কম খরচে বান্দরবান ভ্রমণ: দুই-তিন দিনের বাজেট ট্যুর পরিকল্পনা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
বান্দরবান যেতে অনেক টাকা লাগে, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। খরচ বাড়ে মূলত তিনটি কারণে: ছোট দলে রিজার্ভ গাড়ি নেওয়া, ছুটির দিনে দামি রিসোর্টে থাকা আর পরিকল্পনা ছাড়া ঘোরাঘুরি। এই তিনটি জায়গায় একটু হিসাবি হলে বান্দরবানের সেরা দৃশ্যগুলো অনেক কম খরচেই দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে বান্দরবান ভ্রমণের সহজ সূত্র হলো: রাতের নন-এসি বাসে যাতায়াত, শহরের সাধারণ হোটেলে থাকা, আট-দশজনের দল করে চাঁদের গাড়ি ভাগ করা, আর সপ্তাহের কর্মদিবসে যাওয়া। এভাবে দুই রাত বাসে আর এক দিন ঘোরাঘুরিতে জনপ্রতি আনুমানিক ৪০০০ থেকে ৫৫০০ টাকায় শহরের আশপাশ আর নীলগিরি দেখা সম্ভব।
তবে কম খরচ মানে নিরাপত্তায় আপস নয়। পাহাড়ি রাস্তায় লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি, অচেনা গাইড বা অনুমতিহীন এলাকায় যাওয়া, এগুলো কখনোই সাশ্রয় নয়, ঝুঁকি।
বান্দরবান যাওয়ার উপায়: সস্তা কোনটি
১. ঢাকা থেকে সরাসরি নন-এসি বাস: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ, কলাবাগান আর গাবতলী থেকে রাতের বাস ছাড়ে। আট থেকে দশ ঘণ্টা লাগে, ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১১০০ টাকা। রাতের বাসে গেলে এক রাতের হোটেল ভাড়া বেঁচে যায়, এটাই সবচেয়ে বড় সাশ্রয়।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেন ও লোকাল বাস: আন্তনগর ট্রেনের শোভন চেয়ারে চট্টগ্রাম, তারপর বহদ্দারহাট থেকে বান্দরবানের লোকাল বাস। মোট খরচ সরাসরি বাসের কাছাকাছি বা সামান্য কম, তবে সময় বেশি লাগে। ট্রেনের টিকিট অনলাইনে আগেভাগে কাটতে হয়।
৩. এসি বাস বা বিমান: আরামদায়ক, কিন্তু বাজেট ট্যুরে এড়ানোই ভালো।
ফিরতি টিকিট বান্দরবানে পৌঁছেই কেটে ফেলুন। শুক্র-শনিবারের ফিরতি বাসে শেষ মুহূর্তে আসন পাওয়া কঠিন, তখন বাধ্য হয়ে দামি টিকিট কিনতে হয়।
বান্দরবান কম খরচে থাকা
বিজ্ঞাপন
১. শহরের সাধারণ হোটেল: বাসস্ট্যান্ড ও বাজার এলাকায় অনেক আবাসিক হোটেল আছে। দুই-তিন শয্যার কক্ষ রাতপ্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। তিন-চারজনে এক কক্ষে থাকলে জনপ্রতি খরচ খুব কম পড়ে।
২. ডরমিটরি বা গ্রুপ রুম: কিছু হোটেল ও গেস্টহাউসে বড় দলের জন্য বেশি শয্যার কক্ষ থাকে, তা আরও সাশ্রয়ী।
৩. কর্মদিবসে দরদাম: সপ্তাহের মাঝখানে গেলে অনেক হোটেলে ভাড়া কমানোর সুযোগ থাকে।
৪. পাহাড়ের ওপরের রিসোর্ট: নীলগিরি বা নীলাচলের রিসোর্টে থাকার অভিজ্ঞতা আলাদা, কিন্তু খরচ শহরের কয়েক গুণ। বাজেট ট্যুরে শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
হোটেল নেওয়ার আগে কক্ষ দেখে নিন, পানি ও বিদ্যুতের অবস্থা জেনে নিন, আর ভাড়ায় কর বা অতিরিক্ত চার্জ আছে কি না জিজ্ঞেস করুন।
যাতায়াতে টাকা বাঁচানোর কৌশল
বান্দরবানে সবচেয়ে বড় খরচ স্থানীয় যাতায়াতে। শহরের বাইরের জায়গায় যেতে চাঁদের গাড়ি, মানে খোলা জিপ, সবচেয়ে প্রচলিত। একটি গাড়িতে দশ-বারো জন বসতে পারেন। পুরো দিনের ভাড়া রুটভেদে কয়েক হাজার টাকা, কিন্তু বারো জনে ভাগ করলে জনপ্রতি খরচ অনেক কম।
১. দল বড় করুন: আট-বারো জনের দল হলে চাঁদের গাড়ি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। ছোট দলে থাকলে হোটেলে বা বাসস্ট্যান্ডে অন্য দলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
বিজ্ঞাপন
২. রুট আগে লিখে নিন: কোন কোন জায়গায় যাবেন, কতক্ষণ থামবেন, কখন ফিরবেন, সব লিখিতভাবে বা পরিষ্কার করে চালকের সঙ্গে ঠিক করুন।
৩. কাছের জায়গায় সিএনজি: নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দিরের মতো শহরের কাছের জায়গায় তিন-চারজন হলে সিএনজিই সস্তা।
৪. লোকাল বাস: থানচি বা রুমার দিকে লোকাল বাস চলে, খরচ অনেক কম, তবে সময় বেশি লাগে এবং ফেরার সময় সীমিত।
দুই-তিন দিনের বাজেট পরিকল্পনা
বিজ্ঞাপন
প্রথম দিন, শহরের আশপাশ: ভোরে বান্দরবান পৌঁছে হোটেলে উঠুন। সকালে সিএনজিতে মেঘলা পর্যটনকেন্দ্র, তারপর স্বর্ণমন্দির, খোলার সময় মিলিয়ে। দুপুরে শহরে সাধারণ রেস্তোরাঁয় খাওয়া। বিকেলে নীলাচলে সূর্যাস্ত। এই দিনের যাতায়াত খরচ তিন-চারজনে ভাগ করলে জনপ্রতি খুবই কম।
দ্বিতীয় দিন, নীলগিরি ও শৈলপ্রপাত: সকালে দল মিলিয়ে চাঁদের গাড়িতে থানচি সড়ক ধরে শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, তারপর নীলগিরি। পথের দৃশ্যই এই দিনের বড় পাওয়া। বিকেলে শহরে ফিরে রাতের বাসে ঢাকা, অথবা আরেক রাত থেকে তৃতীয় দিনে ফেরা।
তৃতীয় দিন, ঐচ্ছিক: সময় থাকলে সাঙ্গু নদীর পাড়, শহরের বাজার, রাজবিহার এলাকা দেখে দুপুরের পর ফেরা। দূরের জায়গা যেমন থানচি, নাফাখুম, রুমা, বগা লেকে যেতে চাইলে প্রশাসনের অনুমতির অবস্থা আগে জানতে হবে, আর তখন খরচ ও সময় দুটোই বাড়বে।
বান্দরবান ভ্রমণ খরচ: নমুনা হিসাব
বিজ্ঞাপন
দশ জনের একটি দলের জন্য দুই রাত বাসে আর এক দিন বান্দরবানে, জনপ্রতি আনুমানিক হিসাব:
১. ঢাকা-বান্দরবান আসা-যাওয়া, নন-এসি: আনুমানিক ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা।
২. স্থানীয় যাতায়াত, চাঁদের গাড়ি ও সিএনজি ভাগে: আনুমানিক ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা।
৩. হোটেল, দিনের বেলা বা এক রাত, ভাগে: আনুমানিক ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
৪. খাওয়া, চার-পাঁচ বেলা: আনুমানিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা।
৫. প্রবেশ টিকিট ও অন্যান্য: আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৩৫০০ থেকে ৫৫০০ টাকা। দাম মৌসুম, জ্বালানির দাম আর ছুটির দিনভেদে বদলায়, তাই কিছু বাড়তি টাকা হাতে রাখুন।
খাবারে সাশ্রয়
বিজ্ঞাপন
বান্দরবানের খাবারের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ, যদি কোথায় খাচ্ছেন সেদিকে একটু নজর দেন। পর্যটনকেন্দ্রের রেস্তোরাঁয় দাম বেশি। শহরের বাজার এলাকার সাধারণ হোটেলে ভাত, ডাল, ভর্তা, মুরগি বা মাছে বেলাপ্রতি জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায় খাওয়া যায়। পাহাড়ি খাবার চেখে দেখতে চাইলে স্থানীয় ছোট রেস্তোরাঁয় খোঁজ নিন। নীলগিরির মতো দূরের যাত্রায় সঙ্গে শুকনো খাবার আর পানি রাখুন, পথে দোকান কম এবং দাম বেশি।
দলবেঁধে গেলে খাবার অর্ডারেও সাশ্রয় হয়। কয়েকজন মিলে বড় বাটিতে তরকারি নিয়ে ভাগ করলে খরচ কমে, অপচয়ও কম হয়। সকালের নাশতায় পরোটা, ডিম আর চা সবচেয়ে সস্তা ও ঝামেলাহীন। হোটেলে ওঠার সময় জেনে নিন আশপাশে কোন কোন খাবারের দোকান রাতে খোলা থাকে, কারণ পাহাড়ি শহরে রাত নামলেই অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যায়। মৌসুমি ফল, যেমন পাহাড়ি কলা, আনারস বা পেঁপে বাজার থেকে কিনে নিলে কম দামে ভালো নাশতা হয়ে যায়।
সস্তায় যেতে গিয়ে যে ভুলগুলো করবেন না
১. অনুমতিহীন এলাকায় যাওয়া: থানচি, রুমা, রোয়াংছড়ির মতো এলাকায় সময়ে সময়ে পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ থাকে। গাইড খরচ বাঁচাতে নিবন্ধনহীন পথে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. ভাঙাচোরা গাড়ি: পাহাড়ি খাড়া রাস্তায় ব্রেক ও টায়ার ভালো এমন গাড়ি নিন, সস্তার লোভে নয়।
৩. বর্ষায় ঝুঁকি: বর্ষায় হোটেল সস্তা হয়, কিন্তু ধস ও পিচ্ছিল রাস্তার ঝুঁকি বাড়ে। গেলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে যান।
৪. ম্যালেরিয়া উপেক্ষা: মশা তাড়ানোর ক্রিম সস্তা, অসুখের চিকিৎসা নয়। সঙ্গে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
দুই-তিনজনের ছোট দলে কি কম খরচে বান্দরবান ঘোরা যায়?
যায়, তবে চাঁদের গাড়ির খরচ বেশি পড়বে। শহরের কাছের জায়গাগুলো সিএনজিতে ঘুরুন, দূরের যাত্রায় অন্য দলের সঙ্গে গাড়ি ভাগ করার চেষ্টা করুন।
বান্দরবান যাওয়ার সবচেয়ে সস্তা সময় কোনটি?
বর্ষায় ভিড় কম থাকায় হোটেল সস্তা পাওয়া যায়, তবে ঝুঁকিও বেশি। অক্টোবর-নভেম্বরের কর্মদিবসগুলো খরচ ও নিরাপত্তা দুই দিক থেকেই ভালো।
বিজ্ঞাপন
এক দিনে কি বান্দরবানের মূল জায়গাগুলো দেখা সম্ভব?
শহরের কাছের নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির আর শৈলপ্রপাত এক দিনে দেখা যায়। নীলগিরি যোগ করলে আরেকটা দিন রাখা ভালো।
শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো ছাড় আছে কি?
কিছু পর্যটনকেন্দ্রে শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র দেখালে প্রবেশ টিকিটে ছাড় মিলতে পারে। পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।