পুরুষদেরও মাসিক চক্র দেখা যায়
বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুরুষের রক্তপাত কোনো পিরিয়ড নয়, তবে টেস্টোস্টেরনের ওঠানামা মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে
লাইফস্টাইল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
ইন্টারনেট এবং সামাজিক মিডিয়ায় ‘পুরুষদেরও পিরিয়ড হয়?’ প্রশ্নটি সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। অনেক পুরুষই কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই তীব্র মেজাজের পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মানসিক অস্থিরতা অনুভব করেন, যা নারীদের পিরিয়ডের আগে দেখা যায় এমন ‘পিএমএস’ লক্ষণগুলোর সঙ্গে প্রায় সমান।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, যদিও পুরুষদের রক্তস্রাব হয় না, তবু তাদের শরীরে হরমোনের নিয়মিত চক্রাকার ওঠানামা চলে, যা মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে। স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হরমোন ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এই চক্রের প্রকৃতি ও এর প্রভাব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
ড. জেড ডায়মন্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মনোচিকিৎসক ও লেখক, তার গবেষণামূলক বইতে প্রথমবার ‘ইরিটেবল মেল সিন্ড্রোম’ (আইএমএস) শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি ভেড়ার ওপর করা এক জৈবিক পরীক্ষার ভিত্তিতে বলেন যে পুরুষের শরীরেও হরমোনের কিছু চক্র কাজ করে, যা আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন আনে।
ড. জেড ডায়মন্ডের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, “নারীদের মতো পুরুষদের শরীরে হরমোনের এমন কিছু চক্র কাজ করে, যা তাদের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন আনে।”
অনেকেই এই অবস্থাকে ‘ম্যান-স্ট্রুয়েশন’ বা ‘পুরুষের পিরিয়ড’ নামে উল্লেখ করেন, যদিও তা কোনো বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নয়।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন সেক্স থেরাপিস্ট ও নিবন্ধিত সমাজকর্মী ড. জ্যানেট ব্রিটো স্পষ্ট করে বলেন, “চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠোর সংজ্ঞায় পুরুষদের পিরিয়ড হওয়া অসম্ভব। নারীদের পিরিয়ড হয় গর্ভধারণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ডিম্বাণু উৎপাদন এবং তা সফল না হলে জরায়ুর আস্তরণ ছিঁড়ে রক্ত আকারে বের হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। পুরুষদের শরীরে জরায়ু বা ডিম্বাণু তৈরির কোনও ব্যবস্থা নেই, তাই রক্তপাতের কোনও সুযোগও নেই।” তিনি আরও যোগ করেন যে পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা অনবরত পরিবর্তিত হয়, যা তাদের মেজাজকে ‘পিএমএস’‑এর মতো খিটখিটে করে তুলতে পারে।
ড. ব্রিটোর মতে, একটি সুস্থ পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওঠানামা করে। সাধারণত সকালের দিকে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সর্বোচ্চ থাকে, আর সন্ধ্যার দিকে স্বাভাবিকভাবে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে। এই দৈনিক ও মাসিক চক্রের ফলে পুরুষের মেজাজ ও শক্তির পরিবর্তন ঘটে।
আইএমএস বা হরমোনজনিত অস্থিরতার লক্ষণগুলোতে তীব্র ক্লান্তি ও অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি, হঠাৎ রাগ বা খিটখিটে মেজাজ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, লিবিডোর হ্রাস, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা ও হঠাৎ কেঁদে ফেলার প্রবণতা অন্তর্ভুক্ত।
হরমোনের ওঠানামার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে। পুরুষের বয়স ৩০ বছর পার করার পর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবে কমতে শুরু করে, যা ‘অ্যান্ডোপজ’ বা পুরুষের মেনোপজ নামে পরিচিত। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, ওজন বৃদ্ধি ও ত্রুটিপূর্ণ ডায়েটও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ঘটাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ড. জ্যানেট ব্রিটো একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেন, “অনেক সময় পুরুষেরা তাদের প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত দেখতে পেলে সেটিকে অবহেলা করে ‘মেল পিরিয়ড’ বলে কৌতুক করেন। তবে পুরুষের গোপনাঙ্গ দিয়ে যেকোনও ধরণের রক্তপাত বিপজ্জনক এবং এটি কোনও পিরিয়ড নয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন যে এ ধরনের রক্তপাত পারোস্টেটের সমস্যা, পরজীবী সংক্রমণ বা মূত্রনালীর গুরুতর ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে এবং দ্রুতই ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যদি হরমোনের সাধারণ ওঠানামার কারণে মেজাজে পরিবর্তন ঘটে, তবে নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন, এবং মানসিক চাপ কমিয়ে শরীরকে শান্ত রাখা সম্ভব। তবে হরমোনের অতিরিক্ত হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা বা উদ্বেগ দেখা দিলে রক্তের হরমোন পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনে টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) নেওয়া যেতে পারে।