চিকেন বিরিয়ানি রেসিপি: ঝরঝরে চাল আর নরম মাংসের সহজ পদ্ধতি
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঈদ, জন্মদিন বা ছুটির দিনের দুপুর, বিরিয়ানি ছাড়া যেন উৎসব জমে না। অথচ অনেকে ঘরে বিরিয়ানি রাঁধতে ভয় পান: চাল গলে যাবে, নাকি মাংস শক্ত থাকবে, নাকি নিচে পুড়ে যাবে। আসলে চিকেন বিরিয়ানি রেসিপি কঠিন নয়, শুধু কয়েকটি ধাপ সঠিক ক্রমে আর ধৈর্য নিয়ে করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
পুরো পদ্ধতি সংক্ষেপে: মুরগি টক দই, আদা-রসুন আর বিরিয়ানি মসলায় মেখে রাখুন, বাসমতী চাল ভিজিয়ে গরম মসলা দেওয়া লবণ-পানিতে প্রায় সত্তর ভাগ সেদ্ধ করুন, মুরগি মসলায় কষিয়ে আধা রান্না করুন, তারপর হাঁড়িতে মাংস আর চাল স্তরে স্তরে সাজিয়ে ওপরে ঘি, বেরেস্তা, জাফরান-দুধ দিয়ে ঢাকনা আটকে খুব কম আঁচে দমে রাখুন।
নিচের পরিমাণে পাঁচ থেকে ছয়জনের জন্য বিরিয়ানি হবে। রান্নায় সব মিলিয়ে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে, যার বড় অংশ মেরিনেট আর দমের অপেক্ষা।
মুরগির বিরিয়ানির উপকরণ
মুরগির জন্য: মুরগি এক কেজি (মাঝারি টুকরা), টক দই এক কাপ, আদাবাটা দেড় টেবিল-চামচ, রসুনবাটা এক টেবিল-চামচ, মরিচের গুঁড়া এক থেকে দেড় চা-চামচ, বিরিয়ানি মসলা দুই চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, বেরেস্তা আধা কাপ, তেল আধা কাপ।
বিজ্ঞাপন
চালের জন্য: বাসমতী চাল ৫০০ গ্রাম, এলাচ চারটি, দারুচিনি দুই টুকরা, লবঙ্গ চারটি, তেজপাতা দুটি, লবণ দুই টেবিল-চামচ (পানির জন্য), পানি তিন থেকে চার লিটার।
দমের জন্য: ঘি তিন টেবিল-চামচ, বেরেস্তা আধা কাপ, গরম দুধ চার টেবিল-চামচ, সামান্য জাফরান বা কয়েক ফোঁটা জর্দার রং, কেওড়া জল এক চা-চামচ, গোলাপজল এক চা-চামচ, কাঁচা মরিচ পাঁচ-ছয়টি, আলুবোখারা পাঁচ-ছয়টি (ঐচ্ছিক)।
ঢাকার বিরিয়ানিতে আলু অনেকের প্রিয়। চাইলে দুটি বড় আলু চার টুকরা করে লবণ-হলুদ মেখে হালকা ভেজে নিন এবং মাংসের সঙ্গে দিন।
বিরিয়ানি মসলা তৈরি
বিজ্ঞাপন
দোকানের প্যাকেট মসলাও চলে, তবে ঘরে বানালে ঘ্রাণ আলাদা। শুকনো কড়াইয়ে কম আঁচে নিচের মসলাগুলো দুই-তিন মিনিট নেড়ে টেলে নিন, ঠান্ডা করে মিহি গুঁড়া করুন।
সবুজ এলাচ আটটি, বড় এলাচ একটি, দারুচিনি দুই ইঞ্চি, লবঙ্গ ছয়টি, গোলমরিচ এক চা-চামচ, শাহি জিরা এক চা-চামচ, জয়ত্রী অল্প এক চিমটি, জায়ফল এক চিমটি গ্রেট করা, তেজপাতা একটি, চাইলে একটি তারা মৌরি।
এই পরিমাণে দুই-তিনবারের বিরিয়ানি হয়ে যাবে। মুখবন্ধ কাচের বয়ামে রাখলে কয়েক সপ্তাহ ঘ্রাণ ভালো থাকে। জায়ফল-জয়ত্রী বেশি দিলে মসলা তেতো লাগে, তাই পরিমাণ মেপে দিন।
মুরগি মেরিনেট ও রান্না
বিজ্ঞাপন
১. মেরিনেট: মুরগি ধুয়ে পানি ঝরিয়ে দই, আদা-রসুনবাটা, মরিচের গুঁড়া, বিরিয়ানি মসলা, লবণ আর আধা কাপ বেরেস্তা গুঁড়া করে মেখে নিন। অন্তত এক ঘণ্টা, সময় থাকলে ফ্রিজে কয়েক ঘণ্টা রাখুন। দই মাংস নরম করে।
২. কষানো: ভারী তলার হাঁড়িতে তেল গরম করে মেরিনেট করা মুরগি দিন। মাঝারি আঁচে ঢেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট রান্না করুন, মাঝে মাঝে নেড়ে দিন। তেল ওপরে ভেসে উঠলে আর মাংস প্রায় সেদ্ধ হলে চুলা বন্ধ করুন। ঝোল খুব পাতলা হলে কিছুক্ষণ ঢাকনা খুলে শুকিয়ে নিন; ঘন মাখা মাখা ঝোলই বিরিয়ানির জন্য ঠিক।
চাল আধা সেদ্ধ করার নিয়ম
ঝরঝরে বিরিয়ানির রহস্য এখানেই। বাসমতী চাল কয়েক পানিতে আলতো করে ধুয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। বড় হাঁড়িতে পানি ফুটিয়ে গরম মসলা আর লবণ দিন। পানি একটু বেশি নোনতা লাগবে, কারণ এই লবণই চালে ঢুকবে।
বিজ্ঞাপন
ভেজানো চাল ঝরিয়ে ফুটন্ত পানিতে দিন। পাঁচ থেকে ছয় মিনিট পর একটি দানা আঙুলে টিপে দেখুন: বাইরে নরম, ভেতরে সামান্য শক্ত দানা থাকলে বুঝবেন প্রায় সত্তর ভাগ সেদ্ধ হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে চালুনিতে মাড় ঝরিয়ে নিন। দেরি করলে চাল দমে গিয়ে গলে যাবে।
স্তর সাজানো আর দম দেওয়া
১. প্রথম স্তর: রান্না করা মুরগির হাঁড়িতেই মাংস সমান করে বিছিয়ে দিন। আলু দিলে মাংসের ফাঁকে বসিয়ে দিন।
২. চালের স্তর: আধা সেদ্ধ চালের অর্ধেক মাংসের ওপর আলতো করে ছড়িয়ে দিন, চেপে দেবেন না। ওপরে কিছু বেরেস্তা, কাঁচা মরিচ আর আলুবোখারা দিন। তারপর বাকি চাল দিয়ে ঢেকে দিন।
বিজ্ঞাপন
৩. সুগন্ধ: গরম দুধে জাফরান ভিজিয়ে চালের ওপর জায়গায় জায়গায় ছিটিয়ে দিন। কেওড়া জল, গোলাপজল আর গলানো ঘি ছড়িয়ে দিন, বাকি বেরেস্তা ওপরে দিন।
৪. দম: হাঁড়ির মুখ ফয়েল বা ময়দার খামির দিয়ে আটকে শক্ত করে ঢাকনা দিন। প্রথম পাঁচ মিনিট মাঝারি আঁচে রাখুন, যাতে ভেতরে ভাপ তৈরি হয়। এরপর চুলার ওপর একটি তাওয়া বসিয়ে তার ওপর হাঁড়ি রেখে সবচেয়ে কম আঁচে ২০ থেকে ২৫ মিনিট দমে রাখুন। তাওয়া থাকায় তলা পুড়বে না।
৫. বিশ্রাম: চুলা বন্ধ করে আরও দশ মিনিট ঢাকনা না খুলে রেখে দিন। তারপর বড় চামচ দিয়ে হাঁড়ির কিনারা থেকে নিচ পর্যন্ত তুলে পরিবেশন করুন, যাতে প্রতিটি প্লেটে চাল আর মাংস দুটোই ওঠে।
যে ভুলে বিরিয়ানি নষ্ট হয়
বিজ্ঞাপন
চাল বেশি সেদ্ধ করা সবচেয়ে সাধারণ ভুল। আধা সেদ্ধ চাল দমে গিয়েই বাকিটা সেদ্ধ হবে, তাই আগেই নরম করবেন না। মাংসের ঝোল বেশি পাতলা থাকলে নিচের চাল ভিজে গলে যায়, আবার একেবারে শুকনো হলে দমের সময় ভাপ হয় না, ওপরের চাল শক্ত থাকে। লবণ চেখে নিন দুই জায়গায়, মাংসে আর চালের পানিতে।
দম চলাকালে বারবার ঢাকনা খুলবেন না। ভাপ বেরিয়ে গেলে চাল সমানভাবে সেদ্ধ হয় না। বেরেস্তা বানানোর সময় পেঁয়াজ পাতলা করে কেটে মাঝারি আঁচে বাদামি করুন; কালো হয়ে গেলে তেতো স্বাদ পুরো বিরিয়ানিতে ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবেশনের সময় সঙ্গে শসা-পেঁয়াজের সালাদ, বোরহানি বা টক দইয়ের রায়তা আর সেদ্ধ ডিম দিতে পারেন। বেঁচে যাওয়া বিরিয়ানি ঠান্ডা হলে ফ্রিজে রাখুন এবং এক-দুই দিনের মধ্যে ভালো করে গরম করে খান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
বাসমতীর বদলে চিনিগুঁড়া চাল দিয়ে কি বিরিয়ানি হয়?
হয়, তবে স্বাদ আর ধরন আলাদা হবে। চিনিগুঁড়া চাল ছোট ও দ্রুত সেদ্ধ হয়, তাই আধা সেদ্ধ করতে সময় কম লাগবে এবং দমের সময়ও কিছুটা কমাতে হবে।
দই ছাড়া মেরিনেট করা যায়?
যায়। দইয়ের বদলে এক টেবিল-চামচ লেবুর রস দিতে পারেন। তবে দই মাংস নরম রাখে এবং মসলা ভালোভাবে লেগে থাকে, তাই সম্ভব হলে দই ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
প্রেশার কুকারে বিরিয়ানি করা যায় কি?
তাড়াহুড়োয় করা যায়, কিন্তু চাল ঝরঝরে রাখা কঠিন। দমের পদ্ধতিতেই আসল বিরিয়ানির স্বাদ ও গড়ন আসে।
বিরিয়ানির রং কীভাবে আনব?
দুধে ভেজানো জাফরান সবচেয়ে ভালো। না থাকলে খুব অল্প জর্দার রং দুধে গুলে ছিটিয়ে দিন। পুরো চাল রঙিন না করে জায়গায় জায়গায় দিলে দেখতে সুন্দর লাগে।
বিজ্ঞাপন
বেরেস্তা কি আগে থেকে বানিয়ে রাখা যায়?
যায়। পেঁয়াজ পাতলা করে কেটে মাঝারি আঁচে বাদামি করে ভেজে টিস্যুতে তেল ঝরিয়ে নিন। পুরোপুরি ঠান্ডা হলে মুখবন্ধ বয়ামে রাখুন। কয়েক দিন মচমচে থাকে, আর বিরিয়ানি রান্নার দিন অনেকটা সময় বাঁচে। বেরেস্তা ভাজা তেলটিও ফেলে দেবেন না, মুরগি কষানোর সময় ব্যবহার করলে স্বাদ বাড়ে।