তেহারি রেসিপি: পুরান ঢাকার স্বাদে গরুর মাংসের তেহারি
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সরিষার তেলের ঝাঁজ, কাঁচা মরিচের ঘ্রাণ আর ছোট ছোট নরম মাংসের টুকরা, তেহারির পরিচয় এই তিনে। কাচ্চি বা বিরিয়ানির মতো মাংসের বড় টুকরা থাকে না, স্তরে স্তরে সাজানোও হয় না। মাংস আর চাল একই হাঁড়িতে একসঙ্গে রান্না হয়, ফলে প্রতিটি দানায় মাংসের ঝোলের স্বাদ ঢুকে যায়।
বিজ্ঞাপন
তেহারি রেসিপি সংক্ষেপে এমন: গরুর মাংস দেড় ইঞ্চির ছোট টুকরা করে দই, আদা-রসুন আর গরম মসলায় মেখে সরিষার তেলে কষিয়ে নরম করে রান্না করুন। মাংস সেদ্ধ হলে ধুয়ে ঝরানো চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল ওই মাংসের হাঁড়িতেই কিছুক্ষণ ভেজে মেপে গরম পানি দিন। পানি শুকিয়ে এলে কাঁচা মরিচ, কেওড়া আর সামান্য ঘি ছড়িয়ে কম আঁচে দমে রাখুন।
নিচের পরিমাণে আট থেকে দশজনের তেহারি হবে। পরিবার ছোট হলে সব উপকরণ অর্ধেক করে নিন।
উপকরণ
মাংসের জন্য: হাড় ছাড়া গরুর মাংস এক কেজি (সামান্য চর্বিসহ), টক দই আধা কাপ, পেঁয়াজকুচি এক কাপ, আদাবাটা দুই টেবিল-চামচ, রসুনবাটা দেড় টেবিল-চামচ, শুকনো মরিচের গুঁড়া এক চা-চামচ, জিরা গুঁড়া এক চা-চামচ, ধনে গুঁড়া এক চা-চামচ, জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়া আধা চা-চামচ, গোলমরিচ গুঁড়া আধা চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, সরিষার তেল আধা কাপ।
বিজ্ঞাপন
চালের জন্য: চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল এক কেজি, সরিষার তেল আধা কাপ, পেঁয়াজকুচি আধা কাপ, এলাচ ছয়টি, দারুচিনি তিন টুকরা, তেজপাতা তিনটি, লবঙ্গ চারটি, গরম পানি প্রয়োজনমতো।
শেষে: কাঁচা মরিচ ১৫ থেকে ২০টি (আস্ত বা মাঝখানে চেরা), ঘি দুই টেবিল-চামচ, কেওড়া জল এক চা-চামচ, তরল দুধ আধা কাপ, বেরেস্তা অল্প।
পুরান ঢাকার স্বাদের মূল চাবি সরিষার তেল। অনেকে অর্ধেক সরিষার তেল আর অর্ধেক সয়াবিন দেন, তবে আসল ঝাঁজ পেতে পুরোটা সরিষার তেলই ভালো।
তেহারি রান্নার নিয়ম: আগে থেকে যা জেনে রাখবেন
বিজ্ঞাপন
তেহারির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে তিনটি জিনিসের ওপর: মাংসের মান, চালের ধরন আর পানির মাপ। কোরবানির মাংস বা একটু চর্বিযুক্ত রানের মাংস তেহারির জন্য ভালো, পুরোপুরি চর্বিহীন মাংসে স্বাদ কিছুটা শুকনো লাগে। মাংস কেনার পর ধুয়ে ভালো করে পানি ঝরিয়ে নিন, নইলে মসলা পাতলা হয়ে যায়।
চাল কেনার সময় দানা ভাঙা কি না দেখে নিন। ভাঙা চালে তেহারি জাউয়ের মতো হয়ে যেতে পারে। নতুন মৌসুমের চাল তুলনামূলক কম পানি টানে, তাই প্রথমবার রান্নার সময় তরল একটু কম দিয়ে শুরু করা নিরাপদ; প্রয়োজনে পরে অল্প গরম পানি ছিটিয়ে দেওয়া যায়।
হাঁড়ি হিসেবে ভারী তলার ডেকচি বা পুরু অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল সবচেয়ে ভালো। পাতলা হাঁড়িতে দমের সময় তলা পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি।
গরুর তেহারির মাংস রান্না
বিজ্ঞাপন
১. মাংস কাটা: মাংস দেড় ইঞ্চির মতো ছোট টুকরা করুন। খুব বড় হলে চালের সঙ্গে মেশে না, খুব ছোট হলে রান্নায় শুকিয়ে যায়। সামান্য চর্বি রাখুন, এতে স্বাদ আর রসালো ভাব আসে।
২. মেরিনেট: মাংসে দই, আদা-রসুনবাটা, সব গুঁড়া মসলা আর লবণ মেখে অন্তত আধা ঘণ্টা রাখুন।
৩. তেল পাকানো: হাঁড়িতে সরিষার তেল দিয়ে ধোঁয়া ওঠা পর্যন্ত গরম করুন, তারপর আঁচ কমিয়ে এক মিনিট ঠান্ডা হতে দিন। এতে তেলের কাঁচা গন্ধ চলে যায়, ঝাঁজ থাকে।
৪. কষানো: পেঁয়াজকুচি দিয়ে নরম ও হালকা বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। মাংস দিয়ে বড় আঁচে পাঁচ মিনিট নেড়ে কষান, তারপর মাঝারি আঁচে ঢেকে দিন।
বিজ্ঞাপন
৫. সেদ্ধ: মাংস থেকে বের হওয়া পানিতেই অনেকটা সেদ্ধ হবে। প্রয়োজনে এক কাপ গরম পানি দিন। এক থেকে দেড় ঘণ্টা কম আঁচে রান্না করুন, যতক্ষণ না মাংস নরম হয়। প্রেশার কুকারে করলে সাধারণত পাঁচ-ছয়টি সিটিতে হয়ে যায়, তবে মাংসভেদে সময় আলাদা হয়।
মাংস নরম হলে ঝোল ঘন হয়ে তেল ভেসে উঠবে। ঝোল কতটুকু আছে মেপে রাখুন, এটি চালের পানির হিসাবে যোগ হবে।
সরিষার তেলে চাল রান্না
চিনিগুঁড়া চাল আলতো করে ধুয়ে ২০ মিনিট ঝরিয়ে রাখুন। আলাদা প্যানে সরিষার তেল পাকিয়ে গরম মসলা আর পেঁয়াজকুচি দিন, পেঁয়াজ সোনালি হলে চাল দিয়ে চার-পাঁচ মিনিট ভাজুন। চাল একটু স্বচ্ছ দেখালে মাংসের হাঁড়িতে ঢেলে দিন এবং আলতো করে মিশিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
পানির হিসাব: চাল যত কাপ, মাংসের ঝোলসহ মোট তরল সাধারণত তার দেড় থেকে পৌনে দুই গুণ লাগে। তরল ফুটন্ত গরম হতে হবে। লবণ চেখে দেখুন, পানি সামান্য নোনতা লাগলে ঠিক আছে।
বড় আঁচে একবার ফুটে উঠলে আঁচ মাঝারি করে ঢেকে দিন। মাঝে একবার নিচ থেকে আলতো করে উল্টে দিন, যাতে তলায় লেগে না যায়। পানি প্রায় শুকিয়ে চালের ওপরে ছোট ছোট গর্ত দেখা দিলে দমের সময় হয়েছে।
দম আর পরিবেশন
চালের ওপর কাঁচা মরিচ ছড়িয়ে দিন। গরম দুধ, কেওড়া জল আর গলানো ঘি জায়গায় জায়গায় ঢালুন। চাইলে কিছু বেরেস্তা দিন। ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ করে চুলায় তাওয়া রেখে তার ওপর হাঁড়ি বসিয়ে সবচেয়ে কম আঁচে ২০ থেকে ২৫ মিনিট দমে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
দম শেষে আরও দশ মিনিট ঢাকা অবস্থায় রেখে দিন। পরিবেশনের আগে নিচ থেকে আলতো করে মিশিয়ে নিন, যাতে মাংস আর চাল সমানভাবে ছড়ায়।
পুরান ঢাকার ধাঁচে তেহারির সঙ্গে শসা-পেঁয়াজ-কাঁচা মরিচের সালাদ, লেবু আর ঠান্ডা বোরহানি দিন। অনেকে পাশে একটি ডিম ভুনা বা জালি কাবাবও রাখেন।
সাধারণ ভুল আর তার সমাধান
মাংস শক্ত থেকে গেছে: চাল দেওয়ার আগেই মাংস পুরোপুরি নরম করতে হবে। চাল দেওয়ার পর মাংস আর বেশি সেদ্ধ হয় না।
বিজ্ঞাপন
চাল গলে গেছে: পানি বেশি হয়েছে বা চাল বেশিক্ষণ ভেজানো ছিল। পরেরবার তরল কিছুটা কমান। চিনিগুঁড়া চাল নরম, তাই বেশি নাড়বেন না।
তলা পুড়ে গেছে: দমের সময় তাওয়া ব্যবহার না করলে বা আঁচ বেশি থাকলে এমন হয়। ভারী তলার হাঁড়ি ব্যবহার করুন।
সরিষার তেলের কাঁচা গন্ধ: তেল ধোঁয়া ওঠা পর্যন্ত পাকানো হয়নি। পরেরবার শুরুতেই তেল ভালো করে গরম করে নিন।
স্বাদ পানসে: মাংসের মসলায় লবণ কম ছিল বা চালের পানিতে লবণ চেখে দেখা হয়নি। দুই ধাপেই লবণ চেখে নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খাসির মাংস দিয়ে কি তেহারি হয়?
হয়। খাসির মাংস দ্রুত সেদ্ধ হয়, তাই রান্নার সময় কমিয়ে দিন। স্বাদ গরুর তেহারির চেয়ে কিছুটা আলাদা হবে।
সরিষার তেল ছাড়া তেহারি কেমন হয়?
বিজ্ঞাপন
সয়াবিন তেলে রান্না করলেও তেহারি হবে, তবে পুরান ঢাকার চেনা ঝাঁজটা থাকবে না। অন্তত চাল ভাজার তেলটুকু সরিষার রাখার চেষ্টা করুন।
তেহারিতে আলু দেওয়া যায় কি?
প্রচলিত তেহারিতে আলু সাধারণত থাকে না। তবে চাইলে ছোট টুকরা আলু ভেজে মাংসের সঙ্গে দিতে পারেন।
বাসমতী চাল দিয়ে তেহারি করলে কেমন হবে?
বিজ্ঞাপন
করা যায়, তবে পুরান ঢাকার তেহারি সাধারণত ছোট দানার সুগন্ধি চালে হয়। বাসমতী দিলে পানির পরিমাণ ও রান্নার সময় বদলাতে হবে।