আয়াতুল কুরসি বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: কখন পড়বেন, কী ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
কোরআনে ছয় হাজারের বেশি আয়াত, তার মধ্যে সবচেয়ে মহান কোনটি? মহানবী (সা.) নিজে এই প্রশ্ন করেছিলেন সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে। উবাই উত্তর দিয়েছিলেন, "আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম"। মহানবী (সা.) খুশি হয়ে তাঁর বুকে হাত রেখে বলেছিলেন, আবুল মুনজির, তোমার জন্য জ্ঞান আনন্দময় হোক। ঘটনাটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত।
বিজ্ঞাপন
এই আয়াতটিই আয়াতুল কুরসি। এটি সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত, তৃতীয় পারার শুরুর দিকে। আয়াতের মাঝখানে "কুরসি" শব্দটি আছে, সেখান থেকে এই নাম।
এক আয়াতে আল্লাহর একত্ব, চিরঞ্জীবতা, সর্বময় ক্ষমতা, সর্বব্যাপী জ্ঞান ও অসীম রাজত্বের এমন পূর্ণ বর্ণনা আর কোথাও একসঙ্গে নেই। এ কারণেই এর মর্যাদা এত বেশি।
আয়াতুল কুরসি আরবি
اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ ۚ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ ۚ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ ۚ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ ۚ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ ۖ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا ۚ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: বাক্যে বাক্যে
আয়াতটি দশটি ছোট বাক্যে ভাগ করে পড়লে মুখস্থ করা ও অর্থ বোঝা দুটিই সহজ হয়।
১. আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়া: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
২. আল হাইয়্যুল কাইয়্যুম: তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক ও রক্ষক।
বিজ্ঞাপন
৩. লা তা'খুজুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাওম: তন্দ্রা তাঁকে স্পর্শ করে না, ঘুমও নয়।
৪. লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ: আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সব তাঁরই।
৫. মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইনদাহু ইল্লা বিইজনিহ: কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে?
৬. ইয়া'লামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়ামা খালফাহুম: তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে, সব তিনি জানেন।
বিজ্ঞাপন
৭. ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শা-আ: তিনি যতটুকু চান, তার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না।
৮. ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ: তাঁর কুরসি আসমান ও জমিন পরিব্যাপ্ত।
৯. ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা: এ দুটির রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না।
১০. ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজিম: আর তিনি সর্বোচ্চ, মহামহিম।
বিজ্ঞাপন
বাংলা হরফে আরবি উচ্চারণ পুরোপুরি ধরা যায় না। বিশেষ করে "হাইয়্যুল", "ইয়াশফাউ", "ইয়াউদুহু" শব্দগুলো কোনো কারির কাছে শুনে শুদ্ধ করে নিন।
কয়েকটি শব্দের তাৎপর্য
আল-হাইয়্যু: চিরঞ্জীব, যাঁর জীবনের শুরু নেই, শেষ নেই। সৃষ্টির সব জীবন সীমিত ও ধার করা, তাঁর জীবন নিজস্ব ও পূর্ণ।
আল-কাইয়্যুম: যিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত এবং অন্য সবকিছুকে টিকিয়ে রাখেন। আকাশের নক্ষত্র থেকে শরীরের প্রতিটি কোষ, সবকিছু তাঁর ধারণে টিকে আছে।
বিজ্ঞাপন
তন্দ্রা ও ঘুম না থাকা: মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, তাকে ঘুমাতে হয়। ঘুম দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার চিহ্ন। আল্লাহ এসব থেকে পবিত্র, তাই তাঁর পাহারা কখনো থামে না।
সুপারিশের শর্ত: কিয়ামতের দিন নবী-রাসুল ও নেককাররা সুপারিশ করবেন, কিন্তু আল্লাহর অনুমতি নিয়েই। এ বাক্য মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো সত্তাকে স্বাধীন ক্ষমতার মালিক ভাবা যাবে না।
কুরসি: আক্ষরিক অর্থে আসন। এর প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে সাহাবি ও তাফসিরকারকদের কয়েকটি মত আছে। মূল কথা হলো, এটি আল্লাহর মহত্ত্ব ও রাজত্বের বিশালতার প্রকাশ, যার সামনে আসমান-জমিন ক্ষুদ্র। এর ধরন কল্পনা করে নির্দিষ্ট করা থেকে আলেমরা বিরত থাকতে বলেছেন।
আগে-পরের আয়াত: আয়াতুল কুরসির প্রসঙ্গ
বিজ্ঞাপন
আয়াতুল কুরসিকে আলাদা করে পড়া হলেও এটি সূরা বাকারার ধারাবাহিক আলোচনার অংশ। আগের আয়াতটি, অর্থাৎ ২৫৪ নম্বর আয়াতে মুমিনদের বলা হয়েছে, সেই দিন আসার আগে আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে ব্যয় করো, যেদিন কোনো বেচাকেনা থাকবে না, বন্ধুত্ব কাজে আসবে না, সুপারিশও না। ঠিক এর পরেই আয়াতুল কুরসিতে আল্লাহর একচ্ছত্র রাজত্বের বর্ণনা আসে, যেন বোঝানো হচ্ছে, সেদিন কার সামনে দাঁড়াতে হবে।
পরের আয়াত, ২৫৬ নম্বরে বলা হয়েছে, দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই; সঠিক পথ ভ্রান্ত পথ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যে তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন এক মজবুত হাতল ধরেছে, যা কখনো ভাঙবে না। আর ২৫৭ নম্বর আয়াতে আছে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক, তিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।
তিন আয়াত একসঙ্গে পড়লে ছবিটা পূর্ণ হয়। প্রথমে আখিরাতের প্রস্তুতির তাগিদ, তারপর সেই মহান রবের পরিচয়, আর শেষে তাঁর ওপর ঈমান আনার আহ্বান ও প্রতিশ্রুতি। এ কারণে কেউ কেউ আয়াতুল কুরসির সঙ্গে পরের দুই আয়াতও পড়েন।
আয়াতুল কুরসি মুখস্থ করার একটি সহজ কৌশল হলো ওপরের দশ বাক্যকে দুই ভাগে ভাগ করা। প্রথম দিন প্রথম পাঁচ বাক্য, দ্বিতীয় দিন বাকি পাঁচ বাক্য, আর তৃতীয় দিন থেকে প্রতি নামাজের পর পুরোটা একবার পড়া। এক সপ্তাহের মধ্যে আয়াতটি স্থায়ীভাবে মনে গেঁথে যায়।
বিজ্ঞাপন
আয়াতুল কুরসির ফজিলত
কোরআনের মহান আয়াত: শুরুতে উল্লেখ করা সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী এটি কোরআনের সবচেয়ে মহান আয়াত।
ঘুমের সময় সুরক্ষা: সহিহ বুখারিতে হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর একটি ঘটনা আছে। তিনি রমজানের জাকাতের খাদ্যশস্য পাহারা দিচ্ছিলেন, এক আগন্তুক পরপর তিন রাত চুরি করতে আসে। শেষ রাতে সে বলে, ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক তোমার সঙ্গে থাকবে, আর শয়তান তোমার কাছে আসবে না। মহানবী (সা.) শুনে বললেন, সে মিথ্যাবাদী হলেও এ কথাটি সত্য বলেছে; সে ছিল শয়তান।
ফরজ নামাজের পর: নাসাঈর একটি বর্ণনায় আছে, যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়ে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকে না। অনেক মুহাদ্দিস এ বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
কখন পড়বেন: দিনের রুটিন
১. প্রতি ফরজ নামাজের পর: সালাম ফিরিয়ে ইস্তেগফার ও মাসনুন জিকিরের পর একবার।
২. সকাল ও সন্ধ্যায়: সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের সঙ্গে একবার করে পড়ার প্রচলন আছে, আলেমরা এটিকে উত্তম বলেছেন।
৩. ঘুমানোর আগে: বিছানায় যাওয়ার আগে বা শুয়ে, বুখারির হাদিসের আলোকে।
বিজ্ঞাপন
৪. ভয় বা দুশ্চিন্তার সময়: নির্দিষ্ট সংখ্যা ছাড়া, আল্লাহর ক্ষমতার কথা স্মরণ করে মন শান্ত করতে পড়া যায়।
প্রচলিত কিছু কথা, যেমন নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়ে ঘরের চার কোণে ফুঁ দিলে চুরি হবে না বা নির্দিষ্ট দিনে পড়লে চাকরি মিলবে, এসবের নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র নেই। সহিহ হাদিসে যা আছে, তা-ই যথেষ্ট।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আয়াতুল কুরসি কোন সূরার কত নম্বর আয়াত?
বিজ্ঞাপন
সূরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। এটি কোরআনের তৃতীয় পারায় অবস্থিত।
ঋতুস্রাবের সময় কি আয়াতুল কুরসি পড়া যাবে?
হানাফি মতে এ সময় কোরআনের আয়াত তিলাওয়াতের নিয়তে পড়া যায় না। তবে অনেক আলেম বলেছেন, দোয়া ও সুরক্ষার নিয়তে এমন আয়াত পড়ার সুযোগ আছে। বিষয়টিতে মতভেদ থাকায় নিজের অনুসৃত আলেমের পরামর্শ নিন।
আয়াতুল কুরসির সঙ্গে পরের দুই আয়াতও কি পড়তে হয়?
বিজ্ঞাপন
না, ফজিলত শুধু ২৫৫ নম্বর আয়াতের। কেউ কেউ ২৫৬ ও ২৫৭ নম্বর আয়াতসহ পড়েন, এতে দোষ নেই, তবে জরুরি নয়।
শিশুদের কখন শেখানো উচিত?
সূরা ফাতিহা ও ছোট সূরাগুলোর পর আয়াতুল কুরসি শেখানো যায়। বাক্যে বাক্যে ভাগ করে প্রতিদিন একটি বাক্য শেখালে দুই সপ্তাহে মুখস্থ হয়ে যায়।