মোরগ পোলাও রেসিপি: বিয়েবাড়ির স্বাদে ঘরে রান্নার নিয়ম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বিয়েবাড়ির প্যান্ডেলে মাটির সানকি বা প্লেটে যে মোরগ পোলাও আসে, তার ঘ্রাণ অনেকের শৈশবের স্মৃতি। ঘিয়ে ভাজা সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল, নরম মুরগির বড় টুকরা, ওপরে বেরেস্তা আর হালকা মিষ্টি-ঝাল স্বাদ। বিরিয়ানির সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, এখানে লাল মরিচের ঝাল আর কড়া মসলা কম, ঘি, দুধ আর গরম মসলার ঘ্রাণই প্রধান।
বিজ্ঞাপন
মোরগ পোলাও রেসিপি দুই ভাগে ভাবুন। প্রথমে মুরগি দই, পেঁয়াজ বেরেস্তা, আদা-রসুন আর গরম মসলায় রোস্টের মতো করে রান্না করুন। পরে ঘিয়ে গরম মসলা আর চাল ভেজে মুরগির ঝোল ও গরম পানি মিশিয়ে পোলাও রাঁধুন। পানি প্রায় শুকিয়ে এলে মুরগির টুকরাগুলো চালের ভেতরে গুঁজে দুধ, কেওড়া আর বেরেস্তা ছড়িয়ে কম আঁচে দমে রাখুন।
নিচের পরিমাণে ছয় থেকে আটজনের জন্য পোলাও হবে। দেশি বা সোনালি মুরগি হলে স্বাদ বেশি খোলে, তবে ব্রয়লারেও ভালো হয়, শুধু রান্নার সময় কম লাগে।
উপকরণ: ছয় থেকে আটজনের জন্য
মুরগির জন্য: মুরগি দেড় কেজি (বড় আট থেকে দশ টুকরা), টক দই এক কাপ, পেঁয়াজকুচি এক কাপ, আদাবাটা দুই টেবিল-চামচ, রসুনবাটা এক টেবিল-চামচ, গোলমরিচ গুঁড়া এক চা-চামচ, চিনি এক চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, তেল আধা কাপ, ঘি দুই টেবিল-চামচ, কাঁচা মরিচ আট-দশটি।
বিজ্ঞাপন
চালের জন্য: চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চাল এক কেজি, ঘি চার টেবিল-চামচ, তেল চার টেবিল-চামচ, পেঁয়াজকুচি আধা কাপ, আদাবাটা এক টেবিল-চামচ, লবণ স্বাদমতো, গরম পানি প্রয়োজনমতো।
গরম মসলা ও সুগন্ধ: এলাচ দশটি, দারুচিনি চার টুকরা, তেজপাতা চারটি, লবঙ্গ ছয়টি, তরল দুধ এক কাপ, কেওড়া জল এক চা-চামচ, গোলাপজল এক চা-চামচ, বেরেস্তা এক কাপ, কিশমিশ দুই টেবিল-চামচ (ঐচ্ছিক)।
মোরগ পোলাও রান্নার মসলা ও প্রস্তুতি
এই পোলাওয়ে গুঁড়া মসলার ব্যবহার খুব কম। যাঁরা চান, তাঁরা মুরগিতে আধা চা-চামচ জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়া বা এক টেবিল-চামচ পোস্তদানা ও কাজুবাদাম বাটা দিতে পারেন; এতে ঝোল ঘন ও মোলায়েম হয়। হলুদ বা মরিচের গুঁড়া সাধারণত দেওয়া হয় না, এতে পোলাওয়ের রং সাদাটে আর ঝকঝকে থাকে।
বিজ্ঞাপন
রান্নার আগের প্রস্তুতি:
১. বেরেস্তা: দুই থেকে তিনটি বড় পেঁয়াজ পাতলা করে কেটে তেলে মাঝারি আঁচে সোনালি-বাদামি করে ভেজে নিন। কাগজে তুলে রাখুন, ঠান্ডা হলে মচমচে হবে। বেরেস্তা ভাজা তেলটি ফেলবেন না, মুরগি রান্নায় এটিই ব্যবহার করুন।
২. চাল: চিনিগুঁড়া চাল আলতো হাতে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট চালুনিতে রেখে দিন। এই চাল বেশি সময় ভেজালে ভাঙে।
৩. মুরগি মেরিনেট: মুরগিতে দই, আদা-রসুনবাটা, গোলমরিচ, লবণ আর অর্ধেক বেরেস্তা চটকে মেখে আধা ঘণ্টা রাখুন।
বিজ্ঞাপন
মুরগির রোস্ট রান্না
বেরেস্তা ভাজার তেল আর দুই টেবিল-চামচ ঘি হাঁড়িতে গরম করুন। অর্ধেক গরম মসলা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজকুচি নরম হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। মেরিনেট করা মুরগি দিয়ে মাঝারি আঁচে কষান। দই থেকে পানি বের হবে, তাতেই মাংস সেদ্ধ হবে। আলাদা পানি দেওয়ার দরকার নেই; দেশি মুরগি হলে আধা কাপ গরম পানি দিতে পারেন।
২০ থেকে ২৫ মিনিট ঢেকে রান্না করার পর মাংস নরম হলে চিনি আর কাঁচা মরিচ দিন। ঝোল ঘন হয়ে তেল ওপরে ভেসে উঠলে চুলা বন্ধ করুন। মুরগির টুকরাগুলো একটি বাটিতে তুলে রাখুন, হাঁড়ির ঝোল আলাদা বাটিতে ঢেলে নিন। এই ঝোলই পোলাওয়ের স্বাদের আসল উৎস।
পোলাওয়ের চাল রান্না
বিজ্ঞাপন
১. চাল ভাজা: বড় হাঁড়িতে ঘি আর তেল গরম করে বাকি গরম মসলা ও আধা কাপ পেঁয়াজকুচি দিন। পেঁয়াজ হালকা সোনালি হলে আদাবাটা দিয়ে এক মিনিট নাড়ুন। এরপর চাল দিয়ে মাঝারি আঁচে চার থেকে পাঁচ মিনিট আলতো করে ভাজুন, যতক্ষণ না চাল থেকে সুন্দর ঘ্রাণ বের হয়।
২. পানি মাপ: মুরগির ঝোল একটি মাপের কাপে ঢালুন, তারপর গরম পানি মিশিয়ে মোট তরলের পরিমাণ ঠিক করুন। চিনিগুঁড়া চালে সাধারণত চাল যত কাপ, তার দেড় থেকে পৌনে দুই গুণ তরল লাগে; নতুন চাল হলে কম, পুরোনো চাল হলে কিছুটা বেশি। দুধ পরে দেওয়া হবে, সেটি মাথায় রেখে তরল সামান্য কম রাখুন।
৩. ফোটানো: তরল চালে ঢেলে লবণ চেখে নিন। পানি একটু নোনতা লাগা উচিত। বড় আঁচে ফুটিয়ে নিন, তারপর মাঝারি আঁচে ঢেকে রান্না করুন যতক্ষণ না পানি প্রায় শুকিয়ে চালের ওপর ছোট ছোট ছিদ্র দেখা দেয়।
দম দেওয়া ও পরিবেশন
বিজ্ঞাপন
পানি প্রায় শুকিয়ে এলে মুরগির টুকরাগুলো চালের ভেতরে জায়গায় জায়গায় গুঁজে দিন। ওপরে গরম দুধ, কেওড়া জল, গোলাপজল ছিটিয়ে বাকি বেরেস্তা আর কিশমিশ ছড়িয়ে দিন। ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ করে চুলায় তাওয়া রেখে তার ওপর হাঁড়ি বসিয়ে সবচেয়ে কম আঁচে ২০ মিনিট দমে রাখুন।
দম শেষে দশ মিনিট রেখে কাঠের চামচ বা বড় চ্যাপ্টা খুন্তি দিয়ে হাঁড়ির কিনারা থেকে আলতো করে তুলুন। জোরে নাড়লে চিনিগুঁড়া চাল ভেঙে যায়।
বিয়েবাড়ির ধাঁচে পরিবেশন করতে চাইলে প্রতিটি প্লেটে পোলাওয়ের ওপর একটি বড় মুরগির টুকরা, পাশে সেদ্ধ ডিম বা জালি কাবাব, শসা-গাজরের সালাদ আর এক গ্লাস বোরহানি দিন।
সহজ মোরগ পোলাও: অল্প সময়ে
বিজ্ঞাপন
হাতে সময় কম থাকলে এক হাঁড়িতেই করা যায়। মুরগি কষিয়ে প্রায় সেদ্ধ হলে সেই হাঁড়িতেই ধুয়ে ঝরানো চাল দিয়ে কয়েক মিনিট ভেজে নিন, মেপে গরম পানি দিন। পানি শুকিয়ে এলে দুধ, কেওড়া, বেরেস্তা দিয়ে দমে রাখুন। স্বাদ প্রায় একই থাকে, তবে মুরগির টুকরা কিছুটা ভেঙে যেতে পারে এবং চাল মসলায় সামান্য রঙিন হয়।
বড় আয়োজনে রান্না করলে চাল আর মুরগি দুই হাঁড়িতে ভাগ করে নিন। খুব বড় হাঁড়িতে একসঙ্গে বেশি চাল দিলে নিচের অংশ নরম আর ওপরের অংশ শক্ত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোরগ পোলাও আর চিকেন বিরিয়ানির পার্থক্য কী?
বিজ্ঞাপন
বিরিয়ানিতে সাধারণত লম্বা বাসমতী চাল আধা সেদ্ধ করে মাড় ফেলে স্তরে সাজানো হয় এবং মসলা ও ঝাল বেশি থাকে। মোরগ পোলাওয়ে ছোট সুগন্ধি চাল ঝোল আর পানিতে সরাসরি রান্না হয়, স্বাদ তুলনামূলক হালকা ও ঘিয়ের ঘ্রাণপ্রধান।
পোলাও গলে গেলে কী করব?
পরেরবার পানির পরিমাণ কমান এবং চাল বেশিক্ষণ ভেজাবেন না। এবারের পোলাও ঢাকনা খুলে খুব কম আঁচে কিছুক্ষণ রাখলে বাড়তি ভাপ বেরিয়ে কিছুটা ঝরঝরে হয়।
ঘিয়ের বদলে শুধু তেল দেওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়, তবে বিয়েবাড়ির ঘ্রাণ কমে যাবে। খরচ বা স্বাস্থ্যের কারণে অর্ধেক তেল আর অর্ধেক ঘি ব্যবহার করতে পারেন।
আগের দিন রান্না করে রাখা যায়?
মুরগির রোস্ট আগের দিন রেঁধে ফ্রিজে রাখা যায়। পোলাও রান্নার দিনই করা ভালো, তাহলে চাল ঝরঝরে আর ঘ্রাণ টাটকা থাকে।
বেঁচে যাওয়া পোলাও কীভাবে গরম করব?
বিজ্ঞাপন
পোলাও ঠান্ডা হলে ঢাকনা দেওয়া বাটিতে ফ্রিজে রাখুন এবং এক-দুই দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলুন। গরম করার সময় ওপরে দুই-এক চামচ পানি বা দুধ ছিটিয়ে ঢেকে কম আঁচে বা ওভেনে গরম করুন, তাহলে চাল শুকিয়ে শক্ত হবে না। পুরো হাঁড়ি বারবার গরম না করে যতটুকু খাবেন ততটুকুই গরম করুন।