সূরা কাহাফ বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: জুমার দিনে পড়ার ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
প্রতি শুক্রবার মসজিদে বা ঘরে বসে অনেকে একটি দীর্ঘ সূরা পড়েন, সেটি সূরা কাহাফ। কাহাফ শব্দের অর্থ গুহা। একদল ঈমানদার যুবকের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা থেকে সূরাটির এই নাম।
বিজ্ঞাপন
সূরা কাহাফ কোরআনের ১৮তম সূরা, মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ১১০টি। এটি ১৫তম পারার মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে ১৬তম পারায় শেষ হয়েছে। জুমার দিনে পড়ার বিশেষ ফজিলত এবং দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার কথা হাদিসে আসায় সূরাটি মুসলমানদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পায়।
সূরার ভেতরে আছে চারটি ঘটনা: গুহাবাসী যুবকদের কাহিনি, দুই বাগানের মালিকের গল্প, হজরত মুসা ও খিজির (আ.)-এর সফর, এবং বাদশাহ জুলকারনাইনের অভিযান। তাফসিরকারকেরা এই চার ঘটনাকে মানুষের চার বড় পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন: ঈমানের পরীক্ষা, সম্পদের পরীক্ষা, জ্ঞানের পরীক্ষা ও ক্ষমতার পরীক্ষা।
জুমার দিনে পড়ার ফজিলত
হাকিম ও বায়হাকিতে হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় আলোকিত করে দেওয়া হবে। হাদিসটির কিছু বর্ণনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও অনেক মুহাদ্দিস একে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, এবং জুমার দিনে সূরা কাহাফ পড়ার আমল সাহাবি-তাবেয়িদের যুগ থেকে প্রচলিত।
বিজ্ঞাপন
কখন পড়বেন: ইসলামি হিসাবে দিন শুরু হয় আগের সন্ধ্যায়। তাই বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়লে জুমার দিনে পড়া হিসেবে গণ্য হবে বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
একবারে না পারলে: মাঝারি গতিতে পুরো সূরা পড়তে সাধারণত আধা ঘণ্টার মতো লাগে, ধীরে পড়লে কিছুটা বেশি। একবারে না পারলে সকালে কিছু, জুমার পর কিছু, আসরের পর বাকিটা পড়ে শেষ করুন।
সাকিনা নাজিলের ঘটনা: বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, এক সাহাবি সূরা কাহাফ পড়ছিলেন, তখন একখণ্ড মেঘ তাঁকে ঢেকে ফেলে এবং পাশে বাঁধা ঘোড়াটি অস্থির হয়ে ওঠে। মহানবী (সা.) জানালেন, সেটি ছিল সাকিনা, যা কোরআন তিলাওয়াতের কারণে নেমে এসেছিল।
দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষা
বিজ্ঞাপন
সহিহ মুসলিমে হজরত আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, যে সূরা কাহাফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাবে। মুসলিমেরই আরেক বর্ণনায় শেষ দশ আয়াতের কথা এসেছে। তাই অনেকে দুটোই মুখস্থ করেন।
দাজ্জালের ফিতনার সঙ্গে সূরা কাহাফের সম্পর্ক কী, এ নিয়ে আলেমরা বলেন, দাজ্জাল মানুষকে ঈমান, সম্পদ, অলৌকিক জ্ঞান ও ক্ষমতার চমক দিয়ে বিভ্রান্ত করবে। আর এই সূরার চার ঘটনা ঠিক এই চার বিষয়ে মুমিনকে সতর্ক ও দৃঢ় করে।
গুরুত্বপূর্ণ আয়াত: উচ্চারণ ও অর্থ
প্রথম আয়াত: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আনজালা আলা আবদিহিল কিতাবা ওয়ালাম ইয়াজআল লাহু ইওয়াজা।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন এবং এতে কোনো বক্রতা রাখেননি।
গুহাবাসী যুবকদের দোয়া (আয়াত ১০): গুহায় আশ্রয় নিয়ে তাঁরা যে দোয়া করেছিলেন, তা যেকোনো কঠিন সময়ে পড়ার মতো:
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়ি' লানা মিন আমরিনা রাশাদা। অর্থ: হে আমাদের রব, তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দাও এবং আমাদের বিষয়টি সঠিক পথে পরিচালনার ব্যবস্থা করে দাও।
বিজ্ঞাপন
শেষ আয়াত (১১০): এর অর্থ: বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহি আসে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। অতএব যে তার রবের সাক্ষাৎ আশা করে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।
আসহাবে কাহাফের ঘটনা
এক জালিম শাসকের যুগে কয়েকজন যুবক এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। শিরকে ভরা সমাজে টিকতে না পেরে তাঁরা শহর ছেড়ে এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। আল্লাহ তাঁদের দীর্ঘ ঘুমে আচ্ছন্ন করে দেন। কোরআন জানায়, সূর্য উদয়ের সময় গুহার ডান দিক দিয়ে সরে যেত আর অস্তের সময় বাম দিক দিয়ে পেরিয়ে যেত, তাঁরা থাকতেন গুহার প্রশস্ত অংশে। তাঁদের পাশ ফিরিয়ে দেওয়া হতো, আর তাঁদের কুকুরটি গুহার মুখে সামনের পা ছড়িয়ে বসে ছিল।
২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাঁরা গুহায় তিন শ বছর ছিলেন এবং আরও নয় বছর বাড়ানো হয়েছিল। জেগে উঠে তাঁরা ভেবেছিলেন এক দিন বা তার কিছু অংশ ঘুমিয়েছেন। একজনকে রুপার মুদ্রা দিয়ে শহরে খাবার আনতে পাঠান, আর তখনই তাঁদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
যুবকদের সংখ্যা কত ছিল, তা নিয়ে মানুষ তর্ক করত। ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তাদের সংখ্যা আমার রবই ভালো জানেন। অর্থাৎ যে বিষয়ে জানার উপকার নেই, তা নিয়ে বিতর্কে না জড়ানোও এক শিক্ষা।
এই ঘটনার মাঝেই ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে একটি দৈনন্দিন আদব শেখানো হয়েছে: কোনো কাজের ব্যাপারে কখনো বলবে না যে আমি এটি আগামীকাল করব, আল্লাহ চাইলে, অর্থাৎ ইনশাআল্লাহ বলা ছাড়া।
বাকি তিন ঘটনার শিক্ষা
দুই বাগানের মালিক: এক ব্যক্তিকে দুটি সমৃদ্ধ বাগান দেওয়া হয়েছিল। অহংকারে সে বলেছিল, এ বাগান কখনো ধ্বংস হবে না। তার ঈমানদার সঙ্গী মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, বাগানে ঢুকে কেন বললে না, "মাশাআল্লাহ, লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ", অর্থাৎ আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই। শেষে বাগান ধ্বংস হয়। ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সম্পদ ও সন্তান দুনিয়ার জীবনের শোভা, তবে স্থায়ী সৎকাজ রবের কাছে উত্তম।
বিজ্ঞাপন
মুসা ও খিজির (আ.): হজরত মুসা (আ.) জ্ঞান অর্জনের জন্য দুই সাগরের মিলনস্থলে এক বিশেষ জ্ঞানী বান্দার কাছে যান। সফরে তিনটি ঘটনা ঘটে: নৌকা ফুটো করা, এক বালককে হত্যা, আর ভেঙে পড়া দেয়াল বিনা পারিশ্রমিকে মেরামত। প্রতিবার মুসা (আ.) আপত্তি করেন। শেষে ব্যাখ্যা আসে, প্রতিটি কাজের পেছনে আল্লাহর গোপন প্রজ্ঞা ছিল। শিক্ষা হলো, মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর বাহ্যিক ক্ষতির আড়ালেও কল্যাণ থাকতে পারে।
জুলকারনাইন: পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে অভিযান চালানো এক ন্যায়পরায়ণ শাসক। দুই পাহাড়ের মাঝে বসবাসকারী এক জাতি ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সাহায্য চাইলে তিনি লোহা ও গলিত তামা দিয়ে মজবুত প্রাচীর গড়ে দেন। এত ক্ষমতা থাকার পরও তিনি বলেছিলেন, এটি আমার রবের অনুগ্রহ। ক্ষমতার সঙ্গে বিনয় ও ন্যায়ের শিক্ষা এ ঘটনায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সূরা কাহাফ কি শুক্রবার জুমার আগেই পড়তে হবে?
বিজ্ঞাপন
না। বৃহস্পতিবার মাগরিব থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়া যায়।
পুরো সূরা না পারলে প্রথম দশ আয়াত পড়লে কি হবে?
দাজ্জাল থেকে সুরক্ষার হাদিসটি প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করা নিয়ে। জুমার দিনের আলোর ফজিলত পুরো সূরা পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। যতটুকু পারেন পড়ুন, তিলাওয়াতের সওয়াব তো আছেই।
আসহাবে কাহাফ কত বছর ঘুমিয়েছিলেন?
বিজ্ঞাপন
কোরআনের ২৫ নম্বর আয়াত অনুযায়ী তিন শ বছর, আর নয় বছর বেশি। তাফসিরকারকদের অনেকে বলেন, সৌর হিসাবে তিন শ এবং চান্দ্র হিসাবে তিন শ নয় বছর।
শুনে শুনে পড়লেও কি ফজিলত পাওয়া যাবে?
মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শোনারও সওয়াব আছে। তবে হাদিসে "পড়া"র কথা এসেছে, তাই সম্ভব হলে নিজে পড়ুন।