গরমে ত্বকের যত্ন: ঘাম, রোদ আর তেলতেলে ভাব সামলানোর উপায়
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
চৈত্র-বৈশাখের দুপুরে বাইরে থেকে ঘরে ফিরলে মুখে ঘাম, তেল আর ধুলার একটা আস্তর পড়ে যায়। গলায়, পিঠে ঘামাচি ওঠে, কপাল আর নাকে তেল চকচক করে, কিছুদিন পর রোদে পোড়া কালচে ভাবও চোখে পড়ে। আমাদের দেশের গরম শুধু তাপের নয়, আর্দ্রতারও, তাই ত্বকের সমস্যাও বেশি।
বিজ্ঞাপন
গরমে ত্বকের যত্নের জন্য জটিল রুটিন লাগে না। দিনে দুবার মৃদু ফেসওয়াশে মুখ ধোয়া, বাইরে বেরোনোর আগে সানস্ক্রিন, ভারী ক্রিমের বদলে হালকা জেল ময়েশ্চারাইজার, ঘাম জমতে না দেওয়া আর প্রচুর পানি পান, এই পাঁচটি অভ্যাসই মূল। বাকি সব এর সহায়ক।
তৈলাক্ত, শুষ্ক বা স্বাভাবিক, যে ধরনের ত্বকই হোক, গরমে সবার জন্যই রোদ থেকে সুরক্ষা আর পরিচ্ছন্নতা জরুরি। কীভাবে, কতটুকু, কখন, তা নিচে আলাদা করে দেওয়া হলো।
গরমে মুখ ধোয়ার নিয়ম
ঘামে ভেজা মুখ বারবার সাবান দিয়ে ধুলে ত্বক শুকিয়ে যায় এবং তেলগ্রন্থি আরও বেশি তেল তৈরি করে। তাই নিয়ম হলো সকালে আর রাতে ঘুমানোর আগে ফেসওয়াশ, মাঝখানে শুধু পরিষ্কার পানি।
বিজ্ঞাপন
১. সকালে: ঘুম থেকে উঠে মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। তৈলাক্ত ত্বকে জেল বা ফোমিং ফেসওয়াশ, শুষ্ক ত্বকে ক্রিমি ফেসওয়াশ ভালো।
২. বাইরে থেকে ফিরে: ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে মুখ, ঘাড় আর হাত ধুয়ে নিন। সানস্ক্রিন বা মেকআপ থাকলে দিনের শেষে তা ভালো করে তুলতে হবে।
৩. রাতে: দিনের ধুলা, ঘাম, সানস্ক্রিন সব তুলে ফেলতে ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন। মেকআপ থাকলে আগে মেকআপ রিমুভার বা মাইসেলার ওয়াটার দিয়ে মুছে নিন।
৪. মোছা: মুখ জোরে ঘষে মুছবেন না। পরিষ্কার নরম তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে চেপে মুছুন। মুখের তোয়ালে আলাদা রাখুন এবং ঘন ঘন ধুয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
রুমাল দিয়ে বারবার মুখ ঘষার বদলে টিস্যু দিয়ে ঘাম চেপে তুলে নিন। ব্লটিং পেপারও তেল শুষে নিতে কাজে আসে।
গরমে সানস্ক্রিন: কোনটা, কখন, কতটুকু
রোদে পোড়া, কালচে দাগ, অকালে বলিরেখা আর দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সানস্ক্রিনের বিকল্প নেই।
কোনটা কিনবেন: লেবেলে "ব্রড স্পেকট্রাম" লেখা এবং এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন বেছে নিন। তৈলাক্ত ত্বকে জেল বা "ম্যাট" ফিনিশ, শুষ্ক ত্বকে ক্রিম ধরনের সানস্ক্রিন আরামদায়ক। ব্রণের প্রবণতা থাকলে "নন-কমেডোজেনিক" লেখা দেখে কিনুন।
বিজ্ঞাপন
কখন লাগাবেন: বাইরে বের হওয়ার ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে। ঘামে বা পানিতে ধুয়ে যায় বলে বাইরে থাকলে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর আবার লাগানো দরকার।
কতটুকু: অনেকে খুব অল্প লাগান, তাতে লেবেলে লেখা সুরক্ষা মেলে না। মুখ আর গলার জন্য মোটামুটি দুই আঙুলের দৈর্ঘ্যের সমান পরিমাণ লাগানোর প্রচলিত নিয়মটি মনে রাখতে পারেন। কান, ঘাড়ের পেছন আর হাতের উল্টো পিঠ ভুলবেন না।
সানস্ক্রিনের পাশাপাশি ছাতা, চওড়া কিনারার টুপি আর সানগ্লাস ব্যবহার করুন। সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে কড়া থাকে, সম্ভব হলে এই সময় সরাসরি রোদে কম থাকুন।
হালকা ময়েশ্চারাইজার আর কম মেকআপ
বিজ্ঞাপন
গরমে ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া ভুল। ত্বক শুকিয়ে গেলে তা পুষিয়ে নিতে আরও তেল তৈরি হয়। ভারী ক্রিমের বদলে পানিভিত্তিক জেল বা হালকা লোশন ব্যবহার করুন। অনেক সানস্ক্রিনে ময়েশ্চারাইজার থাকে; তৈলাক্ত ত্বকে দিনের বেলা শুধু সেটিই যথেষ্ট হতে পারে।
মেকআপ যতটা সম্ভব হালকা রাখুন। ভারী ফাউন্ডেশন ঘামের সঙ্গে মিশে লোমকূপ আটকে দেয়, ব্রণ বাড়ে। রাতে মেকআপ রেখে ঘুমাবেন না।
গরমে ত্বকের যত্ন ঘরোয়া উপায়
রান্নাঘরের কিছু উপকরণ গরমে ত্বককে আরাম দেয়। এগুলো সানস্ক্রিনের বিকল্প নয়, তবে সহায়ক।
বিজ্ঞাপন
১. অ্যালোভেরা জেল: রোদে লাল হয়ে যাওয়া বা জ্বালা করা ত্বকে ঠান্ডা অ্যালোভেরা জেল আরাম দেয়।
২. শসা: শসার পাতলা টুকরো বা রস মুখে কিছুক্ষণ রাখলে ত্বক ঠান্ডা ও সতেজ লাগে।
৩. টক দই ও বেসন: সপ্তাহে এক-দুবার দই আর বেসনের প্যাক তৈলাক্ত ভাব কমাতে সাহায্য করে।
৪. ঠান্ডা পানির সেঁক: পরিষ্কার কাপড় ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে মুখে কয়েক মিনিট রাখলে লালচে ভাব কমে।
বিজ্ঞাপন
সরাসরি লেবুর রস, টুথপেস্ট বা বেকিং সোডা মুখে লাগাবেন না। এগুলো ত্বকে জ্বালা আর দাগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে রোদের সংস্পর্শে।
ঘামাচি, ছত্রাক আর রোদে পোড়া
ঘামাচি: ঘামের নালি আটকে গেলে ছোট ছোট চুলকানিযুক্ত লাল দানা ওঠে। ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরুন, দিনে প্রয়োজনে দুবার গোসল করুন, ফ্যানের বাতাসে শরীর শুকনো রাখুন। ভারী তেল বা ক্রিম ঘামাচির জায়গায় লাগাবেন না।
ছত্রাক সংক্রমণ: কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচে বা পেটের ভাঁজে ঘাম জমে গোল গোল চুলকানিযুক্ত লাল দাগ হতে পারে। জায়গাগুলো শুকনো রাখুন, ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলান, অন্তর্বাস প্রতিদিন ধুয়ে রোদে শুকান। নিজে থেকে স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম লাগাবেন না, এতে ছত্রাক আরও ছড়ায়।
বিজ্ঞাপন
রোদে পোড়া: ত্বক লাল হয়ে জ্বালা করলে ঠান্ডা পানির সেঁক দিন, অ্যালোভেরা বা হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ফোসকা উঠলে তা গালবেন না।
ফোসকা বড় হলে, জ্বর-কাঁপুনি থাকলে, ঘামাচি বা দাগে পুঁজ জমলে অথবা ঘরোয়া যত্নে দুই সপ্তাহেও উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
পোশাক, পানি আর খাবার
হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক বাতাস চলাচলে সাহায্য করে, ঘাম শুকায় তাড়াতাড়ি। সিনথেটিক আঁটসাঁট কাপড় গরমে এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
গরমে ঘামের সঙ্গে পানি আর লবণ বেরিয়ে যায়। তৃষ্ণা পাওয়ার আগেই পানি পান করুন। ডাবের পানি, লেবু-পানি, তরমুজ, শসা, বাঙ্গি ভালো বিকল্প। খুব বেশি ঘামলে খাবার স্যালাইন খাওয়া যায়। ভাজাপোড়া আর অতিরিক্ত মিষ্টি কমালে ত্বকের তেলতেলে ভাব আর ব্রণও কিছুটা কম থাকে বলে অনেকে টের পান।
গরমে চুল আর মাথার ত্বকও ঘামে ভিজে থাকে। চুলের তেল আর ঘাম কপালে নেমে এলে সেখানে ব্রণ ওঠে। তাই গরমে মাথায় ভারী তেল কম দিন, প্রয়োজনে একদিন পরপর মৃদু শ্যাম্পু করুন এবং ঘুমানোর সময় চুল বেঁধে রাখুন। হেলমেট বা টুপি পরলে ভেতরের কাপড়টি নিয়মিত ধুয়ে নিন।
রোদে অনেকক্ষণ কাজ করার পর মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, বমিভাব, ত্বক গরম ও শুকনো হয়ে যাওয়া বা বিভ্রান্তি দেখা দিলে তা হিটস্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। দ্রুত ছায়ায় নিয়ে শরীর ভেজা কাপড়ে মুছে দিন এবং দেরি না করে হাসপাতালে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ঘরে থাকলেও কি সানস্ক্রিন লাগাতে হবে?
জানালার পাশে দীর্ঘ সময় থাকলে বা বারবার বাইরে যাওয়া-আসা করলে লাগানো ভালো। সারা দিন ঘরের ভেতরে থাকলে সাধারণত দরকার পড়ে না।
গরমে দিনে কয়বার মুখ ধোয়া উচিত?
ফেসওয়াশ দিয়ে দুবার যথেষ্ট। বাইরে থেকে ফিরে বা খুব ঘামলে মাঝখানে শুধু পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
রোদে পোড়া কালো দাগ কত দিনে যায়?
নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসে ধীরে ধীরে হালকা হয়। দাগ না কমলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ঘামাচিতে পাউডার দেওয়া কি ঠিক?
শুকনো ত্বকে হালকা করে দেওয়া যায়, তবে ভেজা ত্বকে পাউডার জমে দলা হয়ে লোমকূপ আরও আটকে দিতে পারে। শিশুর মুখের কাছে পাউডার ছড়াবেন না।