হাওরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার দুঃখজনক অবস্থা
প্রতি মাসে গড়ে ৬০জন প্রসূতিকে সার্জনের অভাবে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি · ধর্মপাশা, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ:
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও পাশের মধ্যনগর উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষের প্রধান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। যদিও এখানে কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম আছে, তবে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত। এক্স‑রে ও আলট্রাসনোগ্রাম সেবা বন্ধ থাকায়, দক্ষ সার্জন ও অ্যানেস্থেটিস্টের অনুপস্থিতিতে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ব্যবহারযোগ্য নয়। প্রান্তিক এলাকায় এ রকম অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে হাসপাতালের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ছবি। ২০১৫ সালে কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও, জনবল বৃদ্ধি না করে সেবার পরিধি বাড়ানো হয়নি। ডাক্তারের জন্য অনুমোদিত ৩৬টি পদের মধ্যে ২৫টি পদ বহু বছর ধরে শূন্য রয়েছে। গাইনি, সার্জারি, মেডিসিন ও অ্যানেস্থেসিয়ার জরুরি বিষয়ে কোনো জুনিয়র কনসালট্যান্ট নেই। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে ৪০০ থেকে ৪৫০ প্রসূতি, শিশু ও সাধারণ রোগী আসেন, তবে মাত্র ১১জন চিকিৎসকই সেবা প্রদান করতে সক্ষম, ফলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্টের অনুপস্থিতি এবং এক্স‑রে ও আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষের তালাবদ্ধ থাকার ফলে রোগীরা বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে এই পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রসূতিসেবার অবস্থা। প্রতি মাসে গড়ে ৬০জন প্রসূতি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নিয়ে হাসপাতালে আসেন, তবু সার্জনের অনুপস্থিতির ফলে তাঁদেরকে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে। রোগীদের বাধ্য হয়ে নেট্রাকোনা বা মোহনগঞ্জের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে, যেখানে যাতায়াত ও অস্ত্রোপচার বাবদ পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত ২৫‑৩৫ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য এটি বড় আর্থিক চাপ। অন্যদিকে, ডায়রিয়া রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় তাঁদেরকে বারান্দা বা মেঝের ওপর বসাতে হচ্ছে।
আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কেন বুঝতে পারছেন না যে শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ বা কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা স্বয়ং স্বাস্থ্যের মান উন্নত করে না; সেই যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বারবার লিখিতভাবে জানানো সত্ত্বেও এখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে কার্যকর না করলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার কোনো দিন সম্ভব নয়। তাই আমরা জোরালো দাবি জানাই যে ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শূন্য পদগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ করা হোক, অকেজো যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত ও সচল করা হোক, যাতে হাওরাঞ্চলের তিন লাখ মানুষের মৌলিক চিকিৎসা অধিকার সুনিশ্চিত করা যায়।