খৈয়াছড়া ঝরনা: যাওয়ার পথ, সেরা সময়, খরচ ও সাবধানতা
ট্রাভেল ডেস্ক · চট্টগ্রাম
প্রকাশ:
খৈয়াছড়ার আসল সৌন্দর্য একটি ঝরনায় নয়, ধাপে ধাপে নেমে আসা অনেকগুলো স্তরে। নিচের প্রথম ধাপের সামনে দাঁড়িয়েই অনেকে মুগ্ধ হয়ে যান, অথচ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠলে একের পর এক নতুন ধাপ, নতুন কুণ্ড। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত হিসাবে এর মূল ধাপ নয়টি। এ কারণেই দেশের ঝরনাপ্রেমীদের কাছে খৈয়াছড়া অন্যতম প্রিয় নাম।
বিজ্ঞাপন
খৈয়াছড়া ঝরনা কোথায় অবস্থিত, এর উত্তর চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নে, বারৈয়াঢালা পাহাড়ি বনাঞ্চলের ভেতরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে খুব দূরে নয়, তাই ঢাকা থেকে এক দিনেই ঘুরে আসা যায়। এ কারণেই ছুটির দিনে এখানে অনেক ভিড় হয়।
তবে সহজে পৌঁছানো যায় বলে ঝুঁকিটা হালকা ভাবার সুযোগ নেই। ঝরনার পাথর পিচ্ছিল, ওপরের ধাপগুলো খাড়া। প্রতিবছর এখানে কিছু মানুষ আহত হন, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। নিচের পরামর্শগুলো তাই মন দিয়ে পড়ুন।
খৈয়াছড়া ঝরনা যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে মহাসড়কে নামা: সায়েদাবাদ, আরামবাগ বা কলাবাগান থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজারে নামুন। সুপারভাইজারকে আগেই বলে রাখুন। ঢাকা থেকে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে, যানজটভেদে বেশি। ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের পুরো ভাড়ার কাছাকাছি নেওয়া হয়, নন-এসিতে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. চট্টগ্রাম থেকে: অলংকার বা এ কে খান মোড় থেকে ঢাকামুখী বা মিরসরাইগামী লোকাল বাসে বড়তাকিয়ায় নামা যায়, দেড় ঘণ্টার মতো লাগে।
৩. ট্রেনে: মিরসরাই এলাকার কিছু স্টেশনে লোকাল বা মেইল ট্রেন থামে, তবে সময়সূচি সীমিত। বেশির ভাগ পর্যটক বাসই বেছে নেন।
৪. মহাসড়ক থেকে ট্রেইলের মুখে: বড়তাকিয়া বাজার থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় ঝরনার দিকে যাওয়ার গ্রামের রাস্তা ধরে যতটা যাওয়া যায়, ততটা যান। সেখান থেকে হাঁটা শুরু। চাইলে মহাসড়ক থেকেই হেঁটে যাওয়া যায়, তবে বাড়তি সময় লাগে।
হাঁটার পথ কেমন
বিজ্ঞাপন
ট্রেইলের প্রথম অংশ গ্রামের মেঠোপথ আর ধানখেতের আল, তারপর রেললাইন পার হয়ে পাহাড়ের দিকে এগোনো। এরপর ঝিরিপথ, অর্থাৎ পাহাড়ি ছড়ার ভেতর দিয়ে পাথর আর পানি মাড়িয়ে হাঁটা। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি পর্যন্ত হতে পারে, বিশেষ করে বর্ষায়। সাধারণ গতিতে ট্রেইলের মুখ থেকে প্রথম ধাপে পৌঁছাতে মোটামুটি এক ঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে।
প্রথম ধাপে পৌঁছানোর পর ওপরের ধাপগুলোতে উঠতে হয় খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে, কোথাও দড়ি বা গাছের শিকড় ধরে। এই অংশে অভিজ্ঞতা ও সাবধানতা দুটোই দরকার। যাঁরা নতুন, তাঁদের প্রথম ধাপ দেখে ফিরে আসাই নিরাপদ, অথবা অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইডের সঙ্গে দু-একটি ধাপ পর্যন্ত যাওয়া যায়।
ট্রেইলের মুখে স্থানীয় গাইড পাওয়া যায়। প্রথমবার গেলে গাইড নেওয়া ভালো, পথ চেনার পাশাপাশি কোন পাথরে পা রাখা নিরাপদ, তা-ও তাঁরা দেখিয়ে দেন। পারিশ্রমিক আগেই ঠিক করে নিন।
কখন যাবেন
বিজ্ঞাপন
ঝরনা দেখার সেরা সময় বর্ষা ও বর্ষার পরপর, মোটামুটি জুন থেকে অক্টোবর। এ সময় প্রতিটি ধাপে পানি থাকে, চারপাশ ঘন সবুজ। তবে ঠিক এই সময়েই পথ সবচেয়ে পিচ্ছিল, ঝিরিতে পানি বেশি আর জোঁকের উপদ্রবও প্রচুর। টানা ভারী বৃষ্টির দিনে বা বৃষ্টির ঠিক পরে পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ পানি বেড়ে যেতে পারে, তখন ঝিরিপথে থাকা বিপজ্জনক।
শীতকালে পানি অনেক কমে যায়, কোনো কোনো ধাপ প্রায় শুকিয়ে যায়। তবে পথ শুকনো ও তুলনামূলক নিরাপদ। যাঁরা ঝুঁকি কম রেখে প্রথমবার ট্রেইল দেখতে চান, তাঁদের জন্য অক্টোবর-নভেম্বর ভালো সমঝোতা, কারণ তখনো ঝরনায় পানি থাকে কিন্তু বর্ষার তীব্রতা কমে আসে।
খৈয়াছড়া ঝরনা ভ্রমণ খরচ
নিচের হিসাব আনুমানিক, সময়ের সঙ্গে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা-বড়তাকিয়া আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৬০০ টাকা।
২. বাজার থেকে ট্রেইলের মুখ: সিএনজি বা অটোরিকশায় আসা-যাওয়ায় জনপ্রতি অল্প কিছু টাকা।
৩. গাইড: পুরো দলের জন্য আনুমানিক কয়েকশ টাকা, কত ধাপ পর্যন্ত যাবেন তার ওপর নির্ভর করে।
৪. খাওয়া: ট্রেইলের মুখে গ্রামের কিছু বাড়িতে বা দোকানে আগে বলে রাখলে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হয়, জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে এক দিনের খৈয়াছড়া ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা যথেষ্ট।
এক দিনের সময়সূচি কেমন হতে পারে
ঢাকা থেকে রাত এগারোটা-বারোটার দিকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠলে ভোরের দিকে বড়তাকিয়ায় পৌঁছানো যায়। বাজারে নাশতা সেরে সকাল সাতটার মধ্যে ট্রেইলের মুখে চলে যান। গ্রামের বাড়িতে দুপুরের খাবারের কথা বলে রেখে হাঁটা শুরু করুন। সকাল নয়টা-দশটার মধ্যে প্রথম ধাপে পৌঁছে গেলে ভিড় শুরুর আগেই শান্তভাবে ঝরনা দেখা যায়।
দুপুর একটা-দুইটার মধ্যে নামা শুরু করুন। ট্রেইলের মুখে ফিরে গোসল ও পোশাক বদলে খাওয়া সেরে নিন। বিকেলে মহাসড়কে উঠে ঢাকামুখী বাস ধরুন। ছুটির দিনের বিকেলে বাসে আসন পাওয়া কঠিন হতে পারে, তাই সম্ভব হলে ফিরতি টিকিট আগে থেকে কেটে রাখুন বা কাছের কাউন্টারে আগেভাগে খোঁজ নিন।
বিজ্ঞাপন
ব্যাগে কী নেবেন, কী পরবেন
১. জুতা: গ্রিপওয়ালা স্পোর্টস স্যান্ডেল বা ট্রেকিং স্যান্ডেল সবচেয়ে ভালো, কারণ পানিতে বারবার নামতে হয়। চপ্পল একেবারেই নয়।
২. পোশাক: দ্রুত শুকায় এমন সিনথেটিক পোশাক, ফুলপ্যান্ট। জিনস ভিজে ভারী হয়ে যায়, তাই এড়িয়ে চলুন।
৩. জলরোধী ব্যাগ: মোবাইল, টাকা আর পরিচয়পত্র রাখার জন্য প্লাস্টিকের জিপ ব্যাগ।
বিজ্ঞাপন
৪. শুকনো পোশাক: ফেরার পথে বাসে ওঠার জন্য এক সেট শুকনো জামা আলাদা ব্যাগে।
৫. জোঁক থেকে সুরক্ষা: লম্বা মোজা আর লবণ, বর্ষায় খুব কাজে লাগে।
নিরাপত্তা: যে নিয়মগুলো জরুরি
১. কুণ্ডে সাঁতার নয়: ঝরনার নিচের কুণ্ডগুলো দেখতে অগভীর মনে হলেও কোথাও কোথাও বেশ গভীর। সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. ওপরের ধাপে সাবধানে: শেওলা জমা খাড়া পাথরে ওঠার সময় তিন পয়েন্টে ভর রাখার নিয়ম মানুন, অর্থাৎ দুই হাত-এক পা বা এক হাত-দুই পা সব সময় শক্ত জায়গায়।
৩. ঢলের লক্ষণ: পানি হঠাৎ ঘোলা হয়ে গেলে বা স্রোত বাড়তে থাকলে দ্রুত ঝিরি থেকে উঁচু জায়গায় উঠে যান।
৪. সময়মতো ফেরা: বিকেলের আগেই নামা শুরু করুন। অন্ধকারে ঝিরিপথে হাঁটা বিপজ্জনক।
৫. দলে থাকুন: কেউ পিছিয়ে পড়লে অপেক্ষা করুন, কাউকে একা ফেলে যাবেন না।
বিজ্ঞাপন
৬. ময়লা ফেরত আনুন: পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট ঝরনায় ফেলবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খৈয়াছড়া ঝরনায় কি প্রবেশ ফি আছে?
বনাঞ্চল বা স্থানীয় ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে কখনো কখনো ছোট অঙ্কের প্রবেশ ফি নেওয়া হয়। নিয়ম সময়ভেদে বদলায়, ট্রেইলের মুখে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
শীতে গেলে কি ঝরনায় পানি পাওয়া যাবে?
পানি থাকে, তবে খুব কম। ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে বর্ষা বা বর্ষার পরপর যান।
খৈয়াছড়া আর নাপিত্তাছড়া কি কাছাকাছি?
হ্যাঁ, দুটিই মিরসরাই এলাকায় এবং মহাসড়ক থেকে কাছে। অভিজ্ঞ দল কখনো একই দিনে দুটি ট্রেইল করে, তবে নতুনদের জন্য দিনে একটিই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
গাইড ছাড়া কি যাওয়া যায়?
প্রথম ধাপ পর্যন্ত পথ মোটামুটি চেনা, অনেকে গাইড ছাড়াই যান। ওপরের ধাপে যেতে চাইলে বা প্রথমবার গেলে স্থানীয় গাইড নেওয়াই নিরাপদ।