ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ: কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী দেখবেন
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
মানচিত্রে বাংলাদেশের একদম নিচের দিকে যে ছোট বিন্দুগুলো দেখা যায়, তার শেষটির নাম ছেঁড়া দ্বীপ। চারদিকে স্বচ্ছ নীল পানি, পায়ের নিচে প্রবাল আর পাথরের খাঁজ, কোথাও কোথাও কেয়াগাছের ঝোপ। জোয়ারে এটি সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ভাটায় আবার যুক্ত হয়। এই ছিঁড়ে যাওয়া আর জোড়া লাগার খেলা থেকেই নাম ছেঁড়া দ্বীপ।
বিজ্ঞাপন
ছেঁড়া দ্বীপ কোথায় অবস্থিত, জানতে চাইলে উত্তর কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণপাড়া থেকে এর দূরত্ব কয়েক কিলোমিটার। এখানে কোনো স্থায়ী জনবসতি নেই, হোটেল নেই, বিদ্যুৎ নেই। তাই ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ মানে আসলে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের মধ্যে একটা আধা বেলার অভিযান।
সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপ সরকার ঘোষিত পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনে কড়া নিয়ম চালু হয়েছে, আর সেই নিয়ম প্রায় প্রতি মৌসুমে হালনাগাদ হয়। তাই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হলো চলতি মৌসুমের সরকারি নির্দেশনা জেনে নেওয়া।
ভ্রমণের মৌসুম ও সাম্প্রতিক নিয়ম
সাম্প্রতিক নির্দেশনা অনুযায়ী সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাওয়ার সুযোগ মূলত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে নভেম্বরে সাধারণত শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, রাতে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে। দৈনিক পর্যটকের সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, আর যাত্রার জন্য অনলাইনে নিবন্ধন বা ট্রাভেল পাস নেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। বছরের বাকি সময় পর্যটকদের যাওয়া বন্ধ থাকে।
বিজ্ঞাপন
ছেঁড়া দ্বীপের জন্য এর সরাসরি অর্থ হলো, শুধু দিনের সফরে গেলে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। জাহাজ দুপুরের দিকে সেন্টমার্টিনে পৌঁছায় এবং বিকেলেই ফিরতি যাত্রা শুরু করে, মাঝের সময়ে দক্ষিণ প্রান্তে গিয়ে ফেরা যায় না। ছেঁড়া দ্বীপ দেখতে চাইলে রাতে থাকার অনুমতি আছে এমন সময়ে, অন্তত এক রাত হাতে নিয়ে যেতে হবে।
এই নিয়মগুলো পরিবর্তনশীল। তারিখ, সংখ্যা আর অনুমতির ধরন প্রতি মৌসুমের শুরুতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ঘোষণা দেখে মিলিয়ে নিন। ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার ওপর আলাদা কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না, তা-ও সেন্টমার্টিনে পৌঁছে স্থানীয় প্রশাসন বা হোটেল থেকে জেনে নিন।
ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে কক্সবাজার: বাসে সায়েদাবাদ, আরামবাগ, কলাবাগান থেকে দশ-বারো ঘণ্টা; ট্রেনে কমলাপুর থেকে কক্সবাজার এক্সপ্রেস বা পর্যটক এক্সপ্রেসে; অথবা বিমানে এক ঘণ্টার কিছু বেশি। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন: সাম্প্রতিক নিয়মে পর্যটকবাহী জাহাজ ছাড়ে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া এলাকার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে। টেকনাফ থেকে পর্যটক জাহাজ চলাচল নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে। ছোট ট্রলার বা স্পিডবোটে পর্যটক পারাপার নিষিদ্ধ। জাহাজ সকালে ছাড়ে, জোয়ার-ভাটাভেদে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত লাগতে পারে। আসা-যাওয়ার ভাড়া আসনের ধরনভেদে আনুমানিক কয়েক হাজার টাকা।
৩. সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ, হেঁটে: ভাটার সময় সৈকত ধরে দক্ষিণ দিকে হেঁটে যাওয়া যায়। দ্বীপের মাঝখান বা জেটি এলাকা থেকে সাধারণ গতিতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতে পারে। পথে প্রবাল-পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়, তাই ভালো জুতা দরকার।
৪. সেন্টমার্টিন থেকে ছেঁড়া দ্বীপ, নৌযানে: আগে জেটি এলাকা থেকে ছোট নৌকা ও স্পিডবোটে যাওয়ার প্রচলন ছিল। এখন কোন নৌযান চলবে, কখন চলবে, তা প্রশাসনের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। সৈকতে মোটরচালিত যান চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা আছে। স্থানীয়ভাবে বৈধ ব্যবস্থাটি জেনে নিন।
সবচেয়ে জরুরি হলো জোয়ার-ভাটার সময় জেনে যাত্রা করা। ভাটা শুরুর দিকে রওনা দিন, জোয়ার আসার আগেই ফিরে আসুন। ছেঁড়া দ্বীপে আটকে পড়লে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথ বন্ধ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
ছেঁড়া দ্বীপে কী দেখবেন
১. প্রবাল ও শিলার রাজ্য: ভাটার সময় অগভীর পানিতে প্রবাল, নানা রঙের ছোট মাছ, শামুক আর সামুদ্রিক শৈবাল দেখা যায়। স্বচ্ছ পানিতে নিচ পর্যন্ত দেখা যায়।
২. কেয়াবন: দ্বীপের কিছু অংশে কেয়াগাছের ঝোপ, যা এই এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
৩. দক্ষিণের শেষ বিন্দু: দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া সমুদ্র দেখা, যার পর আর বাংলাদেশের কোনো ভূখণ্ড নেই। অনেকের কাছে এই অনুভূতিটাই বড় পাওয়া।
বিজ্ঞাপন
৪. নির্জনতা: সেন্টমার্টিনের তুলনায় এখানে ভিড় অনেক কম, শুধু ঢেউ আর বাতাসের শব্দ।
কোথায় থাকবেন
ছেঁড়া দ্বীপে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং রাতে থাকা নিরাপদও নয়। থাকতে হবে সেন্টমার্টিনে। সেখানে সাধারণ কটেজ, গেস্টহাউস থেকে শুরু করে তুলনামূলক ভালো মানের রিসোর্ট পর্যন্ত আছে। দ্বীপের দক্ষিণ দিকে থাকলে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার পথ কিছুটা ছোট হয়, তবে দক্ষিণের এলাকা নিরিবিলি এবং সুবিধা কম। জেটি ও বাজার এলাকায় খাবার ও অন্যান্য সুবিধা বেশি।
রাতে থাকার অনুমতি যে মাসগুলোতে আছে, তখন চাহিদা অনেক বেশি থাকে, তাই অগ্রিম বুকিং ছাড়া যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণ কটেজে রাতপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা, ভালো রিসোর্টে আরও বেশি। মৌসুম ও চাহিদাভেদে দাম অনেক ওঠানামা করে।
বিজ্ঞাপন
সেন্টমার্টিনে খাবারের মধ্যে তাজা সামুদ্রিক মাছ জনপ্রিয়। তবে সাম্প্রতিক নির্দেশনায় সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ এবং বারবিকিউ পার্টির মতো আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এতে কচ্ছপসহ সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি হয়।
ছেঁড়া দ্বীপ ভ্রমণ খরচ
নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক এবং মৌসুম ও নিয়মভেদে বদলায়।
১. ঢাকা-কক্সবাজার আসা-যাওয়া: নন-এসি বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৮০০ থেকে ২৪০০ টাকা, ট্রেনে আসনভেদে এর কাছাকাছি বা বেশি।
বিজ্ঞাপন
২. কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন জাহাজ: আসা-যাওয়ায় জনপ্রতি আনুমানিক কয়েক হাজার টাকা, শ্রেণিভেদে।
৩. থাকা: দুই রাতে আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৮০০০ টাকা প্রতি কক্ষ।
৪. ছেঁড়া দ্বীপ যাতায়াত: হেঁটে গেলে খরচ নেই, নৌযানে গেলে জনপ্রতি কয়েকশ টাকা হতে পারে, যদি চলাচল অনুমোদিত থাকে।
৫. খাওয়া: দিনে জনপ্রতি আনুমানিক ৬০০ থেকে ১২০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিনে দুই রাত থেকে ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরে আসতে জনপ্রতি আনুমানিক ১০০০০ থেকে ১৮০০০ টাকা ধরে রাখুন।
প্রবাল রক্ষার দায় ও সতর্কতা
ছেঁড়া দ্বীপের প্রবাল খুব ধীরে বাড়ে, আর একবার ভেঙে গেলে আর ফিরে আসে না। তাই এখানে আপনার প্রতিটি পদক্ষেপের প্রভাব আছে।
১. কিছু তুলবেন না: প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, পাথর সংগ্রহ বা কেনা নিষিদ্ধ। কেয়া ফল তোলা ও কেয়াবনে ঢোকাও নিষেধ।
বিজ্ঞাপন
২. প্রবালের ওপর দাঁড়াবেন না: যতটা সম্ভব বালি বা শক্ত পাথরের ওপর পা রাখুন। জীবন্ত প্রবাল মাড়াবেন না।
৩. প্লাস্টিক ফেরত আনুন: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিয়ে সেন্টমার্টিনে যাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নিজের পানির পাত্র নিন।
৪. জোয়ারের সময়: ছেঁড়া দ্বীপে জোয়ারের আগে না ফিরলে আটকে পড়ার ঝুঁকি আছে। স্থানীয়দের কাছে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন।
৫. সাঁতার ও স্রোত: ছেঁড়া দ্বীপের আশপাশে ঢেউ ও স্রোত অপ্রত্যাশিত হতে পারে, ধারালো প্রবালে কেটে যাওয়ার ঝুঁকিও আছে। গভীর পানিতে নামবেন না।
বিজ্ঞাপন
৬. রোদ ও পানি: ছায়া প্রায় নেই। টুপি, সানগ্লাস, সানস্ক্রিন আর পর্যাপ্ত পানি নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ছেঁড়া দ্বীপে কি রাতে থাকা যায়?
না। ছেঁড়া দ্বীপে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই, রাত কাটাতে হয় সেন্টমার্টিনে, তা-ও শুধু যে সময়ে রাতে থাকার অনুমতি থাকে।
বিজ্ঞাপন
এক দিনের সেন্টমার্টিন সফরে কি ছেঁড়া দ্বীপ দেখা সম্ভব?
সাধারণত না। জাহাজ পৌঁছানো আর ফেরার মাঝে যে সময় থাকে, তাতে ছেঁড়া দ্বীপ পর্যন্ত গিয়ে ফেরা কঠিন।
টেকনাফ থেকে কি সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়?
সাম্প্রতিক নিয়মে পর্যটক জাহাজ শুধু কক্সবাজার থেকে চলছে, টেকনাফ রুট পর্যটকদের জন্য বন্ধ। মৌসুমের শুরুতে সর্বশেষ ঘোষণা দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
বছরের কোন সময় ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া যায় না?
নির্ধারিত পর্যটন মৌসুমের বাইরে, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যাওয়া বন্ধ থাকে, তাই ছেঁড়া দ্বীপেও যাওয়া যায় না।