সূরা ইয়াসিন বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: বিষয়বস্তু ও পড়ার ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশে সূরা ইয়াসিন সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত সূরাগুলোর একটি। কারও মৃত্যুশয্যায়, মিলাদ বা দোয়ার মাহফিলে, কবর জিয়ারতে কিংবা শুক্রবার সকালে অনেকেই সূরাটি তিলাওয়াত করেন। অথচ এর ভেতরে কী বলা হয়েছে, তা অনেকেরই অজানা থেকে যায়।
বিজ্ঞাপন
সূরা ইয়াসিন কোরআনের ৩৬তম সূরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৮৩। সূরাটি শুরু হয়েছে ২২তম পারার শেষ অংশে এবং শেষ হয়েছে ২৩তম পারায়। নামটি এসেছে প্রথম আয়াতের দুটি বিচ্ছিন্ন হরফ "ইয়া" ও "সিন" থেকে, যেগুলোর প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন।
মাত্র পাঁচ পৃষ্ঠার এই সূরায় তিনটি বড় বিষয় ঘুরে ঘুরে এসেছে: মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের সত্যতা, প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা আল্লাহর নিদর্শন, আর মৃত্যুর পর আবার জীবিত হয়ে হিসাব দেওয়ার বাস্তবতা।
সূরা ইয়াসিনের প্রথম সাত আয়াত: উচ্চারণ ও অর্থ
পুরো সূরার বাংলা উচ্চারণ এক লেখায় দিলে ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে, আর বাংলা হরফে আরবির অনেক ধ্বনি ঠিকমতো আসে না। তাই এখানে শুরুর আয়াতগুলো দেওয়া হলো। পুরো সূরা শুদ্ধভাবে শিখতে কোনো কারি বা হাফেজের সাহায্য নিন এবং মূল আরবি মুসহাফ দেখে পড়ুন।
বিজ্ঞাপন
১. ইয়া-সিন: ইয়া-সিন। (বিচ্ছিন্ন হরফ, অর্থ আল্লাহ জানেন।)
২. ওয়াল কুরআনিল হাকিম: প্রজ্ঞাময় কোরআনের শপথ।
৩. ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন: নিশ্চয়ই আপনি রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত।
৪. আলা সিরাতিম মুসতাকিম: সরল-সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
বিজ্ঞাপন
৫. তানজিলাল আজিজির রাহিম: এটি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালুর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
৬. লিতুনজিরা কাওমাম মা উনজিরা আবাউহুম ফাহুম গাফিলুন: যাতে আপনি এমন এক জাতিকে সতর্ক করেন, যাদের পূর্বপুরুষদের সতর্ক করা হয়নি, ফলে তারা উদাসীন।
৭. লাকাদ হাক্কাল কাওলু আলা আকসারিহিম ফাহুম লা ইউ'মিনুন: তাদের অধিকাংশের ব্যাপারে বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তাই তারা ঈমান আনবে না।
সূরার শেষ আয়াতটিও অনেকের মুখস্থ: "ফাসুবহানাল্লাজি বিয়াদিহি মালাকুতু কুল্লি শাইয়িও ওয়া ইলাইহি তুরজাউন", অর্থাৎ পবিত্র তিনি, যাঁর হাতে সবকিছুর পূর্ণ কর্তৃত্ব, আর তাঁর কাছেই তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
সূরা ইয়াসিন অর্থসহ: বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ
রিসালাত ও সতর্কবাণী (আয়াত ১-১২): শুরুতে কোরআনের শপথ করে মহানবী (সা.)-এর নবুয়তের সত্যতা ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, উপদেশ কাজে আসে তার জন্য, যে উপদেশ মানে এবং না দেখেও দয়াময়কে ভয় করে। মানুষের প্রতিটি কাজ এবং রেখে যাওয়া প্রভাব লিখে রাখা হচ্ছে।
এক জনপদের ঘটনা (আয়াত ১৩-৩২): একটি জনপদে আল্লাহ প্রথমে দুজন রাসুল পাঠান, পরে তৃতীয়জনকে দিয়ে তাঁদের শক্তিশালী করেন। লোকেরা তাঁদের অস্বীকার করে, এমনকি অশুভ বলে অপবাদ দেয়। তখন শহরের দূর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ছুটে এসে বলেন, হে আমার জাতি, রাসুলদের অনুসরণ করো, তাঁরা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চান না। তাফসিরে তাঁর নাম হাবিব নাজ্জার বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। জাতির লোকেরা তাঁকে হত্যা করে। তাঁকে বলা হয়, জান্নাতে প্রবেশ করো। তখনো তিনি আফসোস করে বলেন, হায়, আমার জাতি যদি জানত, আমার রব আমাকে কীভাবে ক্ষমা করেছেন। নিজের হত্যাকারীদের প্রতিও তাঁর এই কল্যাণকামিতা সূরার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অংশ।
প্রকৃতিতে আল্লাহর নিদর্শন (আয়াত ৩৩-৪৪): মৃত জমিনে বৃষ্টি দিয়ে শস্য, খেজুর ও আঙুরের বাগান জন্মানো; সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি; রাত থেকে দিনকে সরিয়ে নেওয়া; সূর্যের নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলা; চাঁদের কলা বদলে শেষে খেজুরের পুরোনো শুকনো ডালের মতো সরু হয়ে যাওয়া। ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্যের সাধ্য নেই চাঁদকে ধরে ফেলে, রাতও দিনকে অতিক্রম করতে পারে না; প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে ভেসে চলে। এরপর বোঝাই করা নৌযানের কথা।
বিজ্ঞাপন
কিয়ামত ও পুনরুত্থান (আয়াত ৪৫-৫৪): শিঙায় ফুঁ দেওয়া হলে মানুষ কবর থেকে উঠে বলবে, হায়, কে আমাদের ঘুমের জায়গা থেকে উঠিয়ে আনল। জবাব আসবে, এটিই তো সেই প্রতিশ্রুতি, যা দয়াময় দিয়েছিলেন।
জান্নাতি ও অপরাধীদের পরিণতি (আয়াত ৫৫-৬৮): জান্নাতবাসীদের আনন্দ, তাদের প্রতি দয়ালু রবের পক্ষ থেকে "সালাম"। অপরাধীদের আলাদা করে দেওয়া হবে। ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সেদিন মুখে মোহর মেরে দেওয়া হবে, হাত কথা বলবে, পা সাক্ষ্য দেবে।
শেষ যুক্তি (আয়াত ৬৯-৮৩): কোরআন কবিতা নয়, উপদেশ। এক অবিশ্বাসী পচে যাওয়া হাড় হাতে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, এগুলোকে কে জীবিত করবে। উত্তর দেওয়া হয়েছে, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার জীবিত করবেন। ৮২ নম্বর আয়াতে আছে: "ইন্নামা আমরুহু ইজা আরাদা শাইআন আই ইয়াকুলা লাহু কুন ফাইয়াকুন", অর্থাৎ তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করলে শুধু বলেন "হও", আর তা হয়ে যায়।
সূরা ইয়াসিনের ফজিলত: কোনটি নির্ভরযোগ্য
বিজ্ঞাপন
সূরা ইয়াসিনের ফজিলত নিয়ে সমাজে অনেক কথা প্রচলিত। এখানে সতর্ক থাকা দরকার।
"প্রত্যেক জিনিসের একটি হৃদয় আছে, আর কোরআনের হৃদয় ইয়াসিন" এই বর্ণনাটি তিরমিজিতে আছে। তবে ইমাম তিরমিজি নিজেই একে গরিব বলেছেন এবং হাদিস বিশারদদের অনেকে এর সনদকে দুর্বল বলেছেন।
"তোমাদের মৃত্যুপথযাত্রীদের কাছে ইয়াসিন পড়ো" এই বর্ণনা আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহতে আছে। এর সনদ নিয়েও মুহাদ্দিসদের আপত্তি আছে। তবে মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে কোরআন তিলাওয়াত করা মূলত ভালো কাজ, তাই অনেক আলেম এ আমলকে বৈধ ও উত্তম বলেছেন।
নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লে নির্দিষ্ট মনোবাসনা পূরণ হবে, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞাপন
যা নিশ্চিত, তা হলো তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিস: কোরআনের একটি হরফ পড়লে একটি নেকি, আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ। সেই হিসাবে সূরা ইয়াসিনের মতো একটি সূরা তিলাওয়াতের সওয়াব বিপুল। পাশাপাশি অর্থ বুঝে পড়লে আখিরাতের স্মরণ ও ঈমানের দৃঢ়তা বাড়ে, যা এ সূরার মূল বার্তা।
কীভাবে নিয়মিত পড়বেন
সময়: যেকোনো সময় পড়া যায়। অনেকে ফজরের পর পড়েন, কারণ তখন মন সতেজ থাকে।
পরিমাণ ভাগ করে: পুরো সূরা একবারে কঠিন মনে হলে প্রতিদিন দশ-বারো আয়াত করে অর্থসহ পড়ুন। এক সপ্তাহে পুরো সূরার অর্থ জানা হয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
শুদ্ধতা: তাজবিদ না জেনে ভুল উচ্চারণে দ্রুত পড়ার চেয়ে ধীরে শুদ্ধ করে পড়া ভালো। মোবাইলে কোনো পরিচিত কারির তিলাওয়াত শুনে মিলিয়ে নিতে পারেন।
পবিত্রতা: মুসহাফ স্পর্শ করে পড়তে ওজু লাগবে। মুখস্থ পড়লে ওজু শর্ত নয়, তবে থাকলে উত্তম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সূরা ইয়াসিনে কতটি আয়াত ও কয়টি রুকু?
বিজ্ঞাপন
সূরা ইয়াসিনে ৮৩টি আয়াত। উপমহাদেশের মুসহাফে সূরাটি সাধারণত পাঁচ রুকুতে ভাগ করা থাকে।
মৃত ব্যক্তির জন্য সূরা ইয়াসিন পড়লে কি সওয়াব পৌঁছায়?
হানাফি আলেমদের মতে, কোরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করে পাঠানো যায়। তবে এর বিনিময়ে টাকা নিয়ে খতম পড়ানো নিয়ে আলেমদের আপত্তি আছে।
মেয়েরা কি ঋতুস্রাবের সময় সূরা ইয়াসিন পড়তে পারবেন?
বিজ্ঞাপন
হানাফি মতে এ সময় কোরআন তিলাওয়াত করা যায় না। তবে অন্য কারও তিলাওয়াত শোনা এবং দোয়া-জিকির করা যায়।
ইয়াসিন শব্দের অর্থ কী?
এটি কোরআনের বিচ্ছিন্ন হরফগুলোর একটি। কোনো কোনো তাফসিরকারক একে "হে মানুষ" অর্থে বা মহানবী (সা.)-এর সম্বোধন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এ বিষয়ে মহানবী (সা.) থেকে নিশ্চিত কোনো বর্ণনা নেই, তাই প্রকৃত অর্থ আল্লাহই ভালো জানেন।