে যায়, কিন্তু অপারেটিং সিস্টেম যেমন ছিল তেমনই থাকে। ফোন চালু থাকলে এবং মূল সফটওয়্যার সুস্থ থাকলে বেশির ভাগ সমস্যা রিসেটেই মেটে।
ফ্লাশ করা হয় যখন সমস্যা অপারেটিং সিস্টেমের ভেতরেই। এখানে পুরো সিস্টেম নতুন করে লেখা হয়। সাধারণত কম্পিউটার, ডেটা ক্যাবল, ফোনের মডেলের উপযোগী ফার্মওয়্যার ফাইল এবং বিশেষ সফটওয়্যার লাগে। ফ্লাশেও ফোনের সব ব্যক্তিগত ডেটা মুছে যায়।
সহজ নিয়ম: আগে রিসেট, তাতে কাজ না হলে তবেই ফ্লাশের কথা ভাবুন।
ফোন যদি চালুই না হয়, তবু সরাসরি ফ্লাশে যাওয়ার আগে একটি মাঝামাঝি ধাপ আছে। বেশির ভাগ অ্যান্ড্রয়েড ফোনে নির্দিষ্ট বোতাম একসঙ্গে চেপে রিকভারি মোডে ঢোকা যায়, যেখান থেকে ডেটা মুছে ফোন রিসেট করার অপশন থাকে। বোতামের সমন্বয় মডেলভেদে আলাদা, তাই ফোন কোম্পানির অফিশিয়াল সহায়তা পাতায় নিজের মডেলের নির্দেশনা দেখে নেওয়া ভালো। এই ধাপে সমাধান হলে ফ্লাশের ঝুঁকি নেওয়ার দরকার পড়ে না।
বিজ্ঞাপন
কখন ফ্লাশ দরকার হয়
১. বুটলুপ: ফোন চালু হতে গিয়ে লোগোতে আটকে থাকে বা বারবার রিস্টার্ট হয়, কখনো হোম স্ক্রিন পর্যন্ত পৌঁছায় না।
২. ব্যর্থ আপডেট: সফটওয়্যার আপডেটের সময় ব্যাটারি শেষ হয়ে বা অন্য কারণে আপডেট মাঝপথে থেমে গেলে সিস্টেম নষ্ট হতে পারে।
৩. রিসেটেও সমাধান নেই: ফ্যাক্টরি রিসেটের পরও ফোন অস্বাভাবিক আচরণ করে, অ্যাপ বারবার বন্ধ হয়, সিস্টেমের ত্রুটির বার্তা দেখায়।
বিজ্ঞাপন
৪. গুরুতর সফটওয়্যার সংক্রমণ: কিছু ক্ষতিকর সফটওয়্যার সিস্টেমের গভীরে ঢুকে যায়, যা রিসেটেও যায় না।
৫. পরিবর্তিত সফটওয়্যার থেকে মূলে ফেরা: কেউ আগে অনানুষ্ঠানিক রম বসিয়ে থাকলে কোম্পানির মূল সফটওয়্যারে ফিরতে ফ্লাশ লাগে।
কিন্তু ভাঙা পর্দা, নষ্ট ব্যাটারি, পানিতে পড়ে যাওয়া বোর্ড বা চার্জিং পোর্টের সমস্যা ফ্লাশে ঠিক হয় না। এসব হার্ডওয়্যারের সমস্যা। অনেক দোকানে সমস্যা না বুঝেই ফ্লাশের পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে খরচ বাড়ে কিন্তু সমাধান আসে না।
ফ্লাশ করার আগে জরুরি সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
১. ব্যাকআপ: ফোন যদি কোনোভাবে চালু হয়, আগে ছবি, কন্টাক্ট ও জরুরি ফাইল কম্পিউটার বা ক্লাউডে সরিয়ে নিন। ফ্লাশের পর এগুলো ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব।
২. সঠিক ফার্মওয়্যার: প্রতিটি মডেল, এমনকি একই মডেলের ভিন্ন অঞ্চলের সংস্করণের জন্যও আলাদা ফাইল হয়। ভুল ফাইল বসালে ফোন চিরতরে অচল হতে পারে, যাকে সাধারণ ভাষায় "ডেড" হয়ে যাওয়া বলে।
৩. নির্ভরযোগ্য উৎস: অজানা ওয়েবসাইট থেকে নামানো ফার্মওয়্যারে ক্ষতিকর কোড থাকতে পারে। কোম্পানির অফিশিয়াল সফটওয়্যার বা অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের ফাইলই নিরাপদ।
৪. পর্যাপ্ত চার্জ ও বিদ্যুৎ: ফোনে যথেষ্ট চার্জ রাখুন এবং কম্পিউটারের বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করুন। মাঝপথে ক্যাবল খুলে যাওয়া বা বিদ্যুৎ চলে যাওয়া সবচেয়ে বড় বিপদ।
বিজ্ঞাপন
৫. অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড: ফ্লাশের পর ফোন চালু করতে আগের গুগল অ্যাকাউন্ট বা অ্যাপল আইডির তথ্য লাগতে পারে। এটি চুরি ঠেকানোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পাসওয়ার্ড জানা না থাকলে আগে অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করে নিন।
৬. ওয়ারেন্টি: অনেক কোম্পানি অনুমোদনহীন জায়গায় সফটওয়্যার বদলালে ওয়ারেন্টি বাতিল করে দেয়। ওয়ারেন্টিতে থাকা ফোন হলে আগে কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে যান।
নিজে করবেন নাকি সার্ভিস সেন্টারে যাবেন
ইন্টারনেটে "মোবাইল ফ্লাশ দেওয়ার নিয়ম" লিখে খুঁজলে নানা ভিডিও আর সফটওয়্যারের সন্ধান মেলে। কিন্তু অভিজ্ঞতা ছাড়া নিজে করলে লাভের চেয়ে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি। একটি ভুল ধাপে কয়েক হাজার টাকার ফোন অকেজো হয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো ফোন কোম্পানির অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার। তাদের কাছে মডেল-নির্দিষ্ট আসল ফার্মওয়্যার থাকে, আর ওয়ারেন্টির ক্ষেত্রেও সমস্যা হয় না। ওয়ারেন্টি শেষ হলে স্থানীয় দোকানে করাতে পারেন, তবে পরিচিত ও অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান বেছে নিন। কাজ শুরুর আগে খরচ এবং ফোন অচল হলে দায় কার, তা পরিষ্কার করে নিন।
একটা কথা বিশেষভাবে মনে রাখুন: কেউ যদি বলে "অ্যাকাউন্ট লক বা আইএমইআই বদলে দেব", সেটি থেকে দূরে থাকুন। এ ধরনের কাজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাঙার শামিল এবং আপনাকে আইনি ঝামেলায় ফেলতে পারে। চুরি হওয়া ফোনই সাধারণত এভাবে চালু করা হয়।
ফ্লাশের পর যা খেয়াল রাখবেন
ফ্লাশ শেষে ফোন প্রথমবার চালু হতে কিছুটা বেশি সময় নেয়। এটি স্বাভাবিক। চালু হলে সেটিংসের "অ্যাবাউট ফোন" অংশে মডেল ও সফটওয়্যার সংস্করণ মিলিয়ে দেখুন। *#০৬# ডায়াল করে আইএমইআই নম্বর দেখুন এবং ফোনের বাক্স বা পেছনে লেখা নম্বরের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
এরপর কল, এসএমএস, ওয়াইফাই, মোবাইল ডেটা, ক্যামেরা ও চার্জিং ঠিকমতো কাজ করছে কি না পরীক্ষা করুন। সিস্টেম আপডেট এলে তা নামিয়ে নিন, তবে ব্যাটারিতে যথেষ্ট চার্জ রেখে এবং ভালো ইন্টারনেট সংযোগে। দোকান থেকে নিলে এসব পরীক্ষা সেখানেই সেরে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফ্লাশ করলে কি ফোনের সব তথ্য মুছে যায়?
হ্যাঁ, ফোনের ভেতরের মেমোরির প্রায় সব তথ্য মুছে যায়। মেমোরি কার্ডের ফাইল সাধারণত থাকে, তবে নিরাপদ থাকতে কার্ড খুলে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ফ্লাশ করলে কি ফোন দ্রুত হয়?
সফটওয়্যারের কারণে ফোন ধীর হলে উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিন্তু পুরোনো প্রসেসর বা কম র্যামের কারণে ধীর হলে ফ্লাশে বড় পরিবর্তন আসে না।
আইফোন কি ফ্লাশ করা যায়?
আইফোনে প্রচলিত অর্থে ফ্লাশ নয়, বরং কম্পিউটারের মাধ্যমে অ্যাপলের নিজস্ব পদ্ধতিতে সিস্টেম পুনরুদ্ধার বা রিস্টোর করা হয়। সমস্যা হলে অ্যাপলের অনুমোদিত সার্ভিস প্রোভাইডারের সাহায্য নেওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
ফ্লাশে খরচ কত?
খরচ ফোনের মডেল, সমস্যার ধরন ও এলাকাভেদে আলাদা। অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে ওয়ারেন্টির মধ্যে অনেক সময় বিনা খরচে হয়। দোকানে করালে কাজের আগে দাম ঠিক করে নিন।
সফটওয়্যার আপডেট আর ফ্লাশ কি একই?
না। সফটওয়্যার আপডেট কোম্পানি নিজে পাঠায় এবং ফোনের সেটিংস থেকে নিরাপদে নেওয়া যায়, এতে সাধারণত আপনার তথ্য মোছে না। ফ্লাশ হলো পুরো সিস্টেম মুছে নতুন করে বসানো, যা সমস্যার সময় শেষ উপায় হিসেবে করা হয়। তাই ফোন সুস্থ রাখতে নিয়মিত অফিশিয়াল আপডেট নেওয়াই যথেষ্ট।