মাহিন খান: কারও সঙ্গে যুদ্ধ নয়, নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে এগোতে হবে
নিজেদের ঐতিহ্যের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমেই এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন মাহীন খান
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্প এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ডিজাইনাররা তাদের কাজ তুলে ধরছেন। এই শিল্পের বর্তমান প্রেক্ষাপট, বড় বিনিয়োগের প্রভাব, তাঁত ও কারুশিল্পের ভবিষ্যৎ এবং জামদানির গুরুত্ব নিয়ে ডিজাইনার মাহীন খানের সঙ্গে কথা বলেছেন হুমায়রা মেহজাবীন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির অগ্রগতি সম্পর্কে মাহীন খান বলেন, 'বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অনেকখানি উন্নত হয়েছে। নতুন মানুষ নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তবে একটি বড় সমস্যা এখনো রয়েছে—পুঁজি। ব্যবসা শুরু করা এবং দীর্ঘ সময় চালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।' তিনি আরও জানান, করোনার সময় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সবাই বড় ধাক্কা খেয়েছিল, অনেকের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নতুন উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের ফ্যাশনকে পুনরায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
বড় বিনিয়োগের প্রভাব নিয়ে মাহীন খান বলেন, 'বড় পোশাক কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন দেশীয় খুচরা বাজারে বড় বিনিয়োগ করছে। বড় পরিসরে দোকান ও বাজার তৈরি হচ্ছে। তবে এর মধ্যে আমাদের কিছু দেশীয় কারুশিল্প আঘাত পাচ্ছে।' তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, তাঁত, নকশিকাঁথা ও হাতের তৈরি কাজ ছোট উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে রেখেছেন এবং গবেষণা করে দেশীয় কারুশিল্পকে নতুনভাবে কাজে লাগান। কিন্তু বড় বাজারে দ্রুত উৎপাদনের প্রয়োজন হয়, যেখানে মেশিন ও ডিজিটাল সূচিশিল্পের মাধ্যমে দ্রুত উৎপাদন সম্ভব। এটি মূলত দ্রুতগতির ফ্যাশনের বাজার হওয়ায় ছোট পরিসরে গবেষণামূলক ও হাতে তৈরি কাজকে টিকিয়ে রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
দেশীয় কারুশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার উপায় সম্পর্কে মাহীন খান জানান, শুধু ভালো নকশা থাকলেই হবে না, বরং উৎপাদন, মান, নকশা ও বিপণন—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'উৎপাদন কোথায় হবে, কারা তৈরি করবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ কেমন হবে—প্রতিটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অনেক নারী নিজের বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারেন। এ ধরনের আরও উদ্যোগ হলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে, পাশাপাশি আমাদের কারুশিল্পও শক্তিশালী হবে।'
জামদানি ও দেশীয় ঐতিহ্য নিয়ে মাহীন খান বলেন, 'জিআই বা ভৌগোলিক পরিচয়ের বিষয়টি বুঝতে হবে। একটি শিল্পের সঙ্গে তার ভৌগোলিক পরিচয়ের সম্পর্ক রয়েছে। রাজস্থান, কাঞ্জিপুরাম বা কাশ্মীর—প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। আমাদেরও রয়েছে। আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে অনেক সময় টানাটানি হয়। যেমন জামদানি। এটি শুধু একটি কাপড় নয়, আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। তাই নিজের ঐতিহ্যকে রক্ষা ও সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে।'
বিজ্ঞাপন
নিজের কাজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'পুরোনো বাংলার কাঁথার মধ্যে আমাদের ইতিহাস রয়েছে। উনিশ ও বিশ শতকের পুরোনো কয়েকটি কাঁথার নকশা নিয়ে আমি কাজ করেছি, সেগুলোকে নতুনভাবে পুনরুজীবিত করার চেষ্টা করেছি।' খুলনা, ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কারুশিল্পের নিজস্ব পরিচয় রয়েছে এবং এই ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নিজেদেরই জানতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাঙালির পোশাকের নিজস্বতা নিয়ে মাহীন খান বলেন, 'পোশাক ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। বিশ্ব এখন অনেক কাছাকাছি এসেছে। বিভিন্ন অঞ্চলের ফ্যাশন ও রুচির মধ্যে মিশ্রণ তৈরি হচ্ছে। তবে একটি ভালো আর অন্যটি খারাপ—এভাবে দেখি না। কিন্তু নিজের ঐতিহ্য ও নিজস্বতাকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আমরা বাঙালি, আমাদের রুচির একটি নিজস্বতা আছে। সুতি কাপড়, হালকা রং ও আরামদায়ক পোশাক আমাদের জীবনযাপন ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে যায়।'
বাংলাদেশের ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে মাহীন খান বলেন, 'শুধু অন্য দেশের পণ্য বন্ধ করলেই হবে না। আমাদের নিজেদের পণ্যকে এমন ভালো করতে হবে, যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার মূল্য বুঝতে পারে। ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস না করে তাকে আধুনিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেই বাংলাদেশের ফ্যাশন আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে।' তিনি আরও বলেন, 'আমাদের কারও সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। আমাদের যা আছে, সেটিকেই আরও সুন্দরভাবে উন্নত করতে হবে। ভালো নকশা, উৎপাদন, মান ও সঠিক বিপণনের সমন্বয় দরকার।'