সূরা মুলক বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: রাতে পড়ার ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
"কোরআনে ত্রিশ আয়াতের একটি সূরা আছে, যা এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেছে, শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। সেটি হলো তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক।" হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি তিরমিজি ও আবু দাউদে আছে, ইমাম তিরমিজি একে হাসান বলেছেন। এ কারণেই সূরা মুলক মুসলমানদের রাতের নিয়মিত আমলের তালিকায় জায়গা পেয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সূরা মুলক কোরআনের ৬৭তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৩০টি। ২৯তম পারা এই সূরা দিয়েই শুরু, তাই এ পারাকে অনেকে "তাবারাকাল্লাজি পারা" বলেন। মুলক শব্দের অর্থ রাজত্ব বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব, যা প্রথম আয়াত থেকে নেওয়া।
তিরমিজির আরেক বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) সূরা সাজদা ও সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। তাই এশার পর বা ঘুমানোর আগে সূরাটি পড়া সুন্নাহসম্মত আমল।
প্রথম চার আয়াত: বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
বাংলা উচ্চারণ কেবল সহায়ক। আরবির সঠিক উচ্চারণের জন্য মূল মুসহাফ দেখে কোনো শিক্ষকের কাছে শিখে নেওয়া জরুরি।
বিজ্ঞাপন
আয়াত ১: তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলকু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।
অর্থ: বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব, আর তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
আয়াত ২: আল্লাজি খালাকাল মাওতা ওয়াল হায়াতা লিয়াবলুওয়াকুম আইয়ুকুম আহসানু আমালা, ওয়া হুওয়াল আজিজুল গাফুর।
অর্থ: যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য, কে তোমাদের মধ্যে কাজে সবচেয়ে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।
বিজ্ঞাপন
আয়াত ৩: আল্লাজি খালাকা সাবআ সামাওয়াতিন তিবাকা, মা তারা ফি খালকির রাহমানি মিন তাফাউত, ফারজিয়িল বাসারা হাল তারা মিন ফুতুর।
অর্থ: যিনি স্তরে স্তরে সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন। দয়াময়ের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসামঞ্জস্য দেখবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?
আয়াত ৪: সুম্মারজিয়িল বাসারা কাররাতাইনি ইয়ানকালিব ইলাইকাল বাসারু খাসিআও ওয়া হুওয়া হাসির।
অর্থ: তারপর বারবার দৃষ্টি ফেরাও, দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় আয়াতটি গোটা সূরার চাবি। জীবন ও মৃত্যু উদ্দেশ্যহীন নয়, দুটিই পরীক্ষার অংশ। আর লক্ষ করার বিষয়, পরীক্ষার মানদণ্ড "বেশি কাজ" নয়, বরং "উত্তম কাজ"।
সূরা মুলকের বিষয়বস্তু: ত্রিশ আয়াতে কী আছে
আকাশের নিখুঁত গঠন (আয়াত ১-৫): আসমানের নিখুঁত বিন্যাস এবং নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালা অর্থাৎ নক্ষত্র দিয়ে সাজানোর বর্ণনা।
জাহান্নামিদের স্বীকারোক্তি (আয়াত ৬-১১): জাহান্নাম ক্রোধে ফেটে পড়ার উপক্রম হবে। রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি? তারা স্বীকার করবে, এসেছিল, কিন্তু আমরা অস্বীকার করেছিলাম। ১০ নম্বর আয়াতে তাদের আফসোস: "ওয়া কালু লাও কুন্না নাসমাউ আও না'কিলু মা কুন্না ফি আসহাবিস সাইর", অর্থাৎ তারা বলবে, আমরা যদি শুনতাম বা বুদ্ধি খাটাতাম, তাহলে জ্বলন্ত আগুনের বাসিন্দা হতাম না।
বিজ্ঞাপন
গোপনে আল্লাহকে ভয় (আয়াত ১২-১৪): যারা না দেখে তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য ক্ষমা ও মহা পুরস্কার। ১৪ নম্বর আয়াতে প্রশ্ন: যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানবেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সব বিষয়ে অবগত।
পৃথিবী মানুষের জন্য অনুগত (আয়াত ১৫): জমিনকে তোমাদের জন্য সুগম করা হয়েছে, তোমরা এর পথে পথে চলো এবং তাঁর রিজিক খাও, আর তাঁর কাছেই পুনরুত্থান। জীবিকার সন্ধানে বের হওয়াকে এখানে আল্লাহর নির্দেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ও রিজিক কার হাতে (আয়াত ১৬-২২): আকাশে ডানা মেলে থাকা পাখিদের দয়াময় ছাড়া কেউ ধরে রাখেন না। তিনি রিজিক বন্ধ করে দিলে কে দেবে?
কৃতজ্ঞতা ও শেষ প্রশ্ন (আয়াত ২৩-৩০): আল্লাহ মানুষকে কান, চোখ ও অন্তর দিয়েছেন, অথচ মানুষ খুব কমই কৃতজ্ঞ। শেষ আয়াতে এক গভীর প্রশ্ন রাখা হয়েছে: "কুল আরাআইতুম ইন আসবাহা মাউকুম গাওরান ফামাই ইয়া'তিকুম বিমাইম মাইন", অর্থাৎ বলুন, ভেবে দেখেছ কি, তোমাদের পানি যদি মাটির গভীরে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদের প্রবহমান পানি এনে দেবে?
বিজ্ঞাপন
সূরা মুলকের ফজিলত ও কবরের আজাব থেকে মুক্তি
সুপারিশ ও ক্ষমা: শুরুতে উল্লেখ করা তিরমিজি ও আবু দাউদের হাদিসটি এ সূরার সবচেয়ে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য ফজিলত।
রাতের সুন্নাহ: মহানবী (সা.) ঘুমের আগে সূরা সাজদা ও সূরা মুলক পড়তেন বলে তিরমিজিতে হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
কবরের আজাব থেকে রক্ষা: তিরমিজির এক বর্ণনায় সূরা মুলককে কবরের আজাব থেকে "রক্ষাকারী" ও "মুক্তিদানকারী" বলা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকেও একই অর্থের বক্তব্য হাদিসের কিতাবে এসেছে, যে বর্ণনাকে অনেক মুহাদ্দিস গ্রহণযোগ্য বলেছেন। এসব বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের কিছু আলোচনা থাকলেও সুপারিশের হাদিসের সঙ্গে মিলিয়ে আলেমরা বলেন, নিয়মিত পাঠকারীর জন্য এ সূরা কবরে ও হাশরে উপকারী হবে, ইনশাআল্লাহ।
বিজ্ঞাপন
তবে এটি কোনো তাবিজ নয়। ফরজ নামাজ ছেড়ে, হারাম আয়ে চলে শুধু একটি সূরা পড়ে মুক্তির নিশ্চয়তা আশা করা কোরআনের শিক্ষার সঙ্গে মেলে না। আলেমরা বলেন, সূরাটির বিষয়বস্তু মেনে চলাই আসল সুরক্ষা।
সূরা মুলক থেকে জীবনের পাঁচ শিক্ষা
১. জীবন একটি পরীক্ষা: দ্বিতীয় আয়াত মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি দিন পরীক্ষার খাতার একটি পাতা। প্রশ্ন হলো কাজের মান কেমন, পরিমাণ নয়।
২. শোনা ও বোঝার দায়: জাহান্নামিদের আফসোস ছিল, তারা শোনেনি এবং বুদ্ধি খাটায়নি। সত্য কথা শুনে তা নিয়ে চিন্তা করা মানুষের দায়িত্ব।
বিজ্ঞাপন
৩. গোপনেও আল্লাহকে ভয়: যেখানে কেউ দেখছে না, সেখানেও যে আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য মহা পুরস্কারের ঘোষণা। অফিসের হিসাব থেকে ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহার পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে এ শিক্ষা প্রযোজ্য।
৪. রিজিকের জন্য বের হওয়া: পৃথিবীতে ঘুরে রিজিক খোঁজার কথা কোরআনই বলেছে। হালাল উপার্জনের চেষ্টা ইবাদতের অংশ।
৫. নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা: পানি, বাতাস, চোখ, কান, এমনকি আকাশে ভেসে থাকা পাখিও আল্লাহর দয়ার নিদর্শন। শেষ আয়াতের প্রশ্নটি প্রতিদিনের সাধারণ নেয়ামতকে নতুন করে দেখতে শেখায়।
রাতে পড়ার সহজ রুটিন
বিজ্ঞাপন
১. সময় ঠিক করুন: এশার নামাজের পরপর, অথবা বিছানায় যাওয়ার আগে। মহানবী (সা.)-এর আমল ঘুমের আগে, তাই রাতের যেকোনো সময়ই চলবে।
২. মুখস্থ করে নিন: ত্রিশ আয়াত মুখস্থ করা কঠিন নয়। প্রতিদিন দুই আয়াত করে মুখস্থ করলে মাস পার হওয়ার আগেই পুরো সূরা আয়ত্তে চলে আসবে। মুখস্থ থাকলে আলো নিভিয়েও পড়া যায়।
৩. অর্থের দিকে খেয়াল: সপ্তাহে অন্তত এক রাতে অনুবাদ দেখে পড়ুন, যাতে আয়াতগুলোর বার্তা মনে থাকে।
৪. পরিবারকে যুক্ত করুন: শিশুদের সঙ্গে প্রতিদিন কয়েক আয়াত করে পড়লে তারাও সহজে মুখস্থ করে ফেলে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সূরা মুলক দিনে পড়লে কি ফজিলত পাওয়া যাবে?
সুপারিশের হাদিসে নির্দিষ্ট সময়ের শর্ত নেই, তাই যেকোনো সময় পড়লেই তিলাওয়াতের সওয়াব ও সাধারণ ফজিলত পাওয়ার আশা করা যায়। তবে রাতে পড়া মহানবী (সা.)-এর নিয়মিত আমল।
মোবাইলে দেখে সূরা মুলক পড়তে কি ওজু লাগবে?
বিজ্ঞাপন
মোবাইলের পর্দায় দেখে পড়তে স্ক্রিন স্পর্শ না করলে ওজু শর্ত নয় বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন। তবে ওজু থাকলে উত্তম।
সূরা মুলক কয় রুকু?
উপমহাদেশে প্রচলিত মুসহাফে সূরা মুলক দুই রুকুতে বিভক্ত।
না বুঝে পড়লে কি লাভ হবে?
বিজ্ঞাপন
কোরআন তিলাওয়াতের প্রতিটি হরফে সওয়াব আছে, তাই না বুঝে পড়লেও সওয়াব পাওয়া যায়। তবে অর্থ জেনে পড়লে এর শিক্ষা জীবনে কাজে লাগে।