সাইবার নিরাপত্তা কি এবং কেন প্রয়োজন: সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ঘরের দরজায় তালা দিই চোর ঠেকাতে। কিন্তু আমাদের টাকা, ছবি, কথাবার্তা আর পরিচয়ের বড় একটা অংশ এখন ঘরে নয়, থাকে মোবাইলে, ইমেইলে, সামাজিক মাধ্যমে আর মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে। এই অনলাইন ঘরের তালাই হলো সাইবার নিরাপত্তা।
বিজ্ঞাপন
সাইবার নিরাপত্তা হলো কম্পিউটার, স্মার্টফোন, নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার এবং এসবে থাকা তথ্যকে অননুমোদিত প্রবেশ, চুরি, ক্ষতি বা অপব্যবহার থেকে রক্ষা করার কৌশল, প্রযুক্তি ও অভ্যাসের সমষ্টি। ইংরেজিতে একে বলে সাইবার সিকিউরিটি। এর মধ্যে যেমন বড় প্রতিষ্ঠানের ফায়ারওয়াল ও নিরাপত্তা দল আছে, তেমনি আছে একজন সাধারণ মানুষের শক্ত পাসওয়ার্ড বা ফোনে আসা কোড কাউকে না বলার অভ্যাস।
অনেকে ভাবেন, আমার কাছে তো চুরি করার মতো কিছু নেই। কিন্তু একটি ফেসবুক আইডি হাতছাড়া হলে তা দিয়ে আত্মীয়দের কাছে টাকা চাওয়া হয়, একটি মোবাইল ব্যাংকিং পিন ফাঁস হলে মাসের সঞ্চয় উধাও হয়, আর ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস হলে সম্মানহানি ঘটে। তাই সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিবিদদের বিষয় নয়, প্রত্যেক ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন দায়িত্ব।
সাইবার নিরাপত্তার মূল তিন লক্ষ্য
তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় সাইবার নিরাপত্তার তিনটি মূল লক্ষ্য আছে। সহজ উদাহরণে বুঝে নেওয়া যাক।
বিজ্ঞাপন
১. গোপনীয়তা: যে তথ্য যাঁর দেখার অধিকার, শুধু তিনিই দেখবেন। আপনার মেসেজ শুধু আপনি আর প্রাপক পড়বেন, অন্য কেউ নয়।
২. অখণ্ডতা: তথ্য কেউ গোপনে বদলাতে পারবে না। আপনি দশ হাজার টাকা পাঠালে মাঝপথে তা এক লাখ হয়ে যাবে না, প্রাপকের নম্বরও বদলাবে না।
৩. প্রাপ্যতা: প্রয়োজনের সময় তথ্য ও সেবা ব্যবহার করা যাবে। ব্যাংকের ওয়েবসাইট আক্রমণে অচল হয়ে গেলে গ্রাহকেরা সেবা পান না, এটিও নিরাপত্তার ব্যর্থতা।
এই তিনটির যেকোনো একটি ভাঙলেই বুঝতে হবে নিরাপত্তায় ঘাটতি আছে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ মানুষ যে ঝুঁকিগুলোর মুখোমুখি
সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি কি, তা বুঝতে বড় বড় হ্যাকিংয়ের গল্প জানার দরকার নেই। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি যেসব ফাঁদে পড়েন, সেগুলোই আসল শিক্ষা।
১. ওটিপি ও পিন প্রতারণা: "আপনার একাউন্টে ভুল করে টাকা গেছে", "লটারিতে পুরস্কার জিতেছেন", "সরকারি ভাতা পাঠাব, কোডটি বলুন", এভাবে ফোন করে গোপন কোড হাতিয়ে নেওয়া হয়।
২. ফিশিং লিংক: আসল প্রতিষ্ঠানের মতো দেখতে ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক পাঠিয়ে পাসওয়ার্ড বা কার্ডের তথ্য নেওয়া হয়। "আপনার আইডি বন্ধ হয়ে যাবে, এখানে ক্লিক করে যাচাই করুন" ধরনের বার্তা এর পরিচিত রূপ।
বিজ্ঞাপন
৩. ক্ষতিকর অ্যাপ ও ফাইল: অফিশিয়াল স্টোরের বাইরে থেকে নামানো অ্যাপ বা মেসেঞ্জারে পাঠানো অজানা ফাইল ফোনের তথ্য চুরি করতে পারে।
৪. দুর্বল ও একই পাসওয়ার্ড: সব জায়গায় একই সহজ পাসওয়ার্ড থাকলে একটি সাইট থেকে ফাঁস হলেই বাকি সব একাউন্ট ঝুঁকিতে পড়ে।
৫. সামাজিক প্রকৌশল: প্রযুক্তি নয়, মানুষের বিশ্বাস ও ভয়কে কাজে লাগিয়ে তথ্য আদায়। পরিচিত কারও নাম নিয়ে বা কর্তৃপক্ষের পরিচয়ে ফোন করে চাপ দেওয়া এর উদাহরণ।
৬. খোলা ওয়াইফাই: রেস্তোরাঁ বা বাসস্ট্যান্ডের পাসওয়ার্ডহীন ওয়াইফাইতে ব্যাংকিং বা গুরুত্বপূর্ণ লগইন করলে তথ্য অন্যের হাতে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
৭. ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য দিয়ে হয়রানি: বিশেষ করে নারী ও কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানির শিকার হন।
কেন এখন এটি আগের চেয়ে বেশি জরুরি
গত কয়েক বছরে বেতন, ভাতা, কেনাকাটা, বিদ্যুৎ বিল, শিক্ষার্থীদের ফি, প্রায় সবকিছুই মোবাইল ও অনলাইনে চলে এসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন বা পাসপোর্টের আবেদনও এখন অনলাইনে। যত বেশি জীবন অনলাইনে, প্রতারকদের জন্য সুযোগও তত বেশি।
আরেকটি কারণ হলো, অনেক নতুন ব্যবহারকারী প্রথমবারের মতো স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। প্রযুক্তি তাঁদের হাতে এসেছে দ্রুত, কিন্তু নিরাপত্তার জ্ঞান সে গতিতে পৌঁছায়নি। প্রতারকেরা ঠিক এই ফাঁকটিকেই লক্ষ্য করে। পরিবারের বয়স্ক সদস্য ও শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন করা তাই এখন ঘরের দায়িত্বের অংশ।
বিজ্ঞাপন
প্রতিষ্ঠানের জন্যও ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতাল, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ছোট ব্যবসার কম্পিউটার আক্রান্ত হলে হাজারো মানুষের তথ্য ফাঁস হতে পারে। র্যানসমওয়্যার নামের এক ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার কম্পিউটারের ফাইল তালাবদ্ধ করে মুক্তিপণ দাবি করে। নিয়মিত ব্যাকআপ আর হালনাগাদ সফটওয়্যার এর বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিরক্ষা।
নিজেকে নিরাপদ রাখার দৈনন্দিন অভ্যাস
সাইবার নিরাপত্তার বেশির ভাগটাই আসলে অভ্যাস। দামি সফটওয়্যারের চেয়ে নিচের কাজগুলো বেশি কার্যকর।
১. কোড কাউকে নয়: পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড, কেউ চাইলেই বুঝবেন সে প্রতারক। কোনো ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তর এসব চায় না।
বিজ্ঞাপন
২. শক্ত ও আলাদা পাসওয়ার্ড: প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ একাউন্টে লম্বা ও আলাদা পাসওয়ার্ড রাখুন।
৩. দুই ধাপের যাচাই চালু করুন: ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু থাকলে পাসওয়ার্ড ফাঁস হলেও একাউন্ট সহজে দখল হয় না।
৪. আপডেট নিন: ফোন ও কম্পিউটারের সফটওয়্যার আপডেটে নিরাপত্তার ফাঁক বন্ধ করা হয়। আপডেট এলে দেরি করবেন না।
৫. অফিশিয়াল স্টোর থেকে অ্যাপ: প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোরের বাইরে থেকে অ্যাপ নামাবেন না, আর অ্যাপ কী কী অনুমতি চাইছে তা দেখুন।
বিজ্ঞাপন
৬. লিংকে ক্লিকের আগে থামুন: তাড়াহুড়ো, ভয় বা লোভ দেখানো বার্তার লিংকে ক্লিক না করে সরাসরি অফিশিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে গিয়ে যাচাই করুন।
৭. ব্যাকআপ রাখুন: জরুরি ছবি ও নথির কপি আলাদা জায়গায় রাখুন, যাতে ফোন হারালে বা নষ্ট হলে সব হারিয়ে না যায়।
প্রতারিত হলে কী করবেন
লজ্জা বা ভয়ে চুপ থাকবেন না, দ্রুত পদক্ষেপই ক্ষতি কমায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতারিত হলে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হেল্পলাইনে ফোন করে একাউন্ট আটকান। সামাজিক মাধ্যমের একাউন্ট হ্যাক হলে প্ল্যাটফর্মের অফিশিয়াল পুনরুদ্ধার পদ্ধতি ব্যবহার করুন এবং পরিচিতদের সতর্ক করুন। হুমকি, ব্ল্যাকমেইল বা বড় অঙ্কের প্রতারণার ক্ষেত্রে সব প্রমাণ, যেমন স্ক্রিনশট, নম্বর ও লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করুন। জরুরি বিপদে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও ফোন করা যায়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোবাইলে কি অ্যান্টিভাইরাস লাগে?
অফিশিয়াল স্টোর থেকে অ্যাপ নামালে এবং ফোন হালনাগাদ রাখলে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য আলাদা অ্যান্টিভাইরাস সাধারণত জরুরি নয়। তবে ফোনের নিজস্ব নিরাপত্তা স্ক্যান চালু রাখুন এবং অজানা অ্যাপ এড়িয়ে চলুন।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কি ক্যারিয়ার গড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, এটি দ্রুত বাড়তে থাকা একটি পেশাক্ষেত্র। নেটওয়ার্কিং, অপারেটিং সিস্টেম ও প্রোগ্রামিংয়ের ভিত্তি থেকে শুরু করে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ ও সনদের মাধ্যমে এ পেশায় আসা যায়।
হ্যাকার মানেই কি অপরাধী?
না। যাঁরা অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা খুঁজে বের করেন, তাঁদের বলা হয় এথিক্যাল হ্যাকার, তাঁরা নিরাপত্তা বাড়াতে কাজ করেন। অনুমতি ছাড়া অন্যের সিস্টেমে ঢোকা অপরাধ।
শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ রাখব কীভাবে?
বিজ্ঞাপন
বয়স অনুযায়ী অ্যাপ ব্যবহার, প্যারেন্টাল কন্ট্রোল চালু রাখা এবং সবচেয়ে বড় কথা, খোলামেলা কথা বলার সম্পর্ক তৈরি করা জরুরি, যাতে কোনো সমস্যায় পড়লে তারা নিজে থেকেই জানায়।
ছোট ব্যবসা বা দোকানের জন্য সাইবার নিরাপত্তায় কী করা উচিত?
ব্যবসার ফেসবুক পেজ ও মোবাইল ব্যাংকিং মার্চেন্ট একাউন্টে শক্ত পাসওয়ার্ড ও দুই ধাপের যাচাই চালু রাখুন। পেজের অ্যাডমিন হিসেবে শুধু বিশ্বস্ত মানুষ রাখুন, কর্মচারীদের সঙ্গে পিন শেয়ার করবেন না এবং হিসাবের কম্পিউটারে নিয়মিত ব্যাকআপ রাখুন।