তৈলাক্ত ত্বকের যত্ন: অতিরিক্ত তেল আর ব্রণ নিয়ন্ত্রণের উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সকালে মুখ ধুয়ে বের হলেন, দুপুর না গড়াতেই কপাল আর নাক চকচক করছে, ছবিতে মুখ তেলতেলে দেখাচ্ছে। তৈলাক্ত ত্বকের মানুষদের কাছে এটি রোজকার বিরক্তি। সঙ্গে থাকে বড় লোমকূপ, ব্ল্যাকহেডস আর মাঝে মাঝে ব্রণ।
বিজ্ঞাপন
তবে তেল মানেই শত্রু নয়। ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ত্বককে সুরক্ষা দেয়, আর্দ্রতা ধরে রাখে। তৈলাক্ত ত্বকে এই তেল প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তৈরি হয়। লক্ষ্য তাই তেল একেবারে মুছে ফেলা নয়, বরং ভারসাম্যে রাখা।
তৈলাক্ত ত্বকের যত্নে সবচেয়ে কার্যকর রুটিন খুব সাধারণ: দিনে দুবার মৃদু জেল বা ফোমিং ফেসওয়াশ, তেলমুক্ত হালকা ময়েশ্চারাইজার, দিনের বেলা নন-কমেডোজেনিক সানস্ক্রিন এবং সপ্তাহে এক-দুবার মাটি বা বেসনের ফেসপ্যাক। বেশি ঘষামাজা আর কড়া উপকরণ এই ত্বকের সবচেয়ে বড় ভুল।
ত্বক কেন তৈলাক্ত হয়
ত্বকের নিচে থাকা তেলগ্রন্থি সিবাম নামের তেল তৈরি করে। কতটা তেল হবে, তা অনেকটাই বংশগত। কৈশোরে হরমোনের পরিবর্তনে তেলগ্রন্থি বেশি সক্রিয় হয়, তাই এ বয়সে তৈলাক্ত ত্বক আর ব্রণ বেশি দেখা যায়। আমাদের দেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়াও তেলতেলে ভাব বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
কিছু অভ্যাস সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। দিনে চার-পাঁচবার সাবান দিয়ে মুখ ধোয়া, অ্যালকোহলযুক্ত কড়া টোনার, ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া, ভারী তেলভিত্তিক ক্রিম আর রাতে মেকআপ না তোলা এর মধ্যে প্রধান। মাসিক অনিয়মিত, মুখে অতিরিক্ত লোম আর হঠাৎ ব্রণ বেড়ে যাওয়া একসঙ্গে দেখা দিলে হরমোনজনিত কারণ, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকতে পারে, যা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো দরকার।
প্রতিদিনের রুটিন: সকাল আর রাত
সকালে:
১. মুখ ধোয়া: কুসুম গরম বা স্বাভাবিক পানিতে মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ড আলতো ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
২. টোনার (ঐচ্ছিক): অ্যালকোহলমুক্ত টোনার বা গোলাপজল তুলায় নিয়ে মুছতে পারেন। এটি বাধ্যতামূলক নয়।
৩. ময়েশ্চারাইজার: জেল বা পানিভিত্তিক হালকা ময়েশ্চারাইজার অল্প পরিমাণে।
৪. সানস্ক্রিন: বাইরে গেলে জেল বা ম্যাট ফিনিশের সানস্ক্রিন।
রাতে:
বিজ্ঞাপন
১. মেকআপ ও সানস্ক্রিন তোলা: মাইসেলার ওয়াটার বা মেকআপ রিমুভার দিয়ে প্রথমে মুছে নিন।
২. ফেসওয়াশ: আবার মৃদু ফেসওয়াশে মুখ ধুয়ে নিন।
৩. ব্রণের জন্য পণ্য (প্রয়োজনে): চিকিৎসকের পরামর্শে বা সাধারণ মাত্রার কোনো ব্রণনাশক জেল আক্রান্ত জায়গায় পাতলা করে।
৪. হালকা ময়েশ্চারাইজার: ব্রণের ওষুধ ত্বক শুকিয়ে দিতে পারে, তাই ময়েশ্চারাইজার বাদ দেবেন না।
বিজ্ঞাপন
দিনের মাঝখানে তেল বেশি লাগলে ফেসওয়াশ নয়, ব্লটিং পেপার বা পরিষ্কার টিস্যু দিয়ে চেপে তেল তুলে নিন।
তৈলাক্ত ত্বকের ফেসওয়াশ বাছাই
ফেসওয়াশ কেনার সময় দাম বা বিজ্ঞাপনের চেয়ে উপাদান দেখুন। "অয়েল ফ্রি", "নন-কমেডোজেনিক" লেখা জেল বা ফোমিং ফেসওয়াশ সাধারণত উপযোগী। যাঁদের ব্ল্যাকহেডস ও ব্রণ বেশি, তাঁদের জন্য স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত ফেসওয়াশ লোমকূপ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। শুরুতে দিনে একবার ব্যবহার করে দেখুন, ত্বক শুকিয়ে গেলে কমিয়ে দিন।
যে ফেসওয়াশ ব্যবহারের পর মুখ টান টান, শুকনো খড়খড়ে লাগে, সেটি আপনার জন্য বেশি কড়া। "চিকচিকে পরিষ্কার" অনুভূতি আসলে ত্বকের সুরক্ষা স্তর নষ্ট হওয়ার লক্ষণ। দানাদার স্ক্রাবওয়ালা ফেসওয়াশ প্রতিদিন ব্যবহার করবেন না, বিশেষ করে মুখে সক্রিয় ব্রণ থাকলে।
বিজ্ঞাপন
তৈলাক্ত ত্বকে ময়েশ্চারাইজার আর সানস্ক্রিন
অনেকের ধারণা, তৈলাক্ত ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগালে আরও তেল হবে। আসলে ত্বক শুকিয়ে গেলে তেলগ্রন্থি তা পুষিয়ে নিতে আরও সক্রিয় হয়। জেল ধরনের, তেলমুক্ত ময়েশ্চারাইজার ত্বকে দ্রুত মিশে যায়, ভারী লাগে না। নায়াসিনামাইড, গ্লিসারিন বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিডযুক্ত হালকা ময়েশ্চারাইজার তৈলাক্ত ত্বকে অনেকে ভালোভাবে মানিয়ে নেন।
সানস্ক্রিন বাদ দেওয়ার প্রবণতাও এই ত্বকে বেশি, কারণ অনেক সানস্ক্রিন চটচটে। জেল বা ফ্লুইড ধরনের, "ম্যাট" বা "নন-কমেডোজেনিক" লেখা এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন খুঁজে নিন। ব্রণের দাগ রোদে আরও কালো হয়, তাই সানস্ক্রিন এখানে আরও জরুরি।
তৈলাক্ত ত্বকের ফেসপ্যাক
বিজ্ঞাপন
সপ্তাহে এক থেকে দুবার ফেসপ্যাক বাড়তি তেল শুষে নিয়ে মুখ সতেজ করে। কয়েকটি সহজ ঘরোয়া প্যাক:
১. মুলতানি মাটি ও গোলাপজল: দুই চা-চামচ মুলতানি মাটির সঙ্গে প্রয়োজনমতো গোলাপজল মিশিয়ে পাতলা পেস্ট করুন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে পুরোপুরি শুকানোর আগেই ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে একবারই যথেষ্ট।
২. বেসন ও টক দই: দুই চা-চামচ বেসন আর এক চা-চামচ টক দই মিশিয়ে লাগান, ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।
৩. ওটস ও মধু: এক টেবিল-চামচ মিহি ওটস গুঁড়া, এক চা-চামচ মধু আর সামান্য পানি মিশিয়ে প্যাক করুন। মধু হালকা আর্দ্রতা দেয়, ওটস তেল শুষে নেয়।
বিজ্ঞাপন
৪. অ্যালোভেরা জেল: ব্রণ লাল হয়ে থাকলে বা ত্বক জ্বালা করলে শুধু অ্যালোভেরা জেল পাতলা করে লাগান।
নতুন কোনো উপকরণ মুখে দেওয়ার আগে কানের পেছনে লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিন। লেবুর রস, টুথপেস্ট বা বেকিং সোডা মুখে দেবেন না।
ব্রণ সামলানো আর কখন চিকিৎসক
ব্রণ বা ব্ল্যাকহেডস নখ দিয়ে খোঁটা আর চাপ দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। এতে সংক্রমণ ছড়ায় এবং স্থায়ী দাগ বা গর্ত হয়ে যেতে পারে। বালিশের কভার সপ্তাহে দু-তিনবার বদলান, চুলের তেল যেন কপালে না লাগে খেয়াল রাখুন, মোবাইল স্ক্রিন পরিষ্কার রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ব্রণের সাধারণ জেল নিয়মিত ব্যবহারে কাজ করতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ লাগে, তাই দু-চার দিনে ফল না পেয়ে বারবার পণ্য বদলাবেন না। একসঙ্গে অনেক নতুন পণ্য শুরু করাও ঠিক নয়; একটি একটি করে যোগ করুন, তাহলে কোনটিতে সমস্যা হচ্ছে তা বোঝা যায়।
খাবারের সঙ্গে ব্রণের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা প্রচলিত। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় আর বেশি দুধ খেলে ব্রণ বাড়তে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, তবে সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। শাকসবজি, ফল আর পর্যাপ্ত পানির সুষম খাবার ত্বকসহ পুরো শরীরের জন্যই ভালো। নিজের ক্ষেত্রে কোনো খাবারের পর ব্রণ বাড়ছে কি না, কয়েক সপ্তাহ খেয়াল করে দেখতে পারেন।
মানসিক চাপ আর ঘুমের অভাবেও অনেকের ব্রণ বেড়ে যায়। পরীক্ষার সময় বা কাজের চাপে মুখে হঠাৎ ব্রণ উঠলে তাই শুধু ক্রিম নয়, বিশ্রামের দিকেও নজর দিন।
গভীর, ব্যথাযুক্ত, পুঁজভরা বড় ব্রণ হলে, দাগ বা গর্ত থেকে যেতে থাকলে, প্রাপ্তবয়সে হঠাৎ ব্রণ বেড়ে গেলে কিংবা ব্রণের কারণে মন খারাপ ও আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি তৈরি হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। নিজে থেকে স্টেরয়েড ক্রিম বা অন্যের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না; এতে সমস্যা জটিল হয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
তৈলাক্ত ত্বকে কি নারকেল তেল লাগানো যায়?
মুখে নারকেল তেল অনেকের লোমকূপ আটকে ব্রণ বাড়াতে পারে। তৈলাক্ত ও ব্রণপ্রবণ মুখে না লাগানোই ভালো।
দিনে কয়বার মুখ ধোয়া উচিত?
বিজ্ঞাপন
ফেসওয়াশ দিয়ে দুবার। খুব ঘামলে বা ব্যায়ামের পর আরেকবার শুধু পানি দিয়ে ধুতে পারেন।
বয়স বাড়লে কি তৈলাক্ত ভাব কমে?
সাধারণত হ্যাঁ। বয়স বাড়ার সঙ্গে তেলগ্রন্থির সক্রিয়তা কমে আসে। অনেকে তিরিশের পর থেকে পার্থক্য টের পান।
তৈলাক্ত ত্বকে কি পাউডার ব্যবহার করা ভালো?
বিজ্ঞাপন
হালকা, তেল শোষণকারী পাউডার সাময়িকভাবে চকচকে ভাব কমায়। তবে বারবার স্তরে স্তরে লাগালে লোমকূপ আটকে যেতে পারে, রাতে অবশ্যই ধুয়ে ফেলুন।