কেওক্রাডং ভ্রমণ: পাহাড়ি পথে যাতায়াত, থাকা, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
স্কুলের ভূগোল বইয়ে একসময় পড়ানো হতো, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কেওক্রাডং। পরে নতুন জরিপ ও পরিমাপে দেখা গেছে, বান্দরবানের আরও কয়েকটি চূড়া এর চেয়ে উঁচু, যার মধ্যে সাকা হাফং বা মদক মুয়ালকে এখন অনেকে সর্বোচ্চ ধরেন। তবু ট্রেকারদের কাছে কেওক্রাডংয়ের আকর্ষণ একটুও কমেনি। প্রথমবার পাহাড়ে হাঁটতে চাওয়া মানুষের কাছে এটি এখনো স্বপ্নের প্রথম চূড়া।
বিজ্ঞাপন
কেওক্রাডং কোথায় অবস্থিত, এর উত্তর বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায়, মিয়ানমার সীমান্তের দিকের পাহাড়শ্রেণিতে। উচ্চতা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য আছে, সাধারণভাবে তিন হাজার ফুটের কিছু বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। চূড়ায় একটি স্মৃতিফলক, ছোট হেলিপ্যাড ও কয়েকটি থাকার ঘর আছে। পরিষ্কার দিনে চারদিকে পাহাড়ের পর পাহাড় দেখা যায়।
কেওক্রাডং যাত্রার পুরোটা নির্ভর করে রুমা উপজেলায় পর্যটক যাওয়ার অনুমতির ওপর। গত কয়েক বছরে নিরাপত্তাজনিত কারণে এই এলাকায় একাধিকবার বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, আবার শর্তসাপেক্ষে শিথিলও করা হয়েছে। তাই ব্যাগ গোছানোর আগে জেলা প্রশাসন বা রুমার নিবন্ধিত গাইডের কাছে বর্তমান অবস্থা জেনে নিন।
কেওক্রাডং যাওয়ার উপায়
কেওক্রাডং যাত্রা কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রতিটি ধাপের সময় ঠিক রাখা জরুরি, কারণ পাহাড়ে সন্ধ্যার পর চলাচল নিরাপদ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অনুমতিও থাকে না।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা থেকে বান্দরবান: রাতের বাসে সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান বা গাবতলী থেকে বান্দরবান, আট থেকে দশ ঘণ্টা। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা। ট্রেনে চট্টগ্রাম হয়ে বহদ্দারহাট থেকে বাসে যাওয়াও যায়।
২. বান্দরবান থেকে রুমা: সকালে রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস বা রিজার্ভ চাঁদের গাড়িতে রুমা বাজার, দুই থেকে তিন ঘণ্টা।
৩. রুমায় গাইড ও নিবন্ধন: নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। গাইড দলের সদস্যদের তথ্য দিয়ে নির্ধারিত চেকপোস্টে নিবন্ধন করান। পরিচয়পত্রের কয়েকটি ফটোকপি রাখুন।
৪. রুমা থেকে বগা লেক: জিপ বা চাঁদের গাড়িতে দেড়-দুই ঘণ্টা। অনেকে প্রথম রাত বগা লেকে কাটান।
বিজ্ঞাপন
৫. বগা লেক থেকে কেওক্রাডং: পায়ে হেঁটে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা, গতি আর বিশ্রামভেদে। পথে চিংড়ি ঝিরি নামের একটি ছোট ঝরনা আর দার্জিলিংপাড়া নামের সুন্দর একটি বম পাড়া পড়ে। শুকনো মৌসুমে এখন অনেক অংশে জিপের রাস্তাও হয়েছে, তাই চাইলে গাড়িতে কাছাকাছি পর্যন্ত যাওয়া যায়, তবে হেঁটে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই আলাদা।
হাঁটার পথ কেমন
বগা লেক থেকে বেরিয়ে প্রথমে কিছুটা ওঠা-নামা, তারপর ঝিরিপথ ধরে চিংড়ি ঝিরিতে পৌঁছানো। বর্ষায় এই ঝিরিতে পানি বেশি থাকে, পাথর খুব পিচ্ছিল হয়। এরপর একটানা চড়াই, যা নতুনদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের অংশ। দার্জিলিংপাড়ায় পৌঁছালে অনেকে চা আর বিশ্রামের বিরতি নেন। পাড়াটি পরিচ্ছন্ন, ফুলে সাজানো, অনেক ট্রেকারের প্রিয় জায়গা। সেখান থেকে কেওক্রাডং চূড়া আর খুব দূরে নয়।
শারীরিকভাবে মোটামুটি সক্ষম যে কেউ ধীরে ধীরে এই পথ পার হতে পারেন। নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস না থাকলে যাত্রার দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকে প্রতিদিন হাঁটা ও সিঁড়ি ভাঙার অভ্যাস করুন। একটা বাঁশের লাঠি হাতে রাখলে ওঠা-নামায় অনেক সাহায্য হয়, স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন
অক্টোবরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি কেওক্রাডং যাত্রার সবচেয়ে উপযোগী সময়। এ সময় পথ শুকনো, ঝিরিতে পানি কম, আকাশ পরিষ্কার। ভোরে চূড়া থেকে নিচের উপত্যকায় মেঘ বা কুয়াশার সমুদ্র দেখার সম্ভাবনাও থাকে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে রাতে চূড়ায় বেশ ঠান্ডা পড়ে, ভালো গরম কাপড় দরকার।
বর্ষায় পাহাড় সবচেয়ে সবুজ, কিন্তু পথ কাদা আর জোঁকে ভরা, ঝিরিতে হঠাৎ পানি বাড়ে, ধসের ঝুঁকিও থাকে। অভিজ্ঞ ট্রেকার ছাড়া এই সময় এড়িয়ে চলাই ভালো। মার্চ থেকে মে তীব্র গরমে হাঁটা কষ্টকর হয়।
কোথায় থাকবেন
বিজ্ঞাপন
কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় স্থানীয়ভাবে পরিচালিত কয়েকটি ঘর আছে, যেখানে ট্রেকাররা রাত কাটান। ঘরগুলো সাদামাটা, একসঙ্গে অনেকে মেঝেতে বা মাচায় ঘুমান। দার্জিলিংপাড়ায় হোমস্টে বা কটেজে থাকার ব্যবস্থা আছে, অনেকে চূড়ায় না থেকে সেখানেই রাত কাটান। আর বগা লেকের পাড়ে বম জনগোষ্ঠীর কটেজ তো আছেই।
এসব জায়গায় বিদ্যুৎ সীমিত, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে আলো আর অল্প চার্জের ব্যবস্থা থাকে। খাবার হয় সাধারণ, ভাত, ডাল, ডিম, মুরগি, পাহাড়ি সবজি। কতজন খাবেন তা আগে জানিয়ে দিতে হয়। থাকার জায়গা সাধারণত গাইডই ঠিক করে দেন।
কেওক্রাডং ভ্রমণ খরচ
খরচ দলের আকারের ওপর অনেকটা নির্ভর করে, কারণ গাড়ি আর গাইডের খরচ ভাগ হয়। নিচের অঙ্ক আনুমানিক এবং নিয়ম ও সময়ভেদে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা-বান্দরবান আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা।
২. বান্দরবান-রুমা-বগা লেক যাতায়াত: রিজার্ভ গাড়ির খরচ পুরো দলের জন্য কয়েক হাজার টাকা, ভাগ করলে জনপ্রতি তুলনামূলক কম।
৩. গাইড: দিনপ্রতি পারিশ্রমিক, সঙ্গে গাইডের খাবার ও থাকার খরচ দলের।
৪. থাকা: কটেজ বা হোমস্টেতে জনপ্রতি রাতপ্রতি আনুমানিক কয়েকশ টাকা।
বিজ্ঞাপন
৫. খাওয়া: বেলাপ্রতি জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, ওপরে উঠলে দাম বাড়ে।
দশ-বারো জনের দলে চার দিনের কেওক্রাডং যাত্রায় জনপ্রতি আনুমানিক ৭০০০ থেকে ১২০০০ টাকা ধরে রাখা যায়। দল ছোট হলে খরচ বাড়বে।
তিন-চার দিনের নমুনা পরিকল্পনা
প্রথম রাতে ঢাকা থেকে বাসে রওনা। প্রথম দিন সকালে বান্দরবান, সেখান থেকে রুমা, গাইড ঠিক করে নিবন্ধন, বিকেলে বগা লেকে পৌঁছে রাত্রিযাপন। দ্বিতীয় দিন ভোরে কেওক্রাডংয়ের পথে হাঁটা, দুপুরে দার্জিলিংপাড়া হয়ে চূড়ায় পৌঁছানো, সেখানে বা দার্জিলিংপাড়ায় রাত। তৃতীয় দিন ভোরে সূর্যোদয় দেখে নেমে আসা, বগা লেক হয়ে রুমা ও বান্দরবান। রাতের বাসে ঢাকার পথে রওনা।
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া খারাপ হলে বা কারও শরীর খারাপ হলে পরিকল্পনা বদলাতে হতে পারে। তাই এক দিন বাড়তি হাতে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
১. অনুমতির বাইরে যাবেন না: প্রশাসনের দেওয়া সীমা ও রুট মেনে চলুন। নিষিদ্ধ এলাকায় বা গাইড ছাড়া অন্য পথে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।
২. সূর্যাস্তের আগে পৌঁছান: পাহাড়ে অন্ধকার নামে দ্রুত। গাইডের ঠিক করে দেওয়া সময়ে রওনা দিন।
বিজ্ঞাপন
৩. পানিশূন্যতা: চড়াইয়ে প্রচুর ঘাম হয়। বারবার অল্প অল্প পানি পান করুন, খাওয়ার স্যালাইন রাখুন।
৪. ম্যালেরিয়া: পার্বত্য এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আছে। মশা তাড়ানোর ক্রিম, লম্বা হাতার পোশাক আর মশারি ব্যবহার করুন। ফেরার পর জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান এবং পাহাড়ে যাওয়ার কথা জানান।
৫. নিজের সীমা বুঝুন: হাঁপানি, হৃদ্রোগ বা হাঁটুর বড় সমস্যা থাকলে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৬. পরিবেশ ও সংস্কৃতি: প্লাস্টিক ফেরত আনুন। পাহাড়ি পাড়ায় উচ্চ শব্দ, মদ্যপান বা অসম্মানজনক আচরণ করবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কেওক্রাডং কি এখনো দেশের সর্বোচ্চ চূড়া?
না। পরবর্তী পরিমাপে বান্দরবানের অন্য কয়েকটি চূড়া, বিশেষ করে সাকা হাফং, বেশি উঁচু বলে ধরা হয়। তবে কেওক্রাডং দেশের পরিচিত উঁচু চূড়াগুলোর একটি।
নতুনরা কি কেওক্রাডং যেতে পারবে?
বিজ্ঞাপন
পারবে, যদি শারীরিকভাবে মোটামুটি সক্ষম হয় এবং শুকনো মৌসুমে অভিজ্ঞ গাইডের সঙ্গে ধীরে হাঁটে। আগে থেকে হাঁটার অভ্যাস করলে কষ্ট কম হয়।
মেয়েরা কি নিরাপদে যেতে পারেন?
অনেক নারী ট্রেকারই নিয়মিত কেওক্রাডং যান। পরিচিত দল ও নিবন্ধিত গাইডের সঙ্গে গেলে এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মানলে যাত্রা সাধারণত নির্বিঘ্ন হয়।
চূড়ায় কি মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
কিছু জায়গায় দুর্বল নেটওয়ার্ক মেলে, অনেক জায়গায় একেবারেই থাকে না। পরিবারকে যাত্রাপথ ও ফেরার সম্ভাব্য সময় জানিয়ে রাখুন।