সূরা ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: নামাজে কেন প্রতিবার পড়তে হয়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
একজন মুসলমান দিনে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ পড়লে শুধু ফরজেই অন্তত সতেরোবার সূরা ফাতিহা পড়েন। সুন্নত-নফল মিলিয়ে সংখ্যাটা আরও বেশি। কোরআনের আর কোনো সূরা এতবার পড়া হয় না। অথচ এই সাত আয়াতের অর্থ অনেকেই ভালো করে জানেন না।
বিজ্ঞাপন
সূরা ফাতিহা কোরআনের প্রথম সূরা। ফাতিহা অর্থ সূচনা বা উদ্বোধনী। মুসহাফ খুললে প্রথমেই এই সূরা, নামাজ শুরু হয় এটি দিয়ে, তাই এই নাম। অধিকাংশ আলেমের মতে এটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা সাত।
কেন প্রতি রাকাতে পড়তে হয়, তার উত্তর এক হাদিসেই আছে। বুখারি ও মুসলিমে হজরত উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার নামাজ হয় না। পুরো কোরআনের সারকথা, আল্লাহর পরিচয়, ইবাদতের অঙ্গীকার আর সঠিক পথের প্রার্থনা, সবই এই ছোট্ট সূরায় একসঙ্গে আছে।
সূরা ফাতিহা আরবি
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
বিজ্ঞাপন
সূরা ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
১. বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে।
২. আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের রব।
৩. আর রাহমানির রাহিম: যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।
বিজ্ঞাপন
৪. মালিকি ইয়াওমিদ্দিন: যিনি বিচার দিবসের মালিক।
৫. ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন: আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য চাই।
৬. ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম: আমাদের সরল-সঠিক পথ দেখাও।
৭. সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দাল্লিন: তাদের পথ, যাদের তুমি অনুগ্রহ করেছ; তাদের পথ নয়, যারা ক্রোধের শিকার হয়েছে, আর তাদের পথও নয়, যারা পথভ্রষ্ট।
বিজ্ঞাপন
বিসমিল্লাহ সূরা ফাতিহার আয়াত কি না, এ নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। আমাদের দেশে প্রচলিত মুসহাফে বিসমিল্লাহকে প্রথম আয়াত ধরে গোনা হয়েছে, ওপরের তালিকাও সেভাবে সাজানো। যাঁরা বিসমিল্লাহকে ফাতিহার অংশ মনে করেন না, তাঁরা "আনআমতা আলাইহিম" পর্যন্ত এক আয়াত এবং "গাইরিল মাগদুবি" থেকে শেষ পর্যন্ত আরেক আয়াত ধরে সাত আয়াত গোনেন। হানাফি মতে বিসমিল্লাহ কোরআনের একটি স্বতন্ত্র আয়াত, যা সূরাগুলোর মাঝে পার্থক্যের জন্য নাজিল হয়েছে; তাই নামাজে এটি নিচু স্বরে পড়া হয়। শাফেয়ি মতে এটি ফাতিহারই প্রথম আয়াত। গণনার পার্থক্য থাকলেও সূরার শব্দে কোনো পার্থক্য নেই।
বাংলা হরফে "দোয়াদ", "আইন", দুই রকম "হা" ইত্যাদি আরবি ধ্বনি আলাদা করে লেখা যায় না। নামাজে ভুল উচ্চারণে কখনো অর্থ বদলে যেতে পারে, তাই সূরা ফাতিহা অবশ্যই কোনো কারি বা ইমামের কাছে শুনে শুদ্ধ করে নিন।
আল্লাহ ও বান্দার কথোপকথন
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, আমি নামাজকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগ করেছি, আর আমার বান্দা যা চায় তা পাবে।
বিজ্ঞাপন
বান্দা যখন বলে "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন", আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল। যখন বলে "আর রাহমানির রাহিম", আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করল। যখন বলে "মালিকি ইয়াওমিদ্দিন", আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মর্যাদা ঘোষণা করল। যখন বলে "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন", আল্লাহ বলেন, এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে, আর বান্দা যা চাইবে তা পাবে। আর শেষ আয়াতগুলো পড়লে আল্লাহ বলেন, এটি আমার বান্দার জন্য, সে যা চেয়েছে তা পাবে।
এই হাদিস জানার পর নামাজে ফাতিহা পড়ার অনুভূতি বদলে যায়। প্রতিটি আয়াতের পর মনে মনে একটু থামলে মনে হয়, কেউ উত্তর দিচ্ছেন।
নামাজে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান
হানাফি মত: নামাজে কোরআনের যেকোনো অংশ পড়া ফরজ, আর ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে এবং সুন্নত, নফল ও বিতরের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। ভুলে ছুটে গেলে সাহু সিজদা দিতে হয়। ফরজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতেও ফাতিহা পড়াই উত্তম ও প্রচলিত।
বিজ্ঞাপন
অন্য মাজহাব: শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে সূরা ফাতিহা নামাজের রুকন, অর্থাৎ এটি ছাড়া নামাজ হয় না।
ইমামের পেছনে: হানাফি মাজহাবে মুক্তাদি ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়েন না, চুপ থেকে শোনেন। তাঁদের দলিল সূরা আরাফের ২০৪ নম্বর আয়াত, যেখানে কোরআন পড়া হলে মনোযোগ দিয়ে শুনতে ও চুপ থাকতে বলা হয়েছে, এবং এ বিষয়ের কিছু হাদিস। শাফেয়ি মাজহাবে মুক্তাদিকেও পড়তে হয়। এটি সাহাবিদের যুগ থেকে চলে আসা মতভেদ, এ নিয়ে বিবাদের কিছু নেই।
আমিন বলা: ফাতিহা শেষে "আমিন" বলা সুন্নাহ। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, যার আমিন ফেরেশতাদের আমিনের সঙ্গে মিলে যায়, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। হানাফি মতে আমিন নিচু স্বরে বলা হয়।
সূরা ফাতিহার নাম ও ফজিলত
বিজ্ঞাপন
এই সূরার একাধিক নাম আছে, যা এর মর্যাদার প্রমাণ। হাদিসে একে উম্মুল কিতাব (কিতাবের মূল) ও উম্মুল কোরআন বলা হয়েছে। সূরা হিজরের ৮৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত "সাবউল মাসানি", অর্থাৎ বারবার পঠিত সাত আয়াত বলতে এই সূরাকেই বোঝানো হয়েছে বলে হাদিসে এসেছে। এ ছাড়া আল-হামদ, আস-সালাত, আর-রুকইয়াহ নামেও একে ডাকা হয়।
কোরআনের মহান সূরা: সহিহ বুখারিতে আবু সাঈদ ইবনুল মুআল্লা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) তাঁকে বলেছিলেন, আমি কি তোমাকে কোরআনের সবচেয়ে মহান সূরাটি শিখিয়ে দেব না? তারপর বললেন, তা হলো "আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন"; এটিই সাবউল মাসানি এবং মহান কোরআন, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে।
রুকইয়া হিসেবে: বুখারিতে বর্ণিত, একদল সাহাবি সফরে এক গোত্রপ্রধানকে বিচ্ছু দংশনের পর সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়েছিলেন, এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। মহানবী (সা.) জেনে তা অনুমোদন করেন। তাই অসুস্থতায় চিকিৎসার পাশাপাশি সূরা ফাতিহা পড়ে দোয়া করা সুন্নাহসম্মত।
সূরাটির মূল শিক্ষা
বিজ্ঞাপন
প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহর পরিচয়: তিনি সব প্রশংসার মালিক, সব জগতের প্রতিপালক, দয়াময়। চতুর্থ আয়াতে আখিরাতের বিশ্বাস: বিচার দিবসের একক মালিক তিনি। পঞ্চম আয়াতে বান্দার অঙ্গীকার: ইবাদত ও সাহায্য চাওয়া কেবল তাঁরই কাছে। শেষ দুই আয়াতে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা: সঠিক পথের হেদায়েত।
লক্ষ করার বিষয়, বান্দা এখানে নিজের জন্য সম্পদ বা দুনিয়ার কিছু চায়নি, চেয়েছে সঠিক পথ। কারণ সঠিক পথ পেলে বাকি সবকিছু ঠিক জায়গায় আসে। আর প্রার্থনাটি বহুবচনে, "আমাদের" পথ দেখাও। নামাজে প্রতিবার একজন মুসলমান পুরো উম্মাহর জন্য দোয়া করেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নামাজে সূরা ফাতিহা ভুলে গেলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
হানাফি মতে ফাতিহা ওয়াজিব। কোনো রাকাতে ভুলে বাদ পড়লে শেষ বৈঠকে সাহু সিজদা দিলে নামাজ শুদ্ধ হবে।
সূরা ফাতিহা পড়ে মৃতের জন্য দোয়া করা যায়?
কোরআন তিলাওয়াত করে মৃতের জন্য সওয়াব পাঠানোর দোয়া করা হানাফি আলেমদের মতে বৈধ। সূরা ফাতিহাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সূরা ফাতিহার পর আমিন কি জোরে বলতে হয়?
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে নিচু স্বরে বলা হয়। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে জোরে নামাজে উচ্চ স্বরে বলা হয়। উভয় মতের পক্ষে দলিল আছে।
শিশুকে প্রথমে কোন সূরা শেখাব?
নামাজের জন্য সূরা ফাতিহা অপরিহার্য, তাই সাধারণত এটিই প্রথমে শেখানো হয়। শিশুকে শব্দে শব্দে অর্থসহ শেখালে বুঝে পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে।