বগা লেক ভ্রমণ গাইড: সেরা মৌসুম, যাতায়াত, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
পাহাড়ের এত ওপরে এত বড় একটা হ্রদ কীভাবে হলো, বগা লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে প্রায় সবার মনে এই প্রশ্ন জাগে। চারদিকে সবুজ পাহাড়ের দেয়াল, মাঝখানে গাঢ় নীল পানি, পাড়ে বম জনগোষ্ঠীর ছোট পাড়া। রাতে লেকের পাড়ে বসে তারাভরা আকাশ দেখা অনেকের ভ্রমণজীবনের স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এখান থেকেই কেওক্রাডংয়ের পথে ট্রেকিং শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
বগা লেক কোথায় অবস্থিত, এর উত্তর বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায়। এটি দেশের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত প্রাকৃতিক হ্রদগুলোর একটি, আয়তন মোটামুটি পনেরো একরের মতো বলে প্রচলিত। হ্রদের পানি কোথা থেকে আসে, তা নিয়ে স্থানীয় লোককথা আছে, আবার কারও কারও মতে এটি পুরোনো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে তৈরি। এ বিষয়ে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আছে বলা কঠিন।
একটা জরুরি কথা শুরুতেই বলা দরকার। রুমা উপজেলায় নিরাপত্তাজনিত কারণে বিভিন্ন সময়ে পর্যটক চলাচল পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার শর্তসাপেক্ষে খুলেও দেওয়া হয়েছে। তাই পরিকল্পনা শুরুর আগেই বান্দরবান জেলা প্রশাসন বা নিবন্ধিত গাইডের মাধ্যমে জেনে নিন, এখন বগা লেকে যাওয়া যাচ্ছে কি না এবং কী শর্তে।
বগা লেক যাওয়ার উপায়
যাত্রাটা কয়েক ধাপের। প্রতিটি ধাপে সময় হিসাব করে চলতে হয়।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা থেকে বান্দরবান: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান বা গাবতলী থেকে রাতের বাসে বান্দরবান, আট থেকে দশ ঘণ্টা। অথবা ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে বহদ্দারহাট থেকে বাসে বান্দরবান।
২. বান্দরবান থেকে রুমা: শহরের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস বা রিজার্ভ চাঁদের গাড়িতে রুমা বাজার। পাহাড়ি রাস্তায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। আগে নৌপথে সাঙ্গু নদী হয়েও যাওয়া যেত, এখন সড়কপথই প্রধান।
৩. গাইড ও নিবন্ধন: রুমা থেকে সামনে যেতে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। গাইড আপনাদের তথ্য নিয়ে রুমায় নির্ধারিত চেকপোস্টে নিবন্ধনের কাজ করেন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্য পরিচয়পত্রের কয়েকটি ফটোকপি সঙ্গে রাখুন, প্রয়োজনে একাধিক জায়গায় জমা দিতে হতে পারে।
৪. রুমা থেকে বগা লেক: শুকনো মৌসুমে রুমা থেকে চাঁদের গাড়ি বা জিপে বগা লেকের কাছাকাছি পর্যন্ত যাওয়া যায়, দেড়-দুই ঘণ্টার খাড়া পাহাড়ি পথ। বর্ষায় রাস্তা খারাপ হলে শেষ অংশ হেঁটে উঠতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে পরদিন বিকেলের মধ্যে বগা লেকে পৌঁছানো সম্ভব, যদি বান্দরবানে সকালে নেমেই রুমার গাড়ি ধরতে পারেন। রুমা থেকে বগা লেকের দিকে বিকেলের পর নতুন যাত্রা সাধারণত অনুমোদিত হয় না।
কোন মৌসুমে যাবেন
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বগা লেক যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়। বর্ষা শেষ হওয়ায় পাহাড় সবুজ থাকে, রাস্তা শুকনো ও তুলনামূলক নিরাপদ, আকাশ পরিষ্কার। শীতে রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে, গরম কাপড় লাগে।
বর্ষায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর, পাহাড়ি পথ কাদাময় ও পিচ্ছিল হয়, ধস নামতে পারে, জোঁকের উপদ্রবও বাড়ে। এ সময় গাড়ি চলাচল অনিশ্চিত থাকে। মার্চ থেকে মে গরম বেশি, পানির উৎসও কমে যায়। অভিজ্ঞ না হলে শুকনো শীতের মৌসুমেই যান।
বিজ্ঞাপন
থাকা ও খাওয়া
বগা লেকের পাড়ে বম জনগোষ্ঠীর পরিচালিত কয়েকটি কটেজ ও ঘর আছে, যেখানে পর্যটকেরা রাত কাটান। এগুলো বাঁশ-কাঠের সাদামাটা ঘর, মেঝেতে বা মাচায় তোশক বিছিয়ে ঘুমাতে হয়। বিদ্যুৎ সীমিত, অনেক জায়গায় সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে সামান্য আলো ও চার্জের ব্যবস্থা থাকে। শৌচাগারও সাধারণ মানের।
খাবার পাওয়া যায় কটেজমালিকদের কাছেই। ভাত, ডাল, ডিম, মুরগি, পাহাড়ি সবজি সাধারণ মেনু। কতজন খাবেন তা আগে জানিয়ে দিতে হয়, কারণ সব উপকরণ নিচ থেকে আনতে হয়। শহুরে আরাম আশা না করে স্থানীয় জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে মেনে নিলেই অভিজ্ঞতা ভালো লাগবে।
বগা লেক ভ্রমণ খরচ
বিজ্ঞাপন
খরচের বড় অংশ গাড়ি আর গাইড, যা দলে ভাগ হলে কমে। নিচের অঙ্ক আনুমানিক এবং নিয়ম ও মৌসুমভেদে বদলায়।
১. ঢাকা-বান্দরবান আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা।
২. বান্দরবান-রুমা: লোকাল বাসে জনপ্রতি কম, রিজার্ভ চাঁদের গাড়িতে পুরো গাড়ির জন্য কয়েক হাজার টাকা।
৩. রুমা-বগা লেক জিপ: আসা-যাওয়ায় পুরো গাড়ির জন্য আনুমানিক কয়েক হাজার টাকা, দলে ভাগ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. গাইড: দিনপ্রতি নির্ধারিত বা আলোচনাসাপেক্ষ পারিশ্রমিক, সঙ্গে গাইডের খাওয়া-থাকার খরচ সাধারণত দলকে বহন করতে হয়।
৫. কটেজ ও খাবার: জনপ্রতি রাতপ্রতি আনুমানিক কয়েকশ টাকা, খাবার বেলাপ্রতি আলাদা।
দশ-বারো জনের দলে গেলে তিন-চার দিনের বগা লেক ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ৬০০০ থেকে ১০০০০ টাকা ধরে রাখা যায়। ছোট দলে খরচ অনেক বেশি পড়ে।
ব্যাগে কী কী রাখবেন
বিজ্ঞাপন
পাহাড়ি পথে ব্যাগ যত হালকা, যাত্রা তত আরামের। তবু কিছু জিনিস না নিলেই নয়।
১. পরিচয়পত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কয়েকটি ফটোকপি, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র।
২. পোশাক: দ্রুত শুকায় এমন হালকা পোশাক, শীতে একটি গরম জ্যাকেট, রাতে ঠান্ডার জন্য পাতলা কম্বল বা চাদর।
৩. জুতা: গ্রিপওয়ালা ট্রেকিং জুতা বা ভালো মানের স্পোর্টস জুতা। নতুন জুতা প্রথমবার পাহাড়ে পরবেন না।
বিজ্ঞাপন
৪. ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা: ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক, খাওয়ার স্যালাইন আর নিজের নিয়মিত ওষুধ।
৫. আলো ও চার্জ: টর্চ বা হেডল্যাম্প, পর্যাপ্ত চার্জ দেওয়া পাওয়ার ব্যাংক।
৬. পানি ও শুকনো খাবার: পানির বোতল, পানি বিশুদ্ধ করার ট্যাবলেট, বাদাম বা বিস্কুট।
ব্যাগ যেন পিঠে বহন করা যায়, এমন ব্যাকপ্যাক নিন। হাতে ঝোলানো ব্যাগ বা স্যুটকেস পাহাড়ি পথে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
যে সতর্কতা না মানলেই নয়
১. প্রশাসনের নির্দেশনা: বিধিনিষেধ থাকলে কোনোভাবেই লুকিয়ে বা বিকল্প পথে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে আপনার নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে।
২. লেকে সাঁতার: বগা লেক অত্যন্ত গভীর বলে পরিচিত, আর পানিও ঠান্ডা। এখানে ডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সাঁতার জানলেও গভীরে যাবেন না, না জানলে পানিতে নামবেনই না।
৩. সময় মেনে চলা: সন্ধ্যার পর পাহাড়ি পথে চলাচল করবেন না। গাইডের দেওয়া সময়সূচি মানুন।
বিজ্ঞাপন
৪. স্বাস্থ্য: পাহাড়ি এলাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি আছে। মশারি, মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করুন, প্রয়োজনে যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাগ ও নিয়মিত ওষুধ সঙ্গে রাখুন।
৫. স্থানীয় সংস্কৃতি: বম পাড়ায় শব্দ করে গান-বাজনা, মদ্যপান বা অশালীন আচরণ করবেন না। ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
৬. নেটওয়ার্ক: মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকতে পারে। পরিবারকে যাত্রাপথ জানিয়ে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
গাইড ছাড়া কি বগা লেকে যাওয়া যায়?
না। নিয়ম অনুযায়ী রুমা থেকে নিবন্ধিত গাইড নিতে হয় এবং চেকপোস্টে নাম নিবন্ধন করতে হয়। গাইড ছাড়া এগোতে দেওয়া হয় না।
বগা লেক থেকে কেওক্রাডং কত দূর?
বগা লেক থেকে হেঁটে কেওক্রাডং পৌঁছাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে, পথে দার্জিলিংপাড়া পড়ে। শুকনো মৌসুমে জিপেও কাছাকাছি যাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের নিয়ে কি বগা লেক যাওয়া ঠিক?
পথ দীর্ঘ, খাড়া আর সুযোগ-সুবিধা সীমিত। খুব ছোট শিশুদের জন্য এই যাত্রা কষ্টকর। বড় শিশুদের নিয়ে শুকনো মৌসুমে, অভিজ্ঞ গাইডসহ যাওয়া যায়।
এখন কি বগা লেকে পর্যটক যেতে পারছেন?
এটি সময়ভেদে বদলায়। বিভিন্ন সময়ে বন্ধ ও শর্তসাপেক্ষে খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রওনা দেওয়ার আগে জেলা প্রশাসন বা রুমার নিবন্ধিত গাইডের কাছ থেকে সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন।