চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ: যাতায়াত, ওঠার পথ, থাকা, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · চট্টগ্রাম
প্রকাশ:
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে সীতাকুণ্ড পার হওয়ার সময় পূর্ব দিকে তাকালে পাহাড়ের সারির মাথায় একটা ছোট মন্দির চোখে পড়ে। ওটাই চন্দ্রনাথ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান, আর পাহাড়প্রেমীদের কাছে ঢাকার কাছের সবচেয়ে জনপ্রিয় এক দিনের ট্রেক। চূড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমে তাকালে দূরে বঙ্গোপসাগর আর সন্দ্বীপ চ্যানেলের আভাস পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
চন্দ্রনাথ পাহাড় কোথায় অবস্থিত, তা জানতে চাইলে উত্তর চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলা, সীতাকুণ্ড বাজার থেকে মোটামুটি চার কিলোমিটার পূর্বে। পাহাড়ের উচ্চতা সাধারণভাবে এক হাজার ফুটের কিছু বেশি বলা হয়। চূড়ায় চন্দ্রনাথ মন্দির, আর ওঠার পথের মাঝামাঝি বিরূপাক্ষ মন্দির।
পাহাড়টি খুব উঁচু নয়, কিন্তু পথ খাড়া। প্রথমবার যাঁরা ওঠেন, তাঁদের অনেকেই চূড়ায় পৌঁছে হাঁপিয়ে পড়েন। তাই সময় হাতে রেখে, পর্যাপ্ত পানি নিয়ে আর ঠিক জুতা পরে গেলে যাত্রা উপভোগ্য হয়।
চন্দ্রনাথ পাহাড় যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে বাসে: সায়েদাবাদ, আরামবাগ বা কলাবাগান থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারে নামতে পারেন। বাস ছাড়ার সময় সুপারভাইজারকে জানিয়ে রাখুন। সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা, যানজটভেদে বেশি। ভাড়া সাধারণত চট্টগ্রামের পুরো ভাড়ার কাছাকাছিই নেওয়া হয়, নন-এসিতে আনুমানিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেনে: ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে সীতাকুণ্ড স্টেশন আছে, তবে সব আন্তনগর ট্রেন সেখানে থামে না। কোনো ট্রেন থামে কি না, যাত্রার আগে সময়সূচি দেখে নিন। না থামলে ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসে সীতাকুণ্ডে ফেরা যায়।
৩. চট্টগ্রাম শহর থেকে: অলংকার মোড় বা এ কে খান এলাকা থেকে ঢাকামুখী লোকাল বাসে বা সীতাকুণ্ডগামী বাসে এক ঘণ্টার মতো লাগে।
৪. সীতাকুণ্ড বাজার থেকে পাদদেশে: বাজার থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গোড়া পর্যন্ত যেতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। শেয়ারে গেলে জনপ্রতি অল্প, রিজার্ভে আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা।
ওঠার পথ: সিঁড়ি নাকি পাহাড়ি ট্রেইল
বিজ্ঞাপন
পাদদেশ থেকে চূড়ায় ওঠার মূলত দুটি পথ। একটি পথে অনেকটা অংশ সিঁড়ি করা, অন্যটি তুলনামূলক প্রাকৃতিক পাহাড়ি ট্রেইল। প্রচলিত পরামর্শ হলো, ট্রেইলের দিক দিয়ে উঠে সিঁড়ির দিক দিয়ে নামা, কারণ খাড়া সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হাঁটুতে বেশি চাপ পড়ে, আর পিচ্ছিল ট্রেইলে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে অনেকে উল্টোটাও করেন। পাদদেশে স্থানীয় দোকানদার বা আগে আসা দলের কাছে বর্তমান পথের অবস্থা জেনে নিন।
শুরুতেই পাদদেশের দোকান থেকে একটা বাঁশের লাঠি নিন, ওঠা-নামায় সত্যিই কাজে লাগে। পথের কিছুদূর পর পর ছোট দোকানে পানি, লেবুর শরবত আর হালকা খাবার পাওয়া যায়, তবে ওপরের দিকে দাম বেশি।
পথের মাঝামাঝি বিরূপাক্ষ মন্দির, সেখান থেকে চূড়া আর বেশি দূরে নয়, কিন্তু শেষ অংশটাই সবচেয়ে খাড়া। সাধারণ গতিতে উঠতে দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে, নামতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। ধীরে উঠুন, প্রতি কিছুক্ষণ পর পর দম নিন।
কখন যাবেন
বিজ্ঞাপন
শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, চন্দ্রনাথে ওঠার সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় কম ঘাম হয়, পথ শুকনো থাকে, আর চূড়া থেকে দূরের দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যায়। বর্ষায় পাহাড় সবুজ ও ঝরনায় পানি থাকে, কিন্তু মাটির পথ খুব পিচ্ছিল হয়ে যায়, পাথরে শেওলা জমে। গ্রীষ্মে দুপুরের রোদে ওঠা কষ্টকর, তখন খুব ভোরে শুরু করুন।
দিনের মধ্যে ভোরে ওঠা শুরু করা সবচেয়ে ভালো। রোদ কম থাকে, আর ফিরে এসে একই দিনে সীতাকুণ্ডের অন্য জায়গাও ঘোরা যায়। সূর্যাস্ত দেখতে চূড়ায় থাকলে অন্ধকারে নামার ঝুঁকি নিতে হয়, যা নতুনদের জন্য ঠিক নয়।
মন্দির ও মেলা: যা জেনে রাখবেন
চন্দ্রনাথ মন্দির শিবের উপাসনার স্থান। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসে শিবচতুর্দশী উপলক্ষে সীতাকুণ্ডে বড় মেলা বসে, তখন দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থী আসেন। মেলার সময় পাহাড়ে প্রচণ্ড ভিড় থাকে, পথে লম্বা লাইন পড়ে। শুধু পাহাড় দেখতে চাইলে এই সময়টা এড়িয়ে চলাই ভালো, আর পুণ্যার্থীদের অগ্রাধিকার দিন।
বিজ্ঞাপন
মন্দির চত্বরে জুতা খুলে ঢুকতে হয়, শালীন পোশাক পরতে হয়। মন্দিরের ভেতরে ছবি তোলার আগে পুরোহিত বা দায়িত্বশীল কারও অনুমতি নিন। উপাসনারত মানুষের সামনে হইচই করবেন না।
থাকা ও খাওয়া
সীতাকুণ্ডে কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল আছে, তবে সুযোগ-সুবিধা সীমিত। বেশির ভাগ পর্যটক হয় একই দিনে ঢাকায় বা চট্টগ্রামে ফিরে যান, নয়তো চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। চট্টগ্রামে সব দামের হোটেল পাওয়া যায়, রাতপ্রতি আনুমানিক ১০০০ টাকা থেকে শুরু।
খাবারের জন্য সীতাকুণ্ড বাজারে কয়েকটি রেস্তোরাঁ আছে, সাধারণ ভাত-মাছ-মাংস পাওয়া যায়। পাহাড়ে ওঠার আগে ভারী খাবার না খেয়ে হালকা নাশতা করুন, নামার পর পেট ভরে খান।
বিজ্ঞাপন
চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ খরচ
নিচের হিসাব আনুমানিক, সময়ের সঙ্গে বদলায়।
১. ঢাকা-সীতাকুণ্ড আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা।
২. স্থানীয় যাতায়াত: বাজার থেকে পাদদেশ আসা-যাওয়ায় জনপ্রতি আনুমানিক ৫০ থেকে ২০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
৩. লাঠি, পানি ও হালকা খাবার: আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
৪. খাওয়া: দুই বেলা আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।
রাতের বাসে গিয়ে দিনে উঠে আবার রাতের বাসে ফিরলে জনপ্রতি আনুমানিক ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকায় পুরো যাত্রা শেষ করা সম্ভব।
একই দিনে আর যা দেখা যায়
বিজ্ঞাপন
চন্দ্রনাথ থেকে নেমে সময় ও শক্তি থাকলে কাছের গুলিয়াখালী সৈকতে যেতে পারেন, যেখানে সবুজ ঘাসের গালিচা গিয়ে মিশেছে সমুদ্রে। বাঁশবাড়িয়া সৈকতও কাছে। একটু উত্তরে মিরসরাইয়ে খৈয়াছড়া ঝরনা, তবে একই দিনে দুটি ট্রেক বেশি কষ্টকর হতে পারে। ইকোপার্ক আর বোটানিক্যাল গার্ডেনও সীতাকুণ্ডেই।
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
১. একা যাবেন না: অন্তত দুই-তিনজনের দলে যান। নির্জন পথে একা হাঁটা নিরাপদ নয়।
২. সন্ধ্যার আগে নেমে আসুন: অন্ধকারে খাড়া পথে নামা বিপজ্জনক। টর্চ সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
৩. ঠিক জুতা: গ্রিপওয়ালা জুতা পরুন, চপ্পল বা মসৃণ তলার জুতায় পিছলে পড়ার ঝুঁকি বেশি।
৪. পানি ও স্যালাইন: অন্তত এক থেকে দেড় লিটার পানি সঙ্গে রাখুন।
৫. শারীরিক অবস্থা: হৃদ্রোগ, হাঁপানি বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং খুব ধীরে উঠুন।
৬. পরিচ্ছন্নতা: পাহাড়ে প্লাস্টিক বা খাবারের মোড়ক ফেলবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠতে কি টিকিট লাগে?
সাধারণত পাহাড়ে ওঠার জন্য প্রবেশ টিকিট নেই। তবে নিয়ম বদলাতে পারে, তাই পাদদেশে খোঁজ নিয়ে নিন।
শিশু বা বয়স্করা কি উঠতে পারবেন?
বিজ্ঞাপন
একটু বড় শিশু ধীরে ধীরে উঠতে পারে। বয়স্কদের জন্য পথটা কষ্টকর, তাঁদের শারীরিক সামর্থ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।
বর্ষায় কি চন্দ্রনাথে ওঠা নিরাপদ?
বর্ষায় পথ খুব পিচ্ছিল থাকে। অভিজ্ঞ না হলে শুকনো মৌসুমে যাওয়াই ভালো। গেলে ভালো জুতা পরে, লাঠি নিয়ে, খুব সাবধানে উঠুন।
এক দিনে ঢাকা থেকে ঘুরে আসা যায় কি?
বিজ্ঞাপন
রাতের বাসে গিয়ে ভোরে ওঠা শুরু করলে দুপুরের মধ্যে নেমে বিকেলের বাসে ফেরা যায়।