মোবাইল ফ্যাক্টরি রিসেট করার নিয়ম: আগে ব্যাকআপ, তারপর রিসেট
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ফ্যাক্টরি রিসেট মানে ফোনকে সেই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া, যে অবস্থায় এটি প্রথম বাক্স থেকে বের হয়েছিল। আপনার ইনস্টল করা অ্যাপ, ছবি, ভিডিও, মেসেজ, কন্টাক্ট, সেটিংস, সব মুছে যায়। থেকে যায় শুধু ফোনের অপারেটিং সিস্টেম আর কোম্পানির দেওয়া অ্যাপগুলো। লোকমুখে একে কেউ বলেন ফোন রিসেট মারা, কেউ বলেন মোবাইল ফরমেট দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
কাজটি সহজ, কয়েকটি চাপেই হয়ে যায়। কঠিন অংশ হলো আগের প্রস্তুতি। ব্যাকআপ না নিয়ে রিসেট করলে বছরের পর বছর জমানো ছবি আর জরুরি নম্বর চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। আবার ফোনে যুক্ত অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে রিসেটের পর ফোনটিই আর চালু করতে পারবেন না। তাই এই লেখার মূল কথা একটাই: আগে ব্যাকআপ, তারপর রিসেট।
নিচে প্রথমে দেখে নিন কখন রিসেট করা উচিত, তারপর ব্যাকআপের তালিকা, এরপর অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে রিসেটের ধাপ।
কখন ফ্যাক্টরি রিসেট দরকার
ফ্যাক্টরি রিসেট শেষ উপায়, প্রথম নয়। ফোন একটু ধীর হলেই রিসেট করে ফেলার দরকার নেই। তবে নিচের পরিস্থিতিগুলোতে এটি কার্যকর।
বিজ্ঞাপন
১. ফোন বিক্রি বা কাউকে দেওয়ার আগে: আপনার ব্যক্তিগত তথ্য যাতে নতুন মালিকের হাতে না যায়, সে জন্য রিসেট বাধ্যতামূলক।
২. ফোন অস্বাভাবিক ধীর বা বারবার হ্যাং হলে: অ্যাপ মুছে, ক্যাশ পরিষ্কার করে, স্টোরেজ খালি করেও কাজ না হলে রিসেট অনেক সময় নতুন প্রাণ ফেরায়।
৩. সন্দেহজনক অ্যাপ বা ম্যালওয়্যার: অজানা বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠা, নিজে থেকে অ্যাপ ইনস্টল হওয়া, এমন উপসর্গে রিসেট কার্যকর সমাধান হতে পারে।
৪. বড় সফটওয়্যার আপডেটের পর গোলমাল: কিছু ক্ষেত্রে আপডেটের পর ব্যাটারি দ্রুত ফুরানো বা অ্যাপ ক্র্যাশের মতো সমস্যা রিসেটে ঠিক হয়।
বিজ্ঞাপন
তবে হার্ডওয়্যারের সমস্যা, যেমন ভাঙা পর্দা, দুর্বল ব্যাটারি বা নষ্ট চার্জিং পোর্ট, রিসেটে ঠিক হয় না।
রিসেটের আগে ছোট সমাধানগুলো একবার চেষ্টা করে দেখুন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ আনইনস্টল করা, বড় ভিডিও ফাইল সরিয়ে স্টোরেজ খালি করা, ফোন রিস্টার্ট দেওয়া এবং সিস্টেম আপডেট নেওয়া, এই চারটি কাজেই অনেক ফোন আবার স্বাভাবিক গতিতে ফেরে। এতে কাজ না হলে তবেই পুরো রিসেটের পথে যান।
রিসেটের আগে যা ব্যাকআপ নেবেন
১. ছবি ও ভিডিও: গুগল ফটোজে ব্যাকআপ চালু করে সব ছবি আপলোড হয়েছে কি না দেখে নিন। চাইলে কম্পিউটারে ক্যাবল দিয়ে কপি করে রাখতে পারেন। আইফোনে আইক্লাউড ফটোজ বা কম্পিউটারে কপি করার সুবিধা আছে।
বিজ্ঞাপন
২. কন্টাক্ট: কন্টাক্টগুলো ফোনের মেমোরিতে নয়, গুগল অ্যাকাউন্টে সেভ আছে কি না দেখুন। কন্টাক্টস অ্যাপে কোন অ্যাকাউন্টে নম্বর জমা হচ্ছে, তা সেটিংসে দেখা যায়।
৩. হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য চ্যাট: হোয়াটসঅ্যাপের সেটিংসে চ্যাট ব্যাকআপ থেকে নতুন ব্যাকআপ নিন। ইমো বা অন্য অ্যাপেও ব্যাকআপের সুবিধা থাকলে ব্যবহার করুন।
৪. ফাইল ও ডকুমেন্ট: ডাউনলোড ফোল্ডারের পিডিএফ, অফিসের কাগজ, পরীক্ষার প্রবেশপত্রের মতো ফাইল কম্পিউটার, পেনড্রাইভ বা ক্লাউডে রাখুন।
৫. অ্যাপের লগইন তথ্য: মোবাইল ব্যাংকিং, সামাজিক মাধ্যম ও ইমেইলের পাসওয়ার্ড বা পিন জানা আছে কি না নিশ্চিত হোন। রিসেটের পর আবার লগইন করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
৬. দুই ধাপের যাচাইয়ের অ্যাপ: কোনো অথেনটিকেটর অ্যাপ ব্যবহার করলে আগে তা নতুন করে সেটআপের ব্যবস্থা করুন, নইলে নিজের অ্যাকাউন্টেই ঢুকতে সমস্যা হতে পারে।
অ্যাকাউন্ট লকের বিষয়টি না জানলেই বিপদ
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। ফোনে গুগল অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকা অবস্থায় রিসেট করলে, পরে ফোন চালু করার সময় আগের অ্যাকাউন্টের ইমেইল ও পাসওয়ার্ড চাওয়া হতে পারে। চুরি হওয়া ফোন যাতে কেউ রিসেট করে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। আইফোনেও অ্যাপল আইডির মাধ্যমে একই ধরনের অ্যাক্টিভেশন লক থাকে।
তাই রিসেটের আগে নিশ্চিত হোন, ফোনে যুক্ত অ্যাকাউন্টের ইমেইল ও পাসওয়ার্ড আপনার জানা আছে। ফোন বিক্রি করলে রিসেটের আগে সেটিংসের অ্যাকাউন্ট অংশ থেকে নিজের অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দিন, আইফোনে "ফাইন্ড মাই" বন্ধ করে সাইন আউট করুন। নইলে নতুন মালিক ফোন চালু করতে পারবেন না।
বিজ্ঞাপন
অ্যান্ড্রয়েডে রিসেটের ধাপ
কোম্পানিভেদে মেনুর নাম আলাদা হয়। তবে সাধারণ পথ এমন।
১. চার্জ দিন: ফোনে অন্তত অর্ধেক চার্জ রাখুন। রিসেটের মাঝপথে ফোন বন্ধ হলে সমস্যা হতে পারে।
২. মেমোরি কার্ড ও সিম খুলে রাখুন: সাধারণত রিসেটে মেমোরি কার্ড মোছে না, তবে নিরাপদ থাকতে খুলে রাখা ভালো।
বিজ্ঞাপন
৩. সেটিংসে যান: বেশির ভাগ ফোনে "সিস্টেম" অংশে "রিসেট অপশনস" পাবেন। স্যামসাং ফোনে সাধারণত "জেনারেল ম্যানেজমেন্ট" অংশে "রিসেট" থাকে। খুঁজে না পেলে সেটিংসের সার্চ বক্সে "রিসেট" লিখুন।
৪. সব ডেটা মোছার অপশন: "ফ্যাক্টরি ডেটা রিসেট" বা "ইরেজ অল ডেটা" ধরনের অপশন বেছে নিন। শুধু নেটওয়ার্ক বা অ্যাপ সেটিংস রিসেটের অপশন আলাদা, সেগুলোতে ডেটা মোছে না।
৫. নিশ্চিত করুন: স্ক্রিন লকের পিন বা প্যাটার্ন দিয়ে নিশ্চিত করুন। ফোন কয়েক মিনিট সময় নিয়ে নিজে থেকে রিস্টার্ট হবে।
আইফোনে রিসেটের ধাপ
বিজ্ঞাপন
আইফোনে সেটিংস খুলে "জেনারেল" অংশে যান, সেখান থেকে "ট্রান্সফার অর রিসেট আইফোন" বেছে নিন। এরপর "ইরেজ অল কনটেন্ট অ্যান্ড সেটিংস" চাপুন। পাসকোড ও অ্যাপল আইডির পাসওয়ার্ড চাওয়া হতে পারে। আগে আইক্লাউড বা কম্পিউটারে ব্যাকআপ নিয়ে রাখলে নতুন করে চালুর সময় সব ফিরিয়ে আনা যায়। আইওএসের সংস্করণভেদে মেনুর লেখা কিছুটা আলাদা হতে পারে।
রিসেটের পর যা করবেন
ফোন চালু হলে ভাষা, ওয়াইফাই ও অ্যাকাউন্ট দিয়ে শুরু করুন। গুগল বা অ্যাপল অ্যাকাউন্টে ঢুকলে ব্যাকআপ থেকে কন্টাক্ট, অ্যাপ ও কিছু সেটিংস ফেরানোর সুযোগ আসে। তবে সব অ্যাপ একসঙ্গে ফেরাবেন না, শুধু প্রয়োজনীয়গুলো নিন। আগে যে অ্যাপগুলো ফোন ধীর করছিল, সেগুলো এবার বাদ দিন। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করে একই নম্বর দিয়ে চ্যাট ব্যাকআপ ফেরান এবং সব শেষে সিস্টেম আপডেট আছে কি না দেখে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ফ্যাক্টরি রিসেট করলে কি মেমোরি কার্ডের ছবি মুছে যায়?
সাধারণত না, ফোনের নিজস্ব মেমোরি মোছে। তবে কিছু ফোনে রিসেটের সময় মেমোরি কার্ড মোছার আলাদা অপশন থাকে। ঝুঁকি না নিতে রিসেটের আগে কার্ড খুলে রাখুন।
রিসেটের পর কি মুছে যাওয়া ডেটা ফেরত আনা যায়?
ব্যাকআপ না থাকলে সাধারণ উপায়ে ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই রিসেটের আগে ব্যাকআপ নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
ফোন চালু হচ্ছে না, রিসেট করব কীভাবে?
বেশির ভাগ অ্যান্ড্রয়েড ফোনে নির্দিষ্ট বোতাম চেপে রিকভারি মোডে ঢুকে রিসেট করা যায়, তবে বোতামের সমন্বয় মডেলভেদে আলাদা। নিশ্চিত না হলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যান।
রিসেট করলে কি ভাইরাস চলে যায়?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফোনের ভেতরে ইনস্টল হওয়া ক্ষতিকর অ্যাপ রিসেটে মুছে যায়। তবে ব্যাকআপ থেকে একই অ্যাপ ফেরালে সমস্যা ফিরে আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
কত দিন পরপর ফ্যাক্টরি রিসেট করা উচিত?
নিয়ম করে রিসেট করার দরকার নেই। ফোন স্বাভাবিকভাবে চললে রিসেটের প্রয়োজন পড়ে না। কেবল ফোন বিক্রি, গুরুতর গোলমাল বা নিরাপত্তার সন্দেহ থাকলেই এটি করুন। নিয়মিত অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরানো আর স্টোরেজ খালি রাখাই ফোন ভালো রাখার আসল উপায়।